সংঘাত নিরসনে সদাচার

আমাদের সমাজে কঠোরতা, দুর্ব্যবহার, ঘৃণা ও সংঘাত বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ক্রমেই আমরা এক বিশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত হব। এটা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে আমাদের মধ্যে সদাচারের চর্চা বাড়াতে হবে। পরস্পরের প্রতি সহনশীল আচরণ করতে হবে। তাহলে সমাজ থেকে দ্বন্দ্ব-সংঘাত দূর হবে। মানুষের মধ্যে যদি ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়, তবে হিংসা, বিদ্বেষ, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা জায়গা পাবে না। ইসলাম এই মানবিক গুণাবলির দিকেই আহ্বান জানায়। কোরআন ও হাদিসে মুমিনদের সম্পর্ককে ভাই ভাই হিসেবে ঘোষণা করে এমন এক সমাজব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যেখানে পারস্পরিক সহানুভূতি, সহযোগিতা, ন্যায়বোধ ও পরস্পরের কল্যাণ কামনা সমাজজীবনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। একজন মুসলমানের প্রতি অন্য মুসলমানের কর্তব্য কেবল সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ইমানেরও অংশ। তাই মুসলিম সমাজে যদি এই ইমানি ভ্রাতৃত্ব সজীব থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে বিভেদ, অবিচার ও অশান্তির কোনো স্থান থাকবে না।

কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা হুজুরাত ১০) আয়াতটি দুনিয়ার সব মুসলিমকে এক বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে। দুনিয়ার অন্য কোনো আদর্শ বা মত ও পথের অনুসারীদের মধ্যে এমন কোনো ভ্রাতৃত্ব বন্ধন পাওয়া যায় না, যা মুসলিমদের মধ্যে পাওয়া যায়। ইসলামের শিক্ষা হলো, একজন মুমিন অপর মুমিনের বন্ধু ও অন্তরঙ্গ সাথী। জীবন চলার পথে সব অঙ্গনে তারা অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। এই বন্ধন অবিচ্ছেদ্য। সুখে-দুঃখে, কাজে-কর্মে, চিন্তা-চেতনার সর্বত্রই এর জোয়ার ধারা মুমিনদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করে তোলে। এই বিষয়ের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বহুসংখ্যক হাদিস রাসুল (সা.) বর্ণনা করেছেন। ওই সব হাদিসের আলোকে এ আয়াতের আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বোধগম্য হয়। যেমন হজরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার থেকে তিনটি বিষয়ে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) নিয়েছেন। এক. নামাজ কায়েম করব। দুই. জাকাত আদায় করতে থাকব। তিন. প্রত্যেক মুসলমানের কল্যাণ কামনা করব।’ (সহিহ বুখারি) রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, ‘এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। সে তার ওপরে জুলুম করে না, তাকে সহযোগিতা করা পরিত্যাগ করে না এবং তাকে লাঞ্ছিত ও হেয় করে না। কোনো ব্যক্তির জন্য তার কোনো মুসলিম ভাইকে হেয় ও ক্ষুদ্র জ্ঞান করার মতো অপকর্ম আর নেই।’ (মুসনাদে আহমাদ) হজরত রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘ইমানদারদের সঙ্গে একজন ইমানদারের সম্পর্ক ঠিক তেমন, যেমন দেহের সঙ্গে মাথার সম্পর্ক। সে ইমানদারদের প্রতিটি দুঃখ-কষ্ট অনুভব করে যেমন মাথা দেহের প্রতিটি অংশের ব্যথা অনুভব করে।’ (মুসনাদে আহমাদ)

 

কোরআনের আয়াত ও হাদিসের আলোকে ইসলামি স্কলাররা বলেন, মুসলিম ব্যক্তি তার ওপর তার অপর মুসলিম ভাইয়ের অধিকারসমূহ আদায় ও আদবসমূহ মেনে চলার আবশ্যকতাকে বিশ্বাস করে ও মান্যতা দেয়। প্রকৃত মুসলিম তার অপর মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে যথাযথ আদব রক্ষার পাশাপাশি তার অধিকারসমূহ আদায় করে। এর মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য অর্জন করা যায়। কারণ, এসব অধিকার ও আদব আল্লাহতায়ালা মুসলিম ব্যক্তির ওপর বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। তেমনই কয়েকটি আচরণীয় বিষয় উল্লেখ করা হলো। এক মুমিন অপর মুমিনের প্রতি নিজ থেকে ইনসাফ করা এবং তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করা, যে ব্যবহার সে নিজে অন্যের কাছ থেকে আশা করে। কেননা, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত ইমানকে পরিপূর্ণ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তার মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটবে। এক. অভাবগ্রস্ত অবস্থায়ও দান করা। দুই. নিজ থেকে ইনসাফ করা। তিন. সালামের প্রচলন করা।’ (সহিহ বুখারি) মুমিন অপর মুমিনের ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে ও অভ্যন্তরীণ বিষয় গোপন রাখে। কোনো মুমিন অন্যের গোপন কথা কান পেতে শোনে না। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে কোনো বান্দা দুনিয়াতে অন্য বান্দার দোষত্রুটি গোপন রাখবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন।’ (সহিহ মুসলিম)

 

কোনো মুমিনের কোনো প্রয়োজনে তাকে সহযোগিতা করা এবং তার কোনো প্রয়োজন পূরণে সম্ভব হলে তার জন্য সুপারিশ করা কাম্য। কেননা, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর নেককাজ ও তাকওয়ায় (আল্লাহভীতি) তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে।’ (সুরা মায়েদা ২) রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ব্যক্তির পার্থিব কষ্টসমূহের মধ্য থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহতায়ালা তার কেয়ামতের দিনের কষ্টসমূহের মধ্য থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীর অভাবের কষ্ট লাঘব করে দেয়, আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার অভাবের কষ্ট লাঘব করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ব্যক্তির দোষত্রুটি গোপন করবে, আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষত্রুটি গোপন করে রাখবেন। আর বান্দা যতক্ষণ তার মুসলিম ভাইয়ের সাহায্য করতে থাকে, আল্লাহও ততক্ষণ তার সাহায্য-সহযোগিতা করতে থাকেন।’ (সহিহ মুসলিম) আামাদের করণীয় হলো, আশপাশের কেউ কোনো বিপদে পড়লে তাকে যথাযথভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এতে মহান আল্লাহর সাহায্য পাওয়া যাবে।

 

এক মুমিন অপর মুমিনকে হিংসা করে না, অথবা তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করে না, অথবা তাকে ঘৃণা করে না, তার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করে না। কেননা, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো। কারণ কোনো কোনো অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান কোরো না এবং একে অন্যের গিবত কোরো না।’ (সুরা হুজুরাত ১২) হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, নকল ক্রেতা সেজে আসল ক্রেতার সামনে পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে বলবে না, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা পোষণ কোরো না এবং পরস্পর পরস্পরের পেছনে লেগো না। আর তোমরা আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (সহিহ মুসলিম) আমরা যদি এই কাজগুলোর চর্চা অব্যাহত রাখতে পাারি তাহলে আমাদের মধ্যে সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে। মহান আল্লাহ আমাদের যথাযথভাবে আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন।

 

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

সঁভঃরসধযনঁন৫০৩@মসধরষ.পড়স