নিলামে রিহ্যাবে থাকা ক্রিকেটার!

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দ্বাদশ আসরের খেলোয়াড় নিলামের বাকি আর মাত্র দুই দিন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে খেলোয়াড় তালিকা প্রকাশ না করলেও বিভিন্ন সূত্র থেকে দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে দেশি এবং বিদেশি খেলোয়াড়ের তালিকা। গত বুধবার বিপিএলের গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন বিপিএল খেলতে প্রায় পাঁচ শতাধিক ক্রিকেটার নাম নিবন্ধন করেছেন এবং সেখান থেকে বিসিবি ২৪৩ জনকে বাছাই করেছে। এই ‘বাছাই’ প্রক্রিয়ার চালুনি এমনই বড় ছিদ্রযুক্ত যে, নিলামের তালিকায় স্থান পেয়েছেন এমন একজন ক্রিকেটার যার বর্তমান ঠিকানা মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র! জিম্বাবুয়ের শন উইলিয়ামসের নাম আছে বিদেশি খেলোয়াড়ের তালিকায় ক্যাটাগরি ‘সি’-তে। খেলোয়াড় তালিকায় ৩৯ বছর বয়স্ক এই অলরাউন্ডারের ক্রমিক হচ্ছে ৫, নিবন্ধন আইডি ৪২৫। উইলিয়ামসকে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট তাদের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ দিয়েছে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় দলে বিবেচনা করছে না, তারা নিজেরা তদন্ত করে জেনেছে উইলিয়ামস দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত এবং নিজেই একটি মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছেন।

বিপিএল আর বিতর্ক যেন যমজ ভাই, আর ক্রমেই এই আসর রূপ নিয়েছে বিতর্কিত ও অবসরের প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে যাওয়া ক্রিকেটারদের আসর! ভারতের লেগস্পিনার পীযূষ চাওলা এই বছরের ৬ জুন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা করেছেন, তিনি বিপিএল খেলতে নাম লিখিয়েছেন খেলোয়াড় তালিকায়। আছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সেরা সময়টা বহু আগেই পেছনে ফেলে আসা ওয়েইন পারনেল, রবি বোপারা এবং সমিত প্যাটেল। সন্দেহজনক সব ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলতে দেখা যায় এই ত্রয়ীকে।

অচেনা, অদ্ভুতুড়ে সব নামের ভিড়ে চেনা কিছু নামও আছে। শ্রীলঙ্কার ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ না হওয়ার কারণে মাহেশ থিকশানা, মাথেশ পাতিরানার মতো আইপিএলের নিয়মিত ক্রিকেটারদের নাম আছে নিলাম তালিকায়, তবে তারা কে কতটা ম্যাচ খেলতে পারবেন সেসব এখনো নির্ধারিত নয়। সরাসরি চুক্তিতে ইংল্যান্ডের অ্যালেক্স হেলস আর পাকিস্তানের উসমান খান খেলবেন ঢাকা ক্যাপিটালে, পাকিস্তানের আবরার আহমেদ খেলবেন চট্টগ্রাম রয়্যালসে। সিলেট টাইটানসের দাবি, পাকিস্তানের সাইম আইয়ুব ও মোহাম্মদ আমিরকেও তারা সই করিয়েছে। ছয় নম্বর দল হিসেবে আসা নোয়াখালী এক্সপ্রেস সই করিয়েছে কুশল মেন্ডিসকে, এমনটাই দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

পাকিস্তানের টেস্ট অধিনায়ক শান মাসুদ, টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সালমান আলি আগা, সাবেক অধিনায়ক শোয়েব মালিক অনেকেই নাম লিখিয়েছেন বিপিএলে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কেসি কার্টি, কিমো পল, চ্যাডউইক ওয়ালটনের নাম আছে তালিকায়। তবে নিয়মিত খেলা কাইল মেয়ার্স, জেসন হোল্ডারসহ চেনা অনেক নামই নেই তালিকায়। ভরপুর ক্রিকেটার পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের। সঙ্গে জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসের ক্রিকেটারদের ছড়াছড়ি। যুক্তরাজ্য থেকেও নাম লিখিয়েছেন বেশ কয়েকজন যাদের বেশিরভাগই অচেনা।

