জন্ম তার গাজায়। যেখানে ইসরায়েলি দখলদাররা বছরের পর বছর ধরে চালাচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞ। যুদ্ধবিরতি পরোয়া করছে না তারা। একের পর এক হামলায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েই যাচ্ছে। গাজা এক বিধ্বস্ত নগরী। তারপরও সে জনপদের কিছু মানুষ একটু অন্যরকম এক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে গাজাকে শান্তির নগরীতে বদলে ফেলতে চাচ্ছেন। তাদেরই একজন রাশা ইয়াহিয়া আহমেদ। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা থেকে উঠে এসে এ নারী তীরন্দাজ ক্রমাগত দেশের জন্য লড়ছেন দুনিয়ার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। ঘুরতে ঘুরতে এসেছেন ঢাকায়। প্রস্তুতি নিচ্ছেন আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া ২৪তম এশিয়ান আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিতে দেশের পতাকা উঁচুতে তুলে ধরার।
এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তীরন্দাজে মুখর দেশের আরচারি অঙ্গন। জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হবে মর্যাদার এ লড়াই। যেখানে খেলবেন বেশ কজন অলিম্পিয়ান। তবে রাশা নিজেকে আলাদা করে চেনাচ্ছেন ঢাকায় পা রাখার পর থেকেই। কারণ হোটেলের বাইরে এলেই তার সঙ্গে থাকে ফিলিস্তিনের পতাকা। যা এ অঞ্চলের মানুষের কাছে বড্ড পরিচিত, ভালোবাসারও প্রতীক। লাখ লাখ গাজাবাসীর ওপর চলা নৃশংস হত্যাযজ্ঞে ভীষণ বিচলিত এ দেশের মানুষ নানাভাবে চেষ্টা করে সমর্থনের, পাশে দাঁড়ানোর। ফিলিস্তিনবাসীর শান্তি প্রার্থনায় এ দেশে হয়েছে লাখো মানুষের সমাবেশ। সে সবই জানা রাশার। গাজায় জন্ম নিলেও বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়েই ঘাঁটি গেড়েছেন ওমানে। সেখান থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি এগিয়ে নিচ্ছেন আরচারি ক্যারিয়ার। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে প্রতিনিধিত্ব করছেন ফিলিস্তিনের। বৃহস্পতিবার পল্টনে অনুশীলনের ফাঁকে এ দেশের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার কথা অকপটে স্বীকার করলেন রাশা, ‘হ্যাঁ, এই প্রথম বাংলাদেশে এসেছি এবং বিমানবন্দর থেকে শুরু করে এখানকার সবাই ভীষণ আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের স্বাগত জানিয়েছে। এমনকি, বিমানবন্দর থেকে হোটেলে আসা পর্যন্ত সবাই ছিল ভীষণ আন্তরিক। সবাই খুশি এবং সবাই আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে, সহযোগিতা করছে।’
খুব বেশিদিন হয়নি তীর-ধনুক হাতে নিয়েছেন। তবে সবার সমর্থন নিয়ে ঠিকই বিভিন্ন আসরে ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিত্ব করেন। যে প্রান্তেই যান, সেখানেই ভালোবাসায় সিক্ত হন। একজন ফিলিস্তিনি হিসেবে এটা তার কাছে বাড়তি পাওয়া। ঢাকায় আসার পর থেকে যে সম্মান ও সমর্থন পাচ্ছেন তাতে অভিভূত তিনি, ‘এখানে আমরা চারজন এসেছি। তিনজন পুরুষ তীরন্দাজ ও আমি। এখানে এসে সব ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছি। এমনকি সবকিছু দিয়েছে, এত গোছালো যে কোনো কিছু চাওয়ার দরকার পড়েনি। যথাসময়ে যানবাহন এসেছে, অনুশীলনের সুবিধা মিলছে, মাঠ মিলছে, এখানকার প্রস্তুতি খুবই সুন্দর, সবকিছুই আন্তর্জাতিক মানের।’
বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশন বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে ফিলিস্তিনসহ বেশ কিছু দেশের আরচারদের সুযোগ করে দিয়েছে এই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য। রাশা খেলবেন নারীদের রিকার্ভ একক ইভেন্টে। বাকি তিন পুরুষ সদস্য আলি আলাহামাদ খালেদ, আওয়াদ সামি ও বাদওয়ান ওসায়েদ খেলবেন কম্পাউন্ড ইভেন্টে। রাশা কেবল প্রতিনিধিত্ব করতে নয়, চান পদক জিতে ফিলিস্তিনের পতাকা ওপরে তুলে ধরতে, ‘এখানে আমরা একটা দল হয়ে এসেছি। আমাদের আকাক্সক্ষা শুধু অংশ নেওয়া নয়, এসেছি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য, ভালো পারফর্ম করে পদক জিততে চাই। তবেই সর্বক্ষণ সঙ্গে থাকা পতাকাটিকে সত্যিকারের সম্মান দেওয়া হবে।’
তীর-ধনুক এক সময় যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হতো। কালে কালে তীর-ধনুক এখন অলিম্পিকের ইভেন্টে রূপ নিয়েছে। গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে এক সময়ের সমরাস্ত্র হাতে তুলে নিয়েই শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান রাশা, ‘এটা আমার জন্য আসলেই খুবই আবেগের মুহূর্ত যখন আমি এই ইউনিফর্মটা পরি, এই পতাকাটা হাতে নিই। আবার যখন পতাকা সঙ্গী করে তীর-ধনুক দেশের বাইরে হাতে নিই সেটা আমার কাছে ভীষণ অর্থবহ। আমি জানি, এ প্রান্তের মানুষও খুব করে চায় আমার দেশে যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ থেমে যাক। একজন ফিলিস্তিনি হিসেবে আমরা জানি এবং অনুভব করছি বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন। এখানে সবাই আমাদের নিজেদের করে নিয়েছে। এটা আমাদের আপ্লুত করছে এবং আশা করি, একদিন ইনশাল্লাহ আমরা বাংলাদেশের মানুষকে ফিলিস্তিনে স্বাগত জানাব, সেখানে মিলিত হব।’