জাল কাগজে ভিসা নাকচ

জাল কাগজপত্র দিয়ে ও প্রতারণার মাধ্যমে ভিসা পাওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত অবস্থানের মাধ্যমে অভিবাসনের সুবিধা নেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ। ঢাকায় এসব দেশের দূতাবাস বলছে, প্রতারণার মাধ্যমে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে।

এ বিষয়ে সর্বশেষ সতর্কবার্তা এসেছে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকের কাছ থেকে। তিনি বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করা হলে ১০ বছরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।

ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশন গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে হাইকমিশনারের এ বক্তব্য তুলে ধরে বলেছে, ভিসা জালিয়াতি ও অবৈধ অভিবাসন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। যথাযথ যোগ্যতা ছাড়াই চাকরি ও অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ভিসার নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। এভাবে প্রতারক ও অপরাধী চক্রের কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্ব জুড়ে মানুষ আইনি ঝুঁিকতে পড়ছে। এমন আবেদনের ক্ষেত্রে ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। এতে মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাচারের শিকারও হচ্ছে।

সারাহ কুক বলেন, ভিসা পাওয়ার জন্য জালিয়াতির কারণে মানুষের স্বপ্ন ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবারগুলোও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি ভিসার ক্ষেত্রে শুধু সরকারি চ্যানেল ব্যবহার ও সব তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেন।

ভিসার জন্য জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে ব্রিটিশ হাইকমিশন এর আগেও কয়েকটি বিজ্ঞপ্তি দেয়। বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতিনিধি সেজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ও নগদ অর্থ চাওয়া, ভিসা ফি ব্যাংকে ট্রান্সফার অথবা ফোনের মাধ্যমে পরিশোধ করা, নিয়োগকারীর দেওয়া ভিসাসংক্রান্ত নথিতে ভুল ও ত্রুটি থাকাকে ভিসার আবেদনের সময় বিপদসংকেত হিসেবে গণ্য করতে আবেদনকারীদের পরামর্শ দেওয়া হয়। ভুয়া ট্রাভেল এজেন্ট, যুক্তরাজ্যের ভিসা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয় এমন সংস্থার সেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকতেও বলা হয়।

জার্মানির দূতাবাস গত ১৯ নভেম্বর এক ফেসবুক পোস্টে অনেক টাকার বিনিময়ে জার্মানিতে কাজের অনুমতি, ভিসার জন্য কাগজপত্র তৈরি, এমনকি ভিসার নিশ্চয়তা দেয়, এমন ব্যক্তি ও সংস্থার বিষয়ে সতর্ক করেছে। দূতাবাস বলেছে, ভিসার আবেদনের সঙ্গে জাল কাগজপত্র দেওয়া হলে সেগুলো যাচাই করে আবেদন নাকচ করা হয় এবং এ বিষয়ে তথ্য রেকর্ডে রাখা হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ভিএফএস গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কর্মী, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীসহ প্রায় সব ধরনের মানুষের ক্ষেত্রে ভিসার আবেদন নাকচ হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশে আগে সহজে ভিসা মিলত। কিন্তু এমন অনেক দেশের ভিসা পেতে এখন বেশ সময় লাগছে।

বিদেশে বাংলাদেশের কয়েকটি দূতাবাসের কর্মকর্তারা বলছেন, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর হাজার হাজার মানুষের বেআইনিভাবে অবস্থানের কারণেও অনেক দেশ ভিসা দেওয়া কমিয়ে দিচ্ছে। এর বাইরে, জাল কাগজপত্র জমা দেওয়া, ভিসার আবেদনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য না দেওয়া ও মারাত্মক ভুল তথ্য দেওয়ার কারণেও ভিসার আবেদন নাকচ হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে এক কূটনীতিক বলেন, ইতালি দেশটিতে অবৈধ হয়ে পড়া প্রতি কর্মীর বাংলাদেশে ফেরার বিপরীতে বৈধভাবে একজন করে কর্মী নেওয়ার কথা বলছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভিএফএস গ্লোবাল ১৬৫টি দেশে প্রায় চার হাজার অফিসের মাধ্যমে বিভিন্ন দূতাবাসের হয়ে ভিসার আবেদন গ্রহণ করে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে ২২টির বেশি ও ভারতে প্রায় ৮০টি দূতাবাসের হয়ে ভিসাপ্রার্থীদের সেবা দেয়।

ভিএফএস কর্মকর্তাদের হিসাবে, বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ থেকে করা ভিসার আবেদনের অন্তত ৬০ ভাগ নাকচ হয়।

ভিএফএসের হিসাবে, ২০২৪ সালে সংস্থাটি ঢাকায় বিভিন্ন দূতাবাসের হয়ে প্রায় ১২ লাখ ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করেছে।

ভিএফএস কর্মকর্তারা মনে করেন, ভিসাপ্রার্থীদের একটি বড় অংশ আবেদনের প্রক্রিয়া নিজে সম্পন্ন করেন না। অনেকে টাকার বিনিময়ে এজেন্টের সহায়তা নেন। অনেক অসাধু এজেন্ট ভিসাপ্রার্থীকে জানিয়ে বা না জানিয়ে অনেক সময় ইচ্ছেমতো তথ্য আবেদনে যুক্ত করে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস গত সেপ্টেম্বরে এক ফেসবুক পোস্টে বলেছে, ভিসার আবেদনের সঙ্গে জাল কাগজপত্র থাকলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব মার্কিন কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়। এর বাইরে জাল কাগজপত্র দিয়ে আবেদনকারীর জন্য ভিসা নিষিদ্ধও করা হতে পারে। ভিসা পেয়েছেন, এমন ব্যক্তিদের ভিসার মেয়াদের অতিরিক্ত সময় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান ও ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়েও দূতাবাস সতর্ক করেছে।

ঢাকায় থাই দূতাবাস গত সোমবার এক ফেসবুক পোস্টে বলেছে, মাত্র দুই ঘণ্টায় থাইল্যান্ডের ই-ভিসার নিশ্চয়তা দিয়ে কিছু সংস্থার প্রচারের প্রতি দূতাবাসের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। দূতাবাস বলেছে, কেউ ই-ভিসার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কারণ, ভিসার প্রতিটি আবেদন নিয়মানুযায়ী খতিয়ে দেখা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের নাগরিকদের বিভিন্ন দেশের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সৃষ্ট জটিলতার বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ভিসা দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌম এখতিয়ার। এ ক্ষেত্রে সরকারের তেমন কিছু করার নেই। তারপরও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে দূতাবাসগুলোকে নিয়মিত তাগিদ দেওয়া হয়ে থাকে।