বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে গত বছরের ৪ আগস্ট ঢাকাতে গুলিতে নিহত ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার আব্দুল গনির স্ত্রী পরিচয়ে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। চলিত বছরের ১৬ জুলাই ঢাকা মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোহানা আক্তার বাদি হয়ে ২২২ জনের নাম উল্লেখ মামলাটি করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ প্রদান করেছেন।
মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। মামলাতে ঢাকা শহরসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। আসামির তালিকায় নাম রয়েছে সাংবাদিক নঈম নিজাম, শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবুসহ ১০ সাংবাদিকের নাম। পুলিশের ৬ কর্মকর্তাকেও এ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়াও মামলায় সোনাগাজীর এক গ্রামের ২৮ জনকে আসামির তালিকায় অন্তভুক্ত করা হয়েছে।
তারা হলেন ইফতেখার হোসেন জুয়েল, গোলাম সরওয়ার মাসুম, মাজহারুল ইসলাম সাব্বির, কবির আহমদ, মোহাম্মদ আলম ফিরোজ, মিজানুর রহমান সেলিম, আলাউদ্দিন, দাউদুল ইসলাম রনি, মোহাম্মদ ইসমাইল, জসিম উদ্দিন, শহিদুল ইসলাম, মোহাম্মদ ইস্রাফিল, নুর করিম করা, শাহাদাত হোসেন, সিরাজুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, মোহাম্মদ ফারুক, নুরুল ইসলাম সবুজ, সরোয়ার উদ্দিন মুনতাসির, ইব্রাহিম খলিল, ড. কামরুল হাসান, হুমায়ুন কবির, আব্দুল মোতালেব তুহিন, আবু সুফিয়ান রবিন, ছানা উল্যা, মোহাম্মদ সেলিম, জেবার মুল্লক দেলু, আব্দুল আল নোমান, মোহাম্মদ রিয়াদ, আব্দুল্যাহ আল মামুন। অভিযুক্ত সবাই উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের পালগিরি গ্রামের বাসিন্দা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে ভিকটিম আব্দুল গনি সোনাগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়নের ছাড়াইতকান্দি গ্রামের আরব আলী মেস্তরী বাড়ির আহসান উল্যার ছেলে। তিনি ঢাকা শহরের বাংলা মোটর শাখার সন্ধানী লাইফ ইন্সুরেন্সের কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর উপজেলার চরছান্দিয়া ইউনিয়নের পূর্ব বড়ধলী গ্রামের মোহাম্মদ সেলিমের কন্যা আয়েশা আক্তাররপপির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
স্ত্রীর পরিচয়ে মামলা দায়ের করা সোহানা আক্তার মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার নিলাস্বর গ্রামের বাসিন্দা।
নিহত হওয়ার পরদিন ঢাকা মেডাকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে লাশ গ্রহণ করে বড় ভাই মহসিন। একই দিন রাতে সোনাগাজীর নিজ গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান গেজেটে ৪১২ নম্বর ক্রমিকে শহীদের তালিকায় আব্দুল গনির নাম অন্তভুক্ত রয়েছে।
এদিকে আদালতের আদেশ পেয়ে মামলাটি তদন্ত করেন তেজগাঁও থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. নাজমুল জান্নাত শাহ। তিনি সিআর-২৬১/২৫ মামলাটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে মেট্টোপলিটন আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। প্রতিবেদন পেয়ে আদালত গত ৩০ অক্টোবর আদেশ প্রদানের দিন ধার্য করলেও আদেশ প্রদান করেননি।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে জানা গেছে, তদন্ত কর্মকর্তা মামলার বাদির ঠিকানা শনাক্ত করতে সিংগাইর থানার মাধ্যমে নোটিশ প্রদান করেন। স্থানীয় পুলিশ বাদিকে শনাক্ত করতে পারেনি এবং বর্ণিত ঠিকানায় কাউকে খুঁজে পাইনি। এমনকি তাকে কেউ চিনেন না বলে নোটিশ জারি করা সম্ভব হয়নি। মামলা রুজুর সময় মানিত এডভোকেট মাসুদা আক্তার শিল্পির মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলেও বাদির ঠিকানা সম্পর্কে কোন তথ্য তথ্য দিতে পারেনি।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ৪ আগস্ট বিকাল ৫টার দিকে শহীদ আব্দুল গনি প্রতিদিনের মত বাংলামোটর মোড় হয়ে ইস্কাটন কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের দিকে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন। এ মৃত্যুর ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ডিএমপি রমনা মডেল থানার মামলা নং-৩, তাং-২/৭/২০২৫ তারিখে পেনাল কোডের ৩০২ ধারায় মামলা রুজু হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা নিহতের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তারা ইতিপূর্বে মামলা দায়ের করেননি। বাদি তার দায়েরকৃত মামলার ঘটনাস্থল হিসেবে কাওরানবাজার ফার্মগেট মাঝ খানে ফুটওভার ব্রিজের নিচে দেখালে পুলিশ তদন্তে তার সত্যতা পায়নি।
নিহতের পরিবার, কর্মস্থলের সহকর্মীদের বরাতে ও পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে শহীদ আব্দুল গনি বাংলামোটর ইস্কাটন কেন্দ্রীয় জামে মসজিদেও দিকে যাওয়ার পথে নিহত হয়েছে।
পালগিরি গ্রামের আসামি হওয়া একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। তারা মামলার বিষয়ে অবগত নয় বলে জানান। তাদের দাবি তারা গত দুই বছরের মধ্যে ঢাকা যায়নি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে তারা নিজ গ্রামে অবস্থান করেছেন। শহিদ আব্দুল গনিকে তারা চিনেন না, এমনকি নামও শুনেননি। কারা তাদের আসামি করেছে সে বিষয়ে তাদের কোন ধারণা নেই।
অনুসন্ধান করে জানা গেছে মামলায় আসামির তালিকায় নাম থাকা ইফতেখার হোসেন জুয়েল গত বছরের ৪ আগস্ট দুপুরে ফেনীর মহিপালে আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শহীদ মাসুম হত্যা মামলার চার্জসীটভুক্ত আসামি।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, একই দিন ফেনী ও ঢাকাতে অবস্থান করা কিছুতেই সম্ভব না। হয়রানি করার জন্য স্থানীয় কুচক্রীমহল আমাদের নাম ডুকিয়ে দিয়েছে। ওই দিন আমি পালগিরি গ্রামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ছিলাম, যার সাসিটিভি ফুটেজ আমার কাছে রয়েছে।
মামলার খবরে স্থানীয়রা হতাশা ব্যক্ত করে জানায়, মামলার এক আসামি গোলাম সরওয়ার মাসুম দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। আসামি হওয়া অনেকে শারিরিকভাবে অসুস্থ, এমনকি আসামির তালিকায় পিতা পুত্রও রয়েছে। আসামিরা ঢাকা গিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিবে বাস্তবতার আলোকে একেবারে অসম্ভব। সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করতে ও বাণিজ্য করতেই গ্রামের নিরাপরাধ মানুষদের আসামি করা হয়েছে।