ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী পুনর্বিবেচনার দাবিতে পক্ষে-বিপক্ষে দীর্ঘ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অব্যহত রয়েছে।
দশ নভেম্বর সোমবার বিকেলে নবীনগর প্রেসক্লাবের সামনে থেকে একটি বিশাল মিছিল বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী এডভোকেট আব্দুল মান্নানের পক্ষে বের করা হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়কে প্রদক্ষিণ করে এবং এলাকাকে মুখরিত করে রাখে। এতে মূল দলের শীর্ষস্থানীয় স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
এর আগে, রোববার (৯ নভেম্বর) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপজেলা সদর থেকে বাঙ্গরা বাজার পর্যন্ত প্রায় দশ কিলোমিটার দীর্ঘ মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এ মানববন্ধনে উপজেলা বিএনপির এক পক্ষের কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ জনগণ অংশ নেন।
উল্লেখ্য, গত সোমবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন।
এ সময় তিনি জানান, বাকি আসনের প্রার্থীদের নাম দ্রুত ঘোষণা করা হবে। প্রার্থী তালিকায় দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান। মনোনয়ন প্রত্যাশী আরও কয়েকজনের মধ্যে ছিলেন জেলা বিএনপির অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক কাজী নাজমুল হোসেনও।
তিনি ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাঁর বাবা প্রয়াত কাজী মো. আনোয়ার হোসেন এই আসনে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
কাজী নাজমুল হোসেনের সমর্থকেরা দুপুর ১২টার দিকে কুমিল্লার কোম্পানীগঞ্জ সড়কের নবীনগর উপজেলা সদর থেকে জিনোদপুর ইউনিয়নের বাঙ্গরা বাজার পর্যন্ত দুই পাশে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।
মানববন্ধনে উপজেলাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। তাঁদের পাশাপাশি পৌর এলাকাসহ অন্যান্য ইউনিয়নের সাধারণ জনগণও এতে অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তব্য দেন নবীনগর পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. মাঈন উদ্দিন, জেলা বিএনপির সদস্য হজরত আলী, আবু সাঈদ প্রমুখ।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, মো. আব্দুল মান্নান ২০০১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নবীনগরে উপস্থিত ছিলেন না। আওয়ামী লীগের সময়ে হরতালসহ বিভিন্ন আন্দোলনে নাজমুল হোসেনের নেতৃত্বে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা মাঠে ছিলেন।
তাঁরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে মনোনয়নের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে নাজমুল হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়ার অনুরোধ জানান।
জেলা বিএনপির সদস্য হজরত আলী বলেন, ২০১৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগবিরোধী সব আন্দোলনে যারা মাঠে সক্রিয় ছিলেন, তারা সবাই কাজী নাজমুল হোসেনের পক্ষে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন।
তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হোক—এটি শুধু বিএনপির নেতা-কর্মীদের চাওয়া নয়, উপজেলার সব মানুষের চাওয়াও বটে। তাই মনোনয়নের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য দলের কাছে আহ্বান জানাতে এই কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
মনোনয়নপ্রাপ্ত আব্দুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দৈনিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, "আমি দলের কান্ডারী হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে আসছি।
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে হাই কমান্ড আমাকে মনোনীত করেছেন। সে অনুযায়ী দলকে সুসংগঠিত করে মাঠে রয়েছি। মানুষের কিছু নোংরামি কর্মকাণ্ড আমাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। তারা অচিরেই নিপাত যাবে।"
এদিকে কাজী নাজমুল হোসেন বলেন, "সব আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে সক্রিয় ছিলাম। দুর্দিনে তৃণমূল নেতাদের পাশে ছিলাম, আছি ও থাকব।
আমরা কেউ দলের ঊর্ধ্বে নই, দলের জন্য কাজ করছি। পুনর্বিবেচনা হলে মনোনয়ন পেতে পারি। দলই সবার আগে।"
সুশীল সমাজের লোকজন উল্লেখ করেছেন, নবীনগরে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন হলেও কার্যত বিএনপি দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়েছে। দলের সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে দলের বিজয় নিয়ে। এ সুযোগে দলের ক্লিন ইমেজের প্রার্থীরাও সক্রিয় হয়ে আশা ছাড়ছে না।
তাঁদের ধারণা, "আমাদের মনোনয়ন দিলে নির্দ্বিধায় বিজয় নিশ্চিত করতে পারব। তখন এতো রেশারেশি থাকবে না। কারণ এই আসনে আরও বেশ কিছু ত্যাগী নেতা রয়েছেন।"
এরই মধ্যে মেজর জেনারেল (অব.) কামরুজ্জামানের নামও রয়েছে। তিনি মাঠের রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় না থাকলেও সেনাবাহিনীতে চাকরি জীবন থেকেই বিএনপির সমর্থন করে আসছেন।
এছাড়া তিনি রত্নগর্ভা পরিবারের, যেখানে তার সহোদর দুই ভাই—একজন ডিআইজি মনিরুজ্জামান, অপর ভাই মেজর জেনারেল সাদেকুজ্জামান। স্ত্রীও ডিআইজি, এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা সরকারের সুউচ্চ পর্যায়ে রয়েছেন।
অপরদিকে কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতা তকদির হোসেন, মো. জসিম, সালাউদ্দিন ভুঁইয়া শিশিরসহ কিছু নেতা দলের দুর্দিন থেকে কান্ডারী হয়ে কাজ করে আসছেন। জেলজুলুম সহ্য করে তারা দলের জন্য কাজ করে আসছেন এবং এবার গভীর প্রত্যাশায় রয়েছেন যেন শেষ বয়সে দলের স্বীকৃতি পান।