নাটোরের ঔষধি পল্লী

নাটোর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম জুড়ে ভেষজ পল্লীর অবস্থান। ১৯৯৫ সালের শুরুতে খোলাবাড়িয়া এলাকার আফাজ পাগলা কবিরাজি কাজে ব্যবহারের জন্য নিজেই ভেষজ উদ্ভিদের চাষাবাদ শুরু করেন। এরপর ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে। শেষে ইউনিয়ন জুড়ে। শুধু আবাদি জমিই নয়, গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আনাচে-কানাচে, রাস্তার ধারে, নদীর পাড়ে চোখে পড়ে ভেষজ উদ্ভিদের গাছ।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়াতে ১৪০ প্রকার ভেষজ উদ্ভিদ জন্মে। এর মধ্যে অ্যালোভেরা, শিমুল মূল, অশ্বগন্ধা, মিশ্রি দানা, বিটরুট, রোজেলা ও শতমূল প্রসিদ্ধ। ভেষজ উদ্ভিদের মোট ১৫৫ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৭০ হেক্টরে ঘৃত কুমারী বা অ্যালোভেরা চাষ হচ্ছে। ৫০ হেক্টর আবাদি জমি থেকে পাওয়া যাচ্ছে এক হাজার ২০০ টন শিমুল মূল। ১২ হেক্টরে বিটরুট এবং পাঁচ হেক্টর মিশ্রি দানার আবাদি জমি থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৫০ টন করে ভেষজ। ১০ হেক্টর থেকে পাওয়া যাচ্ছে ১২ টন অশ্বগন্ধা। ইউনিয়নের দুই হাজার কৃষক ভেষজ উদ্ভিদ চাষের সঙ্গে জড়িত।

নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক বিঘা জমিতে অ্যালোভেরার ১০ হাজার চারা রোপণ করা যায়। পরবর্তী দুই বছর অ্যালোভেরার পাতা সংগ্রহ করা সম্ভব। বিঘাপ্রতি অ্যালোভেরার গড় উৎপাদন প্রায় ৩০ টন।

কৃষক মোবারক মিয়া জানান, অ্যালোভেরার নতুন চারা রোপণের মৌসুম এখন। দীর্ঘমেয়াদি বর্ষার কারণে এবার অ্যালোভেরার পচন রোগে অনেক পাতা নষ্ট হয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। চারার দরও এবার বেশি। অ্যালোভেরা প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো উপায় এলাকাতে নেই। পাতা সংগ্রহ করে দ্রুত বাজারজাত করতে হয়। ওষুধ ও প্রসাধন শিল্পে, জুস ও শরবত তৈরিতে হামদর্দসহ বেশ কয়েকটি ওষুধ কোম্পানি অ্যালোভেরার পাতা কিনেন। ময়মনসিংহের ভালুকাতে জুস তৈরির কারখানা তাইওয়ান সিন লিন এন্টারপ্রাইজ অ্যালোভেরার বড় ক্রেতা। এ ছাড়া প্রতিদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অ্যালোভেরা পাঠাচ্ছেন।

উৎপাদিত ভেষজ উদ্ভিদ শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তৈরি হয় নানা রকম ভেষজ ওষুধ। এলাকার প্রায় একশটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব বিক্রি হয়। আমিরগঞ্জ বাজার এলাকায় বনলতা ভেষজ ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী কাজী কবির আহমেদ জানান, এই বাজারে শতাধিক ভেষজ বিক্রি হয়। প্রতিদিন গড়ে বিক্রি হয় ৮০ হাজার টাকা। সমবায় নেতা ও কবিরাজ মো. জয়নাল আবেদিন বলেন, অ্যালোভেরা সংরক্ষণে হিমাগার নির্মাণ ও সাবান-শ্যাম্পুসহ প্রসাধনী তৈরির কারখানা নির্মাণে উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে আমরা উপকৃত হবো।

ভেষজ উৎপাদন ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম  বলেন, এখানে ঔষধি উদ্ভিদ গবেষণা সেন্টার প্রতিষ্ঠা হওয়া দরকার। তাহলে ভেষজ পণ্যের গুণ ও মান নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রসাধন ও ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে আসবে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নীলিমা জাহান জানান, ভেষজ পল্লীর প্রায় দশ হাজার মানুষ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণনের সঙ্গে জড়িত। ভেষজ পল্লীর পরিধি বাড়ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপপরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান জানান, ভেষজ পল্লীতে হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা সম্ভব হলে কৃষকরা লাভবান হবেন। সমৃদ্ধ হবে দেশের একমাত্র ঔষধি পল্লী।

(নাটোর থেকে)