প্রতিভাবান তকমা লেগে নেই গায়ের সঙ্গে। ছিলেন না দেশের একমাত্র ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও ছাত্র। মুখে খইয়ের মতো ইংরেজিও ফোটে না, বরং বাচনভঙ্গিতে লেগে আছে সোঁদা মাটির গন্ধ। তাই তো তাইজুল ইসলামকে খুঁজে পাওয়া যায় না কোনো পডকাস্টে বা ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্টে। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগেও তাকে দলে নিতে হয় না ‘ক্ল্যাশ অব দ্যা টাইটানস’। তবে তাইজুল মনে করেন তিনি আছেন নিজের জায়গাতেই, নিজের মতো করেই এগিয়ে যাচ্ছেন নিজস্ব লক্ষ্যের দিকে। কারও ছায়ার আড়ালে থাকতে চান না বনলতা সেনের নাটোর থেকে উঠে আসা এই বামহাতি স্পিনার।
শুক্রবার ৪ উইকেট নিয়েছেন আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। তাতে করে টেস্টে উইকেট সংখ্যায় সাকিব আল হাসানকে ছুঁয়েছেন। এই মুহূর্তে টেস্ট ক্রিকেটে সাকিবের সঙ্গে যুগ্মভাবে তাইজুলই টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে বেশি উইকেটের মালিক। আইরিশরা আবার ব্যাটিংয়ে নামলে নিঃসন্দেহে সাকিবকে ছাড়িয়ে যাবেন তাইজুল। সাকিবের যেহেতু আবারও টেস্ট খেলার সম্ভাবনা কম (কানপুরে বিদেশের মাটিতে শেষ টেস্ট বললেও সম্প্রতি বলেছেন তিনি কোনো সংস্করণ থেকেই অবসর নেননি) আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মেহেদী হাসান মিরাজ ৩৭ উইকেট পেছনে (২০৯ উইকেট), তাতে বলে দেওয়াই যায় যে নিকট ভবিষ্যতে তাইজুলের শীর্ষ আসনে ভাগ বসাতে আসছেন না কেউ। তবে সাকিবের সঙ্গে তুলনা, সাকিব টেস্টে অনিয়মিত (পড়–ন সাময়িক নিষিদ্ধ) হয়ে ওঠার পরই মূলত তাইজুলের ভূমিকা বদলে যাওয়া এবং ক্রমশ হয়ে উঠেছেন দলের প্রধান স্পিনার, অন্তত দেশের মাটিতে খেলা টেস্টগুলোতে। কিন্তু তাইজুল এই তুলনা আর শুনতে চান না, ‘তাইজুল তো তাইজুলের জায়গাতেই আছে। এখন এই প্রশ্নগুলো আমার কাছে বারবার আসে কী জন্য এটা আমিও জানি না। তবে আপনি দেখবেন যে আমি যদি নিজেই নিজেকে নিয়ে কথা বলি সেটাও (ভালো) হবে না। কারণ আমাদের আগে যারা সিনিয়র ভাইরা ছিল যারা আমাদের সঙ্গে অনেকদিন খেলেছে, আপনি যখন একটা সিনিয়র প্লেয়ার হবেন আসলে টিমকে দেওয়ার জন্য অনেক কিছু থাকে। সেটা হলো জুনিয়রদের মোটিভেশন করতে পারেন বা সিনিয়রদের একটা এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে কথা বলতে পারেন। আসলে এটা জুনিয়র প্লেয়ারদের বা আপকামিং প্লেয়ারদের অনেক হেল্প হয়। তো আমার কাছে মনে হয় যে সাকিব ভাইয়ের কাছ থেকে আমরা এই জিনিসটা পেয়েছি যে আমাদের যারা জুনিয়র এসেছে বা যারা অনেকদিন ধরে খেলছি তাদের কাছ থেকে অনেক ধরনের এক্সপেরিয়েন্স পেয়েছি। সাকিব ভাই, মুশফিক ভাই, তামিম ভাই, রিয়াদ ভাই যারাই ছিল আর কি। তো আসলে একটা টিম তখনই স্ট্যাবল হবে যখন সবার সঙ্গে সবার বন্ডিং ভালো থাকবে। তো আমার কাছে মনে হয় যে যারা সিনিয়র ছিল তারা এই কাজগুলো করেছে। আর আমি তখনই তাইজুল, আমার নাম তখনই উঠে আসবে যখন আমি পারফর্ম করব। আমার কাছে মনে হয় মূল বিষয়টা ওটাই, যে আমি পারফরম্যান্স করছি যে কারণে জাতীয় দলে আছি। যখন পারফরম্যান্স করব না তখন হয়তো-বা আমার নামটাও আসবে না বা আমি এতদূর খেলতেও পারব না।’
সাকিবের সঙ্গে তুলনা বা সাকিবের ছায়ায় ঢেকে থাকা, এসব প্রসঙ্গেও স্পষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করেছেন তাইজুল, ‘না আসলে জিনিসটা এমন না। আপনি যখন জাতীয় দলে খেলবেন তখন আপনাকে সব সময় পারফরম্যান্স করতে হবে, এটা হচ্ছে পারফরম্যান্সের জায়গা। আর আমি সাকিব ভাইকে কী দিতে পেরেছি এটা কোনো মুখ্য বিষয় না। বাট সাকিব ভাই যতদিন ছিল বাংলাদেশ টিমকে অনেক কিছু দিয়েছে এবং ইন্ডিভিজুয়ালি যে আমরা পার্সোনাল যারা প্লেয়ার, উনার অভিজ্ঞতা ছিল, উনি অনেকদিন ওয়ার্ল্ডের এক নম্বর পজিশনে ছিল। আসলে একটা মানুষ তো এক নম্বর পজিশনে এমনি এমনি যেতে পারে না। অবশ্যই উনার মধ্যে ও রকম কিছু ছিল, ও রকম কোয়ালিটি ছিল। আমরা চেষ্টা করছি আরকি ওই জিনিসগুলো নেওয়ার জন্য এবং আমাদের উনি সবসময় সাজেশনও দিতেন এবং আমাদের উনার অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু পেরেছে আমাদের সাথে ডিসকাস করেছে যে আমরা আসলে কীভাবে আগাতে পারি।’
২৪৬ উইকেটের পর কোথায় থামতে চান, এমন প্রশ্নে তাইজুল জানিয়েছেন তার নির্দিষ্ট কোনো চাওয়া নেই, ‘আমাকে যদি আল্লাহ ৭০০টা দেয় আমি ৭০০টাই নিতেই রাজি আছি।’ বয়স ৩৩, খেলছেন ৫৭তম টেস্ট ম্যাচ। বাস্তবতার নিরিখে ৭০০ উইকেট হয়তো অসম্ভবই, তবে তাইজুল যে বেশ লম্বা সময় টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির জায়গাটা নিজের করে রাখবেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। হয়তো এই অর্জনের মাধ্যমেই সাকিবের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দিলেন তাইজুল, কারও বিকল্প নয় নিজস্ব পরিচয়েই তিনি হতে চান পরিচিত।