ভর্তির মৌসুমে মানসিক চাপ

আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ, এখন আর শুধু একটি স্বাভাবিক শিক্ষাগত ধাপ নয় এটি হয়ে উঠেছে এক নিঃশব্দ, তীব্র এবং বহুস্তরীয় মানসিক যুদ্ধ। যার নাম, ভর্তিযুদ্ধ। প্রতিবছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। কিন্তু সীমিত আসন, অসম সুযোগ ও সামাজিক চাপ এই প্রতিযোগিতাকে রূপ দেয় এক গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতায়। যেখান থেকে সহজে সমাধান মেলে না। আর মিললেও, তা বিভিন্ন সমস্যাযুক্ত। সে আবার অন্য আলোচনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি মৌসুম শুরু হতেই, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়। প্রস্তুতির দীর্ঘ পথ, ব্যয়বহুল কোচিং, বাসা থেকে দূরে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া, আর কখনো কখনো একই দিনে একাধিক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা সব মিলিয়ে একটি মানসিক চাপের পাহাড় তৈরি করছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো পরীক্ষার দিন সামান্য ভুল, অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার কারণে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ সবের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ঘাটতি, প্রশ্ন ফাঁসের গুজব কিংবা একাধিক ভর্তি পরীক্ষার জটিলতা শিক্ষার্থীদের বিপাকে ফেলে। অনেকেই দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও, কাক্সিক্ষত প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পান না। এর ফলেই তৈরি হয় হতাশা ও আত্মঅবিশ্বাস। এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ভর্তি প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, সহজ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব করা জরুরি। সমন্বিত পরীক্ষা ব্যবস্থা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং বিকল্প শিক্ষাপথ সন্ধানই হতে পারে কার্যকর সমাধান। অ্যাডমিশন যুদ্ধ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয় এটি একটি সমাজের মূল্যবোধ, ন্যায্যতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিমাপ। সময় এসেছে, সেই দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তব পরিবর্তনের পথে নিয়ে আসার। কিন্তু অনেকদিন ধরেই এমন কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কোনো পরিবর্তন নেই। যা ছিল, তাই  থাকছে। এভাবেই চলছে, বছরের পর বছর।

সম্প্রতি ভর্তি-সংক্রান্ত চাপ ও অভিজ্ঞতা জানতে ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০০ শিক্ষার্থীর ওপর একটি জরিপ চালানো হয়। জরিপে দেখা যায়, ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষাকে অতিমাত্রায় চাপপূর্ণ বলে মনে করেন। তাদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ জানান, একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষার কারণে মানসিক চাপে পড়তে হয়। ৫৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী কোচিং ব্যয়কে ভর্তিযুদ্ধের ‘বড় বাধা’ বলে উল্লেখ করেছেন। আর ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, পরীক্ষার দিন যাতায়াত সমস্যা, তাদের পারফরমেন্সকে প্রভাবিত করে। জরিপে আরও উঠে এসেছে, ৭৩ শতাংশষ শিক্ষার্থী মনে করেন ভর্তি প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও সমন্বিত হওয়া উচিত। প্রযুক্তিগত জটিলতার অভিযোগ তুলেছেন ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী, যারা বলেছেন অনলাইন আবেদন ও অ্যাডমিট কার্ড ব্যবস্থায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী মানসিক চাপের কারণে ঘুমের সমস্যা বা উদ্বেগে ভুগেছেন। সার্বিকভাবে জরিপ বলছে, ভর্তিযুদ্ধ শুধু প্রতিযোগিতা নয় এটি তরুণদের মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার জটিল প্রতিফলন। ভর্তিযুদ্ধের পেছনে মূলত কয়েকটি কাঠামোগত ও সামাজিক কারণ কাজ করে। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসন সংখ্যা শিক্ষার্থী চাহিদার তুলনায় অনেক কম। প্রতিবছর লাখো শিক্ষার্থী এইচএসসিতে উত্তীর্ণ হলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান মাত্র অল্পসংখ্যক। ফলে প্রতিযোগিতা অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হচ্ছে। ভর্তি পরীক্ষার বৈচিত্র্য ও একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। একই সময়ে একাধিক পরীক্ষার সূচি, বিভিন্ন প্রশ্নধারা এবং আলাদা প্রস্তুতি ভর্তিযুদ্ধকে আরও কঠিন করে তুলছে।

