প্রায় আড়াই বছর পর মিরপুরের শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কোনো টেস্ট পঞ্চম দিনে গড়াল। ২০২২ সালের মে মাসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টটা গড়িয়েছিল শেষ দিনে। সেই ম্যাচে তৃতীয় দিনে খানিকটা বৃষ্টির বাগড়া ছিল, ভেজা মাঠের জন্য খেলাও বন্ধ ছিল। তবে চলমান ঢাকা টেস্টে চতুর্থ দিনে দুই ওভার আলোক স্বল্পতায় না হওয়া বাদে আর কোনো ‘ওভার লস’ নেই। আয়ারল্যান্ড ও বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ভালো ব্যাটিং, ভালো উইকেট, ভালো আবহাওয়া সব মিলিয়েই টেস্টের আয়ু বেড়েছে শেরেবাংলায়। জিততে হলে পঞ্চম দিনে বাংলাদেশকে নিতে হবে আরও ৪ উইকেট, আইরিশরা যদি পুরো দিনটাই ব্যাটিং করে কাটিয়ে দিতে পারে তাহলে ম্যাচটা হবে ড্র। আর যদি অবিশ্বাস্যভাবে আরও ৩৩৩ রান তারা করে ফেলতে পারে, তাহলে জিতেই যাবে ঢাকা টেস্ট।
চতুর্থ দিনের সকালে বাংলাদেশ দ্রুত দুটো উইকেট হারায়। ৭৮ রান করা সাদমান ইসলাম অ্যান্ডি ম্যাকব্রাইনের বলে লেগবিফোর উইকেট হয়ে আউট হন, এক রান করে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত জর্ডান নেইলের শর্ট পিচ বলে ব্যাকফুটে গিয়ে ক্যাচ দেন গালিতে। এক রানের ব্যবধানে দুই উইকেট নিয়ে আইরিশরা বেশ উজ্জীবিত, তবে মুশফিকুর রহিম ও মমিনুল হক ফের তাদের আশার গুড়েবালি ঢেলে গড়েছেন লম্বা জুটি। ১৬৭ বলে দুজনের ১২৩ রানের জুটি, মধ্যাহ্ন বিরতির পর সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগানো মমিনুল যখন ৮৭ রানে সিলি মিডঅফে ক্যাচ দিয়ে বসলেন, তখন শান্তও সংকেত দিয়ে দিলেন ইনিংস ঘোষণার। অন্যপ্রান্তে মুশফিকুর রহিম তখন ৫৩ রানে অপরাজিত। নিজের ১০০তম টেস্টের প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় ইনিংসে হাফসেঞ্চুরি করলেন মুশফিক, তাতে রেকর্ড বইতে তার উজ্জ্বল্য আরেকটু বাড়ল। শততম টেস্টে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করা একমাত্র ক্রিকেটার রিকি পন্টিং, মুশফিক প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় ইনিংসে হাফসেঞ্চুরি করে পন্টিংয়ের কীর্তির কিছুটা কাছাকাছি। জো রুট ১০০তম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরি করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিলেন ৪০ রান, তাই বলা যায় পন্টিংয়ের কীর্তির সবচেয়ে কাছাকাছি যেতে পেরেছেন মুশফিকই। আরও ১ ঘণ্টা বাংলাদেশ ব্যাটিং করতে পারত কি না, এমন প্রশ্ন রাখা হয়েছিল সংবাদ সম্মেলনে আসা বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলের কাছে। তিনিও বললেন যে, ইনিংস ঘোষণা আরও ১ ঘণ্টা দেরিতেও করা যেত, তবে দলের লিড যেহেতু ৫০০ রানের বেশি হয়ে গেছে তখন অধিনায়কের কাছে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলগত লক্ষ্যই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। দলীয় খেলা হলেও ব্যক্তিগত অর্জনই দলের সাফল্য বাড়ায়, এটা আশরাফুলের নিজস্ব মত। তবে তাইজুল ইসলাম অনেকটা নীরবেই সাকিব আল হাসানকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ টেস্ট উইকেটশিকারি হয়ে যাওয়াটাকে আশরাফুল দেখছেন পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিতে, ক্রিকেট খেলাটাই এমন, যেখানে ব্যাটসম্যানদের সাফল্যই বেশি উদযাপিত হয়!
৫০৯ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নামা আয়ারল্যান্ড চেয়েছিল একটা স্থিতিশীল উদ্বোধনী জুটি। যেটা হতে দিলেন না তাইজুল, ১৩ রান করা অ্যান্ডি বলব্রাইনকে এলবিডব্লিউ করে পতন ঘটালেন প্রথম উইকেটের। এরপর পল স্টার্লিংও তাইজুলের শিকার, ক্যাচ দিয়েছেন মাহমুদুল হাসান জয়ের হাতে। কেড কারমাইকেল আর হ্যারি টেক্টর মিলে ৫০ রানের একটা জুটি গড়ে খানিকটা দৃঢ়তা দেখালেন, ১৯ রানে কারমাইকেলকে এলবিডব্লিউ করে সেটাও থামালেন হাসান মুরাদ। হাফসেঞ্চুরি করা হ্যারি টেক্টরকেও ফিরিয়েছেন এই তরুণ বামহাতি স্পিনার, লং-অফে উড়িয়ে মারতে গিয়ে টেক্টর ক্যাচ দিয়েছেন মুশফিকুর রহিমকে। আইরিশ ব্যাটিংয়ের অন্যতম ভরসার নাম লোরকান টাকারকে মাত্র সাত রানে ফিরিয়েছেন খালেদ আহমেদ, উইকেটরক্ষক টাকার ক্যাচ দিয়েছেন উইকেটের পেছনেই; লিটন দাসের হাতে। তাইজুলের আরেক শিকার স্টিফেন ডোহেনি। ১৭৬ রান তুলতে ৬ উইকেট হারিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা শেষ করেছে আইরিশরা। কার্টিস ক্যাম্ফার অপরাজিত ৩৪ রানে আর অ্যান্ডি ম্যাকব্রাইন অপরাজিত ১১ রানে। খেলাটা পঞ্চম দিনে গড়ানোয় আইরিশ স্পিন বোলিং কোচ ক্রিস ব্রাউন কিছুটা বিস্মিত। তবে শেষ দিনে তাদের লক্ষ্য একটা একটা করে ঘণ্টা কাটানো, লড়াইটা যতটা লম্বা করা যায়। আর বাংলাদেশের তো জিততে হলে চাই মাত্র চার উইকেট। দুই বামহাতি স্পিনার মিলে সকাল সকাল কাজটা সেরে ফেলবেন, নাকি এবাদত-খালেদদের হাত লাগাতে হবে সেটাই প্রশ্ন।