মাদ্রিদের গ্রান ভিয়ায় টেলিফোনিকা স্পেসে আর্জেন্টিনার ৮৬'র বিশ্বকাপজয়ী তারকা হোর্হে ভালদানোর অনুষ্ঠানে মুখোমুখি বসেছিলেন টেনিসের ইতিহাসে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় রাফায়েল নাদাল। অবসর-পরবর্তী জীবনে মানিয়ে নেওয়া নাদালকে সামনে পেয়েছিল দর্শক ও গণমাধ্যম, আর ভালদানোর প্রশ্নে বারবার খুলে যাচ্ছিল নাদালের অন্তর্জগত।
শুরুতেই ভালদানোর রসিকতা—“তুমি জন্মানোর বছরেই মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ জিতেছিলাম”—নাদালের জবাব, “দুঃখিত, আমি তো দেখতে পারিনি।” এরপরই শুরু হয় গভীর আলাপ, নাদালের খেলার চরিত্র—পরিশ্রমী, আত্মত্যাগী, যুদ্ধংদেহী, মানসিকভাবে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা সেই খেলোয়াড়—নিয়ে।
তবে ভালদানোর কৌতূহল ছিল অন্য জায়গায়। এত বছর ধরে তাকে যে ‘শ্রমের প্রতীক’ বলা হয়, এতে কি নাদাল কখনও মনে করেছেন তার সূক্ষ্ম টেনিস দক্ষতা, তার প্রাকৃতিক প্রতিভা—সবই কি কিছুটা অবমূল্যায়িত? নাদাল হাসলেন। বললেন সেই বিখ্যাত কথাটি—সাফল্য ৯৯ শতাংশ পরিশ্রম, ১ শতাংশ প্রতিভা। তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন, করেছেন বিপুল ত্যাগ, কিন্তু তিনি যা করেছেন, সেটি নাকি অন্যরাও করতে পারে।
তবে এখানেই ভালদানোর প্রশ্ন—সবাই যদি পরিশ্রম করেই শীর্ষে পৌঁছাতে পারে, তাহলে নাদালের মত ব্যতিক্রমী প্রতিভা তৈরি হয় কীভাবে? নাদাল তখনই স্পষ্ট করেন—“আপনি যত খুশি অনুশীলন করুন, কিন্তু যদি বল যেখানে পাঠাতে চান, সেখানে না যায়, তাহলে শীর্ষ পর্যায়ে টিকে থাকতে পারবেন না। শুধু শরীর দিয়ে টেনিস হয় না, টেনিস কোয়ালিটি লাগেই।” তাঁর স্বীকারোক্তি—“প্রকৃতি আমার প্রতি উদার ছিল।”
আলাপে উঠে আসে তরুণ প্রতিভা লামিন ইয়ামালের প্রসঙ্গ। নাদাল বলেন শিশু বয়সে প্রতিভা চেনা, খেলায় আনন্দ পাওয়া, আগ্রহের জায়গায় নিজেকে ঘিরে ভালো মানুষ রাখা—এগুলো সাফল্যের বড় শর্ত। সাফল্যের মুহূর্তে মানুষ যা শুনতে চায় না, এমন কঠিন কথাগুলো বলার মতো মানুষ থাকা জরুরি। তিনি বলেন, “আমি জীবনে যা যা একজন কিশোর করে, সবই করেছি।”
নাদালের জীবনে মায়োরকা, মনোকর, তাঁর শৈশবের বন্ধুরা—সবই তাকে বাস্তবতার মাটিতে ঠেকে রেখেছে। নিউ ইয়র্ক, মোনাকো বা সাংহাইয়ের ঝলমলে আলো যেখানে তাকে দুনিয়ার তারকা বানায়, মায়োরকায় তিনি শুধু ‘আপনজনদের একজন’। নাদালের স্বীকারোক্তি, “আমি সব সময় বাড়ি ফিরে যাই। ছোট শহরে জন্মেছি, দ্বীপে বড় হয়েছি—জীবন এখানে এত তাড়াহুড়ো করে না।”
অবসরের প্রসঙ্গে তিনি পরিষ্কার—তিনি ‘ত্যাগ’ করেননি, ‘চেষ্টা’ করেছেন। “আমি কখনও আচ্ছন্ন ছিলাম না। প্রতিযোগী ছিলাম। যখন মনে হলো আমার মান অনুযায়ী প্রতিযোগিতা করতে পারছি না, তখন সরে দাঁড়িয়েছি। যা করতাম, তা এখনও ভালোবাসতাম। ক্লান্তি বা অনুপ্রেরণার অভাবে নয়, শরীর আর পারছিল না।”
সাফল্যের প্রশ্নে নাদালের স্মৃতি ২০০৪ সালের সেই সেভিয়ার ডেভিস কাপ পয়েন্টে ফিরে যায়। তবে পেশাদারি সাফল্যের আগেই তিনি ছোটবেলায় ছিলেন মায়োরকার এবং বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের চ্যাম্পিয়ন। এ কারণে পেশাদারি সাফল্য তাকে কখনও অভিভূত করেনি। “আমার বিকাশ সব সময়ই সাফল্যের সঙ্গে ছিল, তাই যখন আন্তর্জাতিক সাফল্য এলো, আমি প্রস্তুত ছিলাম।”
শেষে নাদাল টেনিসের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করেন: “ফুটবলে পুরো ম্যাচে একবার জ্বলে উঠলেও জয় সম্ভব। টেনিসে তিনটা দুর্দান্ত মুহূর্তেও গেম হারাতে পারেন। টেনিসে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।”