কোচিং নির্ভরতা একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মনে করেন কোচিং ছাড়া সাফল্য সম্ভব নয়। এর ফলে খরচ বেড়ে যায় এবং আর্থিক সামর্থ্যরে ওপর চাপ বাড়ে। প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা যেমন অনলাইন আবেদন জটিলতা, সার্ভার সমস্যায় অ্যাডমিট কার্ড ডাউনলোড না হওয়া, ভর্তি প্রক্রিয়াকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে। এ ছাড়া সামাজিক প্রত্যাশা ও পারিবারিক চাপও বড় কারণ। পরিবার ও সমাজ উচ্চশিক্ষাকে জীবন সফলতার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করায় শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত মানসিক চাপ অনুভব করেন। সবশেষে, শিক্ষা বিকেন্দ্রীকরণের অভাব ও বিকল্প দক্ষতাভিত্তিক পথের সীমাবদ্ধতা তরুণদের একমুখী প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়। সব মিলিয়ে এই কারণগুলো ভর্তিযুদ্ধকে স্পর্শকাতর ও কঠিন বাস্তবতায় পরিণত করেছে। ভর্তিযুদ্ধ কমাতে প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবসম্মত ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার। প্রথমত, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসনসংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ানো জরুরি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমবে। দ্বিতীয়ত, দেশ জুড়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা কার্যকর করতে হবে একদিনে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর অধীনে মূল্যায়ন হলে শিক্ষার্থীরা আলাদা আলাদা প্রস্তুতি, অতিরিক্ত খরচ ও যাতায়াতের ঝক্কি থেকে মুক্তি পাবেন। এছাড়া কোচিং নির্ভরতা কমাতে স্কুল-কলেজ পর্যায়ের পাঠ্যক্রমকে দক্ষতাভিত্তিক করা প্রয়োজন, যাতে ভর্তির প্রস্তুতির জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন না হয়। ভর্তি প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিগত সুবিধা বাড়াতে নিরাপদ ও ব্যবহারবান্ধব ডিজিটাল-ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। আবেদন, ফি জমা, আসন বরাদ্দ থেকে শুরু করে ফলাফল সবকিছুতে স্বচ্ছ ও নির্ভুল প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার গুরুত্বও বড়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু থাকলে শিক্ষার্থীরা ভর্তির চাপ সামলাতে পারবেন। পাশাপাশি বিকল্প শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক ক্যারিয়ার যেমন ভোকেশনাল ট্রেনিং, টেকনিক্যাল শিক্ষা, সার্টিফিকেশন কোর্স জনপ্রিয় করা হলে সবাইকে এক পথে ঠেলে দেওয়া লাগবে না। সামগ্রিকভাবে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি আধুনিক ভর্তিব্যবস্থা ভর্তিযুদ্ধকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।

ভর্তিযুদ্ধকে অনেকেই শুধু একটি শিক্ষা-সংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে দেখেন না। কারণ এটি আমাদের সমাজের কাঠামোগত অসাম্য ও অদক্ষতা প্রকাশ করে। বর্তমানে যে ভর্তি পদ্ধতি চলছে তা শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা, দক্ষতা বা সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। বরং পরীক্ষাকেন্দ্রিক, সময়সীমা-নির্ভর ও চাপভিত্তিক এই মূল্যায়ন তরুণদের সৃজনশীলতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আজকের তরুণদের শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনের জন্য বছরের পর বছর প্রতিযোগিতা করানো ন্যায়সংগত নয়। উন্নত দেশে যেমন দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রজেক্ট, আর নিরবচ্ছিন্ন মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয় আমাদের দেশেও ধীরে ধীরে সেদিকে যাওয়া প্রয়োজন। ভর্তিযুদ্ধের বর্তমান চিত্র বদলাতে হলে, শিক্ষানীতির সঙ্গে সমাজের মানসিক পরিবর্তনও জরুরি। শিক্ষাকে চূড়ান্ত সফলতার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখার প্রবণতা কমাতে হবে এবং বিকল্প পথকে সমান মর্যাদা না দিলে সমাধান তো আসবেই না জটিলতা আরও বাড়বে। ভর্তিযুদ্ধের তীব্রতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। প্রতিযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেটি যদি মানবিকতা হারায় তবে তা সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ভর্তি পরীক্ষার কাঠামোকে সহজ, স্বচ্ছ, আধুনিক, প্রযুক্তি সহায়তা বাড়ানো এবং মানসিক চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি দক্ষতানির্ভর শিক্ষা ও বহুমুখী ক্যারিয়ারপথ তৈরির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভরসা ও সম্ভাবনার পরিসর বাড়াতে হবে।

আমরা যদি উপলব্ধি করতে পারি, একটি ভর্তি পরীক্ষাতেই জীবনের সফলতা নির্ধারণ করে না তবে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ অনেকটা কমে যাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ ও কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ দিতে হলে ভর্তিযুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণে আনা নয়, বরং তা ধীরে ধীরে রূপান্তর করতে হবে। সেই পথ হোক ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দক্ষতাভিত্তিক পদ্ধতিতে। এতে উচ্চশিক্ষা হবে অধিক মানবিক। একই সঙ্গে দেশের উন্নয়ন হবে আরও টেকসই। মূলত ‘শিক্ষা’র সংজ্ঞা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। এর দায়িত্ব শিক্ষকের। তারা কোন ধরনের শিক্ষা দেবেন, সেটা নির্ভর করে তাদের ওপর। তরুণ প্রজন্ম সেই আলোকিত শিক্ষায় নিজেকে জড়িয়ে নিক, যা শুধু নিজস্ব নয় সমাজের প্রত্যেক শ্রেণির মানুষকে উপকৃত করবে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেই একজন শিক্ষার্থী সমাজে বিশাল ভূমিকা রাখবেন, সেটা ঠিক নয়। আর যারা পারল না, তারা ব্যর্থ এমন চিন্তাটাই মহাভুল। শুধু নিজেকে উন্নত পথে প্রবেশ করালেই কেউ উন্নত হবেন না। শিক্ষা যদি ‘মানুষ’ হিসেবেই নিজেকে গড়ে না তোলে তাহলে হাজার পরিশ্রম করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেই কী, আর না পেলেই বা কী? আর যারা পারল না, তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকৃত মানুষের পথে অগ্রসর হওয়ার বাড়তি সুযোগ থাকল।  সুতরাং কোনোভাবেই মেন্টাল ট্রমাতে আক্রান্ত হবেন না। একবার শুধু সিদ্ধান্ত নিন, আগামী আপনার। এর জন্য অপেক্ষা করছে প্রকৃত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। শুধু ভাবুন, দেশ আপনাকেই চাচ্ছে।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

saniatasnimlamia969@gmail.com