মানুষের জীবন এক বৈচিত্র্যময় উপাখ্যান, যেখানে সুখ ও দুঃখ, আনন্দ ও বেদনা একে অপরের হাত ধরে চলে। এই নশ্বর পৃথিবীতে কেউ-ই ভুলের ঊর্ধ্বে নয় এবং বিপদাপদ থেকেও মুক্ত নয়। তবে একজন মুমিনের বিশেষত্ব হলো, সে জীবনের প্রতিটি বাঁকে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং তার তকদির বা নির্ধারিত ভাগ্যকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়। জাগতিক ঝড়ঝাপটা কিংবা মানবিক দুর্বলতা তাকে বিচলিত করতে পারে না, বরং ইমান ও ধৈর্যের শক্তিতে সে থাকে অবিচল। শয়তানের প্ররোচনায় বা নফসের ধোঁকায় পা দিলেও সে নিরাশ হয় না, বরং অনুশোচনার অশ্রু নিয়ে দয়াময় প্রভুর দিকে ফিরে আসে। একজন মুমিন জীবনের উত্থান-পতনে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে এবং বিপদে ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে নিজের আত্মিক প্রশান্তি নিশ্চিত করে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিদের জীবনাদর্শ থেকে নেওয়া শিক্ষাই আমাদের দেখিয়ে দেয়, প্রকৃত সফলতার পথ হলো আল্লাহর রহমতের ওপর অটল বিশ্বাস রাখা এবং সর্বদা তার কাছেই আত্মসমর্পণ করা। রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ তার বান্দার তওবায় এমন আনন্দিত হন, যেমন সেই মানুষ আনন্দিত হয়, যে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে হারানো বাহনটি ফিরে পায়। এক ব্যক্তি তার বাহন নিয়ে নির্জন মরুভূমিতে বিশ্রামের জন্য নেমেছিল। তার বাহনের সঙ্গেই ছিল তার খাবার-দাবার। কিছুক্ষণ ঘুমানোর পর জেগে দেখে, বাহনটি নেই। চারদিকে খুঁজেও না পেয়ে তাপ ও তৃষ্ণায় ক্লান্ত হয়ে যখন মৃত্যুর আশঙ্কা দেখা দিল, তখন সে ফিরে এসে আগের জায়গায় আবার শুয়ে পড়ল। ঘুম ভেঙে যখন মাথা তুলল, দেখল তার হারানো বাহনটি ঠিক তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। (সহিহ বুখারি)
মানুষের অবস্থা এমনই, কখনো আনুগত্যে ঊর্ধ্বমুখী, কখনো অবাধ্যতায় নিম্নমুখী। কিন্তু প্রকৃত ধার্মিক সেই ব্যক্তি, যে ভুল করলে দ্রুত তওবা করে ফিরে আসে, নিয়মিতই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং বিপদাপদে আল্লাহর ওপর ভরসা করে কর্মচেষ্টা অব্যাহত রাখে। আমাদের উচিত আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে তার ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা এবং অন্তরের স্বভাবজাত বক্রতা থেকে তার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা। কেননা যে স্বভাব ভুল করা ও স্খলনের প্রবণতা রাখে তা আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। হাদিসে এসেছে, হানজালা আল-আসাদি (রা.) ছিলেন রাসুল (সা.)-এর লেখক। তিনি বলেন, একদিন আবু বকর (রা.) আমার সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করলেন, হানজালা, কেমন আছ? আমি বললাম, হানজালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে! তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, সুবহানাল্লাহ! তুমি কী বলছ? আমি বললাম, আমরা যখন আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সান্নিধ্যে থাকি, তিনি এমনভাবে জান্নাত-জাহান্নামের কথা স্মরণ করিয়ে দেন যেন আমরা তা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পর স্ত্রী-সন্তান ও দৈনন্দিন জীবনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তখন অনেক কিছুই ভুলে যাই। আবু বকর (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম! আমরাও একই অবস্থা অনুভব করি। আবু বকর (রা.) বলেন, আমরা দুজন রাসুল (সা.)-এর কাছে গিয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, হানজালা মনে করছে সে মুনাফিক হয়ে গেছে। নবী করিম (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, বিষয়টি কী? আমি পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। তখন রাসুল (সা.) বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ, তার শপথ! যদি তোমরা আমার সঙ্গে থাকাকালীন এবং পরে সেই অবস্থায় থাকতে, তাহলে ফেরেশতারা তোমাদের ঘুমের বিছানায় ও পথ চলাতেও তোমাদের সঙ্গে করমর্দন করত। কিন্তু হে হানজালা, কিছু সময় আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদতের জন্য আর কিছু সময় দুনিয়ার চাহিদা পূরণের জন্য। এ কথা তিনি তিনবার বলেন। (সহিহ মুসলিম ২৭৫০)
অতএব আমাদের উচিত হবে, আল্লাহ আমাদের যে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন, সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা। সেগুলো উপলব্ধি করা এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী আনন্দ থেকে আমরা যা হারাই, কিংবা জীবনে যে কষ্ট, ক্লেশ ও পরীক্ষার মুখোমুখি হই, এসবের মধ্যে সওয়াব ও প্রতিদান খুঁজে নেওয়া জরুরি। কারণ দুনিয়ার প্রকৃতি এমনই, এটি স্বভাবতই পরীক্ষা ও দুঃখ-বেদনার স্থান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, হে আমার ইমানদার বান্দারা! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। যারা এ দুনিয়ায় সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে মঙ্গল। আর আল্লাহর ভূমি তো প্রশস্ত। নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিফল হিসাব ছাড়াই দেওয়া হবে।’ (সুরা জুমার ১০) তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা ১৫৫)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের ব্যাপার সত্যিই বিস্ময়কর! তার সকল অবস্থাই তার জন্য কল্যাণময়। এটি কেবল মুমিনের ক্ষেত্রেই ঘটে। যদি তার কাছে কোনো সুখ-সমৃদ্ধি আসে, সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তা তার জন্য কল্যাণ হয়ে যায়। আর যদি তার ওপর কোনো কষ্ট বা বিপদ আসে, সে ধৈর্যধারণ করে, সেটিও তার জন্য কল্যাণের কারণ হয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম) মুমিনের জীবন কেবল পার্থিব সুখ বা দুঃখের নিরিখে বিচার্য নয়, বরং তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক নিরন্তর সাধনা। ভুলত্রুটি ও পদস্খলন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলেও তওবার মাধ্যমে ফিরে আসাই হলো মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য। জীবনের প্রতিটি বাঁকে যে পরীক্ষা ও প্রতিকূলতা আসে তা মহান রবের পক্ষ থেকে এক বিশেষ দান, যা বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং পাপ মোচন করে। তাই সাময়িক বিপর্যয়ে হতাশ না হয়ে আল্লাহর রহমতের ওপর অগাধ বিশ্বাস স্থাপন করাই হলো মুক্তির একমাত্র পথ। সুখে কৃতজ্ঞতা এবং দুঃখে সবর অবলম্বন করে আমরা যদি তকদিরের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারি, তবেই আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন জীবন সার্থক হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার এবং তার সন্তুষ্টি অর্জন করার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক
muftimahbub503@gmail.com