গবেষণাকে প্রাধান্য দিচ্ছে উত্তরা ইউনিভার্সিটি

দেশ রূপান্তর : আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষত্ব কী? এমন কী কী বিষয় আছে যে কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বিশেষভাবে বেছে নেওয়া যায়?

অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা : একেবারে শুরু থেকেই উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা আর জ্ঞানচর্চা, এই দুটো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। আসলে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ছিল গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে জ্ঞানসৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্ববাজারের জন্য উপযোগী জনশক্তি গড়ে তোলা।

উত্তরা ইউনিভার্সিটি (ইউইউ) গত দুই দশকে ব্যতিক্রমী অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিক্ষার্থীবান্ধব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা প্রথম থেকেই সচেষ্ট থাকায় এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে শিক্ষার্থীদের মতামতের মূল্যায়ন হয় সবার আগে। আর যে কথাটি প্রথমেই বললাম, গবেষণায় মূল ফোকাস দেওয়ার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা হয় এখানে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উত্তরা ইউনিভার্সিটির পার্টনারশিপ থাকায় শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

আমাদের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য রয়েছে একটি অত্যন্ত সক্রিয় এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স ইউনিট, যা শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও জব প্লেসমেন্টের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিতভাবে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন।

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ফর ইনোভেশন (ডটজও) ২০২৫-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ ৪০০ উদ্ভাবনী বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ২৫৭তম স্থান অর্জন করেছে উত্তরা ইউনিভার্সিটি। ২০২৪ সালে ওই র‌্যাংকিংয়ে উত্তরা ইউনিভার্সিটির অবস্থান ছিল ২৭৬তম; অর্থাৎ এবারে ১৯ ধাপ অগ্রগতি ঘটেছে, যা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য এক বিশাল অর্জন। আবার এবারই প্রথমবারের মতোন টাইমস হায়ার এডুকেশন এবং কিউ এস এশিয়া, এ দুটি বৈশ্বিক মান যাচাইয়ে আমরা অংশ নিতে শুরু করেছি। এসব কিছুর পেছনে একটাই কারণ, আমরা আমাদের মানকে আন্তর্জাতিক মানদ-ের সঙ্গে তুলনা এবং যাচাই করতে পারি।

শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও গবেষণায় শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩৩ হাজার শিক্ষার্থী বর্তমানে বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত আছেন। তারা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ রেখে চলেছেন। সরকারি চাকরি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসহ দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় আমাদের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। ইতিমধ্যে উত্তরা ইউনিভার্সিটি ৯টি সমাবর্তন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।

দেশ রূপান্তর : ভর্তির সময় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ফল ছাড়া আর কী কী বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়?

অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা : যেহেতু বর্তমান যুগে বিভিন্ন দক্ষতার ওপর বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়, যুগের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে আমরা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য স্কিল অ্যাসেসমেন্ট টেস্ট রেখেছি। এর মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের সক্ষমতা যাচাই করে থাকি। ক্ষেত্র বিশেষে কিছু প্রোগ্রামের জন্য এই অ্যাসেসমেন্ট টেস্টের পরও ইন্টারভিউ নেওয়া হয়ে থাকে।

দেশ রূপান্তর : ভর্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আপনারা কী কী বিষয় মূল্যায়ন করেন?

অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা : আমাদের কাছে সবসময়ই শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন বিষয় শেখার আগ্রহ, দক্ষতা অর্জনের স্পৃহাটাই মুখ্য। আমাদের অ্যাসেসমেন্ট টেস্টটাও আমরা সেভাবেই সাজিয়েছি। এরপর আমরা শিক্ষার্থীদের এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। সামাজিক কার্যক্রমে ভলান্টারি কাজ করার আগ্রহ, ললিতকলায় দক্ষতাও আমরা খুবই মূল্যায়ন করে থাকি।

দেশ রূপান্তর : এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন শিক্ষক পড়ান? শিক্ষার্থী কতজন আছেন? শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত কেমন? এটা কি সন্তোষজনক মনে করেন?

অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা : বর্তমানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি অনুষদের অধীনে ৩৮টি প্রোগ্রামে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। ফুলটাইম ও পার্টটাইম মিলিয়ে আমাদের রয়েছে প্রায় ৪৫০ জন শিক্ষক।

যদিও গ্লোবালি স্বীকৃত মানদন্ড হলো ১:৩০, আমরা সচেষ্ট থেকে এটিকে ১:৪০-এ সীমাবদ্ধ রাখতে পেরেছি। আসলে আমাদের দেশের জনসংখ্যাগত বাস্তবতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মতভাবে মানসম্মত শিক্ষা ও সেবা প্রদানই আমাদের মূল লক্ষ্য।

দেশ রূপান্তর : শিক্ষার গুণগত মান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। এই দুটি মান বজায় রাখতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়?

অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা : আমি প্রথমেই বলেছি উত্তরা ইউনিভার্সিটিকে একটা শিক্ষার্থীবান্ধব ইউনিভার্সিটি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমরা বদ্ধপরিকর। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই এখানে। প্রতিটি শিক্ষা সেশনের শুরুতেই আমাদের শিক্ষকদের জন্য আমরা ট্রেনিংয়ের আয়োজন করে থাকি, যাতে তারা প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীবান্ধব হতে পারেন। আমাদের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেল এ ক্ষেত্রে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে যৃগের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে আমাদের শিক্ষকরা আপডেটেড নলেজ পেয়ে নিজেদের আরও শিক্ষার্থীবান্ধব করে গড়ে তুলতে পারেন।

দেশ রূপান্তর : গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও নতুন গবেষণা তথ্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম দায়িত্ব। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, এমন কেউ আছেন কি যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন?

অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা : আমরা শুরু থেকেই নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছি। শিক্ষকরা যাতে গবেষণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন, সেজন্য তাদের যথাযথ সময়, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। আমাদের গবেষণা সেল নিয়মিতভাবে কর্মশালা ও প্রকাশনার আয়োজন করে থাকে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এমওইউ চুক্তি এবং যৌথ গবেষণার মাধ্যমে আমাদের শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবদান রেখে চলেছেন।

দেশ রূপান্তর : এখানে এমন কোনো বিশেষ গবেষণা হয়েছে কি, যা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গৌরব বয়ে এনেছে?

অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা : উত্তরা ইউনিভার্সিটির শিক্ষকরা নিয়মিতভাবে স্কোপাস ইনডেক্সড জার্নালসমূহে গবেষণা প্রকাশ করছেন। আমাদের ডিপার্টমেন্ট অব ফিজিক্সের অধীনে পরিচালিত সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ন্যানোপার্টিকেলস সিনথেসিস থেকে নিয়মিতভাবেই বিশ্বমানের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি তাদের এক উদ্ভাবনী গবেষণায় ন্যানোপার্টিকেলস ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অবকাঠামোগত প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা হয়েছে। এই গবেষণার ফলেই ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ফর ইনোভেশন (ডটজও) ২০২৫-এ উত্তরা ইউনিভার্সিটি ১৯ ধাপ অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গর্বের বিষয়।

তবে আমরা এখানেই থেমে নেই; গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়ন, এই তিনটি ক্ষেত্রকেই আমরা ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছি। নতুন প্রজন্মকে সেই উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

দেশ রূপান্তর : নিজস্ব ক্যাম্পাসে শিক্ষাদান হয় তো? এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দিতে পারেন?

অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা : ২০২৩ সালে উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব ক্যাম্পাসে শিক্ষাদান শুরু করে। আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আমাদের কাজ শুধু পাঠদানে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক তরুণের আত্মপরিচয় তৈরি শুরু হয় এবং এই কাজটা সে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে বিচরণ করেই করতে শেখে। তাই নিজস্ব ক্যাম্পাস থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গর্বের এবং তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে ওউন করার বিষয়টিও এভাবেই গড়ে ওঠে।

৭৭, উত্তরা বেড়িবাঁধ রোডে খুবই চমৎকার, মনোরম পরিবেশে আমাদের উত্তরা ইউনিভার্সিটি অবস্থিত। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা আমাদের ক্যাম্পাসে এলে যে কারও মন ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। আমাদের ক্যাম্পাস সবসময়ই আমাদের শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকে, যা ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের।

দেশ রূপান্তর : শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা কেমন?

অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা : উত্তরা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থাও এখানে রয়েছে। সম্পূর্ণ সিসিটিভি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আমাদের আবাসিক হোস্টেলে শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ২৪/৭ ওয়াইফাই সুবিধা। আমাদের প্রতিটা ডর্মিটরি সম্পূর্ণ শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে তিনবেলা উন্নত খাবারের ব্যবস্থা। এ ছাড়া ওয়াশিং মেশিন, গেমস, টিভিসহ অন্যান্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাও এখানে রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এখানেও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় সুযোগ থাকা উচিত। তাদের জন্য এখানে কী ধরনের ব্যবস্থা আছে?

অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা : ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবন্ধীদের সুযোগ তৈরির বিষয়ে আমি খুবই সহনশীল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার কলামেও প্রতিবন্ধীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়ে আমি নিজে কলম ধরেছি। কাজেই উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে না, এটা অবান্তর। আমি এটাকে সুযোগ বলতে রাজি না। কেননা, প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধ হওয়া উচিত।

উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য র‌্যাম্প, পৃথক ওয়াশরুমসহ যাবতীয় সুরক্ষা নিশ্চিতের সব ব্যবস্থাই রয়েছে। পরীক্ষার সময় শ্রুতি লেখকের ব্যবস্থাও এখানে রয়েছে। আমরা প্রতিনিয়তই একটি ইনক্লুসিভ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। সক্ষমতা বাড়লে আমরা ব্রেইল পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা রাখার আশা রাখি।