ঋণখেলাপির দৌরাত্ম্য

দীর্ঘ সময় ধরে শিথিল-রাজনৈতিক ব্যাংকিং নীতি, দুর্বল তদারকি এবং দায়হীন ঋণ সংস্কৃতি ব্যাংক ব্যবস্থায় গড়ে তুলেছে বিশাল ঋণের পাহাড়। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়ছে এমন হারে, অনেক অর্থনীতিবিদ যাকে তুলনা করছেন ‘পাগলা ঘোড়ার দৌড়’ হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, লুটপাট ও অদক্ষতার ছায়া গভীরভাবে জড়িয়ে ধরেছে ব্যাংক খাতকে। যে কারণে বর্তমানে ঋণখেলাপির বিষয়টি এই খাতের নাজুক অবস্থা এবং আর্থিক সুশাসনের অভাবকে ভয়ংকরভাবে প্রকাশ করছে। একসময় ঋণখেলাপি সংস্কৃতি শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন এটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়ছে। যে কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বর্তমানে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে দেশের ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং আর্থিক সুশাসন নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। ১৯৯৯ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল রেকর্ড ৪১ দশমিক ১ শতাংশ। এরপর এই হার কমতে কমতে ২০১১ সালে নেমে আসে ৬ দশমিক ১ শতাংশে। এরপর থেকে নন-পারফর্মিং ঋণ আবার বাড়তে শুরু করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বলছে, মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অঙ্ক শুধু আর্থিক খাতের দুর্বলতাকে উন্মোচন করছে না, ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে নজরদারি ও নিয়মকানুন প্রয়োগে কঠোরতা আনায় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা বেরিয়ে আসছে। আগে যেসব ঋণ পরিশোধ না হওয়া সত্ত্বেও কাগজে-কলমে নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতো, সেগুলো এখন মন্দ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।  এস আলম ও বেক্সিমকো গ্রুপের মতো ঋণগ্রহীতারা গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাপক হারে খেলাপিতে পরিণত হন। এতে পুরো খাতে খেলাপি ঋণ অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে হঠাৎ খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো গত কয়েক বছর খেলাপি অবস্থায় থাকা ঋণগুলোকে প্রকৃত খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। বেশ কিছু ব্যাংক খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রেখেছিল। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে লুকিয়ে রাখা খেলাপি ঋণ বের করে আনার উদ্যোগ নেয়। এরপর থেকে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা ৬১টি। এর মধ্যে ২৩ বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১৫ শতাংশের ওপরে। যার মধ্যে আবার কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫০ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত!

প্রশ্ন আসে, প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? আমরা দেখিনি, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, কোনো ঋণখেলাপিকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা শুনিনি, হিসাব চলমান অবস্থায় কাউকে শাস্তির আওতায় নেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় অর্থনীতিবিদরা, ঋণ আদায়ের পাশাপাশি খেলাপি ঋণদাতাদের শাস্তি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।   ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি আর মুনাফার নয়, বরং মূল বিষয় ব্যাংকগুলোর টিকে থাকার। তারা সতর্ক করে বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক এতটাই দুর্বল হয়ে পড়বে যে, এগুলো আর দেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করতে পারবে না। তখন কী অবস্থা হবে, অর্থনীতির সার্বিক চিত্রের! আমরা কি সবসময় ব্যাংক লুটেরাদের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হব! তারা কি অধরাই থাকবে?