এবারে আসা যাক দেশের ক্রিকেটারদের তালিকায়। নাঈম শেখ আছেন ‘এ’ ক্যাটাগরিতে, ভিত্তিমূল্য ৫০ লাখ। নাঈম জাতীয় দলে অনিয়মিত, ব্যাটিং কৌশল প্রশ্নবিদ্ধ। তবুও তিনি শীর্ষ শ্রেণিতে। অন্যদিকে জাতীয় দলের নিয়মিত উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান, তামিম ইকবালের পর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি করা দ্বিতীয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার পারভেজ হোসেন ইমন ‘বি’ ক্যাটাগরিতে, ভিত্তিমূল্য ৩৫ লাখ। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মুশফিকুর রহিমের মতো টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেওয়া ক্রিকেটাররাও ‘বি’ ক্যাটাগরিতে, এটা কোন যুক্তিতে তার কোনো ব্যখ্যা নেই! হাবিবুর রহমান সোহানকে অনেকেই মনে করেন টি-টোয়েন্টির উপযুক্ত ব্যাটসম্যান, তার স্থান ‘ডি’ ক্যাটাগরিতে। অনেক দিন ধরেই জাতীয় দল বা বিসিবির অন্য কোনো ছায়া দলে নেই আফিফ হোসেন, তাকে রাখা হয়েছে ‘সি’ ক্যাটাগরিতে। সাব্বির রহমান, এনামুল হক বিজয়, রনি তালুকদার, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত এরাও ‘সি’ ক্যাটাগরিতে আবার তরুণ পেসার, দেশের অন্যতম গতিশীল বোলার নাহিদ রানাও ‘সি’ ক্যাটাগরিতে। যেখানে বারবার সুযোগ পেয়েও জাতীয় দলে জায়গাটা পাকা করতে না পারা ইয়াসির রাব্বি যে সবশেষ রাইজিং স্টারস এশিয়া কাপেও দলকে ডোবাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তার নাম ‘বি’ ক্যাটাগরিতে।

সরাসরি সই করে নিলামের আগেই অনেক ক্রিকেটার নিজেদের ঠিকানা নিশ্চিত করেছেন। মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাসুম আহমেদ সিলেট টাইটানসে, মোস্তাফিজুর রহমান ও নুরুল হাসান সোহান রংপুর রাইডার্সে, তাসকিন আহমেদ ও সাইফ হাসান ঢাকা ক্যাপিটালসে, হাসান মাহমুদ ও সৌম্য সরকার নোয়াখালী এক্সপ্রেসে, শেখ মেহেদি ও তানভির ইসলাম চট্টগ্রাম রয়্যালসে। তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্তকে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স সই করিয়েছে, এমন খবর গণমাধ্যমে ছড়ালেও শান্ত টেস্ট সিরিজ শেষে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, এখনো সই করেননি আর প্রাপ্ত নথিতেও শান্ত বা তামিম কাউকেই রাজশাহীর সরাসরি চুক্তি হিসেবে দেখানো হয়নি। তাওহীদ হৃদয়, জাকের আলি অনিক, শামীম হোসেন পাটোয়ারিদেরও কেউ নেয়নি নিলামের আগে, বোঝাই যাচ্ছে তাদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের প্রভাব পড়েছে বাজারেও।

বিপিএল এমন এক আসর যেখানে সবকিছুই চলে গোঁজামিলে। খেলোয়াড় তালিকাতেও তার ব্যতিক্রম হবে না, এটাই স্বাভাবিক। তবে দিন শেষে নিলাম বলেই হয়তো যোগ্য ক্রিকেটারকে দলে নিতে একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি দর হেঁকে ভিত্তিমূল্যের বহুগুণ বেশি টাকা দিয়েই দলে নেবে প্রয়োজনীয় ক্রিকেটারকে, কারণ ড্রাফটের মতো এখানে ভাগ্যের জোরের চেয়ে অর্থ খরচে কৌশলী হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।