টেস্টে আয়ারল্যান্ড কেমন প্রতিপক্ষ?

ক্রিকেটের উৎসভূমি ইংল্যান্ড আর আয়ারল্যান্ডের মধ্যে আইরিশ সাগর। উত্তর আটলান্টিকের ১৩০ মাইল লম্বা আর ১৫০ মাইল চওড়া অংশটা পাড়ি দিয়ে ক্রিকেট আয়ারল্যান্ডে পৌঁছে গিয়েছিল ১৭ শতকেই। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে থাকা আইরিশ সৈনিকদের ‘ক্যাটি’ খেলাটারই আধুনিক সংস্করণ হচ্ছে ক্রিকেট। ইতিহাস যাই বলুক, বাস্তবতা হচ্ছে ইংল্যান্ডের হাওয়া গায়ে লাগিয়েও ক্রিকেটে খুব একটা বড় হয়ে উঠতে পারেনি আয়ারল্যান্ড। সে দেশে কয়েক শতাব্দী আগে ক্রিকেট খেলার ইতিহাস থাকলেও এই সময়ে এসে তাদের দেশে কোনো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নেই। ২০১৮ সালে টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির পর আয়ারল্যান্ড ৭ বছরে টেস্ট খেলেছে মাত্র ১০টি। তবে এ জন্য আইসিসির একচোখা নীতিকেই অনেকাংশে দায়ী করেছেন আইরিশ কোচ হেইনরিখ মালান।

আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ দলের সম্পর্কটা অমøমধুর। কারণ প্রথম দেখাতেই যে আইরিশরা হারিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশকে, ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে। যে আসরে প্রবল শক্তিশালী ভারত ও ফেভারিট তকমা গায়ে লাগা দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ, সেই একই আসরে আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে যাওয়াটা অনেকে বিরিয়ানির এলাচের মতোই সরিয়ে রাখেন স্মৃতিচারণের সময়ে। শুধু তাই নয়, ২০০৯ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও সংক্ষিপ্ত সংস্করণের প্রথম দেখায় নটিংহ্যামে আয়ারল্যান্ড হারিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশকে। সব মিলিয়ে জয়ের পাল্লা অবশ্য বাংলাদেশের দিকেই ভারী, তবে অস্বস্তির কারণও কম নেই। এর আগেও আইরিশদের বিপক্ষে টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ, সেটা ছিল মিরপুরে একটাই ম্যাচ। এবারে ২ ম্যাচের সিরিজ, শুরু হচ্ছে সিলেটে যেখানটায় উইকেট অপেক্ষাকৃত পেস সহায়ক। নভেম্বরের সকাল, চা বাগানের ওপর দিয়ে বয়ে আসা বাতাস উইকেটকে দেবে আর্দ্রতা আর আউটফিল্ড থাকবে শিশিরভেজা। এমন কন্ডিশনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কড়া পরীক্ষা নিতে পারেন আইরিশ বোলাররা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সবশেষ টেস্ট খেলেছে আয়ারল্যান্ড। ফেব্রুয়ারিতে বুলাওয়েতে আইরিশরা একাদশে রেখেছিল ৩ পেসার; ক্রেইগ ইয়ং ডানহাতি ফাস্ট মিডিয়াম, ব্যারি ম্যাকার্থি ডানহাতি ফাস্ট মিডিয়াম আর মার্ক আডাইর। আডাইর এবং জশ লিটিল আইরিশদের সেরা দুই পেসার, দুজনেই টি-টোয়েন্টি সিরিজে দলে যোগ দেবেন। তাই আইরিশ একাদশে হয়তো দুই পেসারের সঙ্গে দেখা যাবে পেস বোলিং অলরাউন্ডার কার্টিস ক্যাম্ফারকে। বামহাতি স্পিনার ম্যাথু হামফ্রে ছিলেন সবশেষ টেস্টের একাদশে, লেগস্পিনার গ্যাভিন হোয়ে কিছুদিন আগেই আয়ারল্যান্ড উলভস দলের হয়ে আরব আমিরাতে খেলে গেছেন আফগানিস্তান ‘এ’ দলের বিপক্ষে। তাকে নিয়ে আইরিশ সহকারী কোচ গ্যারি উইলসন খুবই আশাবাদী।

ব্যাটিংয়ে আইরিশদের আশার বাতিঘর কেইড কারমাইকেল। এখনো টেস্ট অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এসে থিতু হয়েছেন আয়ারল্যান্ডে। পিটমারিজবার্গের প্রাদেশিক সেরা বয়সভিত্তিক ক্রিকেটার হয়েছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ ক্যাম্পেও ডাক পেয়েছিলেন। কিন্তু পরে চলে এসেছেন আয়ারল্যান্ডে, নতুন দেশের হয়ে ৩টা ওয়ানডে খেললেও এখনো টেস্ট খেলার অপেক্ষায়। গ্যারি উইলসনের ভাষায়, ‘কেইড কারমাইকেলের খেলার ধরনটা লম্বা দৈর্ঘ্যরে জন্যই সত্যিকারভাবে উপযুক্ত। সে মাঠে নামার অপেক্ষায় রীতিমতো ফুটছে’। অধিনায়ক অ্যান্ডি বলব্রাইন, হ্যারি টেক্টররা তো আছেনই, গতবার বাংলাদেশ সফরে এসে সেঞ্চুরি করা লোরকান টাকারকে কী করে ভোলা যায়! ৫১ রানে ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর মিরপুরে অভিষেক টেস্টেই টাকার ১০৮ রানের ইনিংস খেলে দলের সংগ্রহটাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন সম্মানজনক অবস্থায়। ৭ টেস্টের ক্যারিয়ারে ৫৭১ রান, একখানা সেঞ্চুরি আর ৩ হাফসেঞ্চুরি মিলিয়ে টাকার আইরিশদের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান, সব সংস্করণ মিলিয়ে তার ৩ হাজারের ওপর রান হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। বাংলাদেশের বোলারদের কাছে তার উইকেটটা যে মূল্যবান এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

রবিবার দুপুরে কিন ব্রিজের গোড়ায়, আলি আমজাদের ঘড়ির সামনে হয়ে গেল বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড সিরিজের ট্রফি উন্মোচন। ১৯৩৬ সালে সুরমা নদীর ওপরে বানানো এই লোহার সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে সে সময়ে আসামের গভর্নর স্যার মাইকেল কিন-এর নামে। মাইকেল কিন ছিলেন আইরিশ, জন্মেছিলেন কেরি কাউন্টিতে আর কিশোর বয়সে পড়ালেখা করেছেন ডাবলিনের ব্ল্যাকরক কলেজে। সেখানকার রেকর্ডপত্র বলছে, কিনের বাবা-মা তার ক্রিকেট খেলার পোশাকের জন্য টাকা দিয়েছিলেন, অর্থাৎ তিনি ছাত্রজীবনে ক্রিকেট খেলেছেন। তারই নামে নামাঙ্কিত সেতুর নিচে আয়ারল্যান্ডের টেস্ট দলের অধিনায়ক ট্রফি নিয়ে ছবি তুললেন বাংলাদেশের অধিনায়কের সঙ্গে, মাইকেল কিন সেতু উদ্বোধনের প্রায় ৯০ বছর পর। ইতিহাস এভাবেই ফিরে ফিরে আসে, তবে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে প্রথম দেখার ইতিহাস এই মুহূর্তে ফিরে না আসাটাই শ্রেয়!