জাতীয় দলে জায়গা না পেলেও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে নাঈম শেখকে দলে নিতে কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিল একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজির মধ্যে। সিলেট টাইটানস, চট্টগ্রাম রয়্যালস, নোয়াখালী এক্সপ্রেস-এর ত্রিমুখী লড়াইতে শেষ পর্যন্ত জয়ী চট্টগ্রাম রয়্যালস। ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় নাঈম শেখকে কিনেছে বিপিএলের নতুন এই ফ্র্যাঞ্চাইজিটি।
সরাসরি চুক্তিতে জাতীয় দল এবং তার আশপাশে থাকা বেশিরভাগ ক্রিকেটারকে আগেই দলে নিয়ে নেয় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। ‘এ’ ক্যাটাগরিতে নিলামের আগে দল পাননি মাত্র ২ জন, নাঈম ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাস। রবিবার বিকেলে নিলাম শুরু হতেই প্রথমেই আসে নাঈমের নাম। তাকে দলে নিতে আগ্রহী ছিল একাধিক দল, তাই প্রতি ডাকে ৫ লাখ টাকা করে বেড়ে যাওয়ায় কয়েক মিনিটেই নাঈমের দাম কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত টাকার লড়াইয়ে জয়ী হয় চট্টগ্রাম রয়্যালস। পরের ডাকে আসে লিটন দাসের নাম, ৫০ লাখ ভিত্তিমূল্যের লিটনের দাম নিলামে ঠিক হয় ৭০ লাখ টাকা। কাড়াকাড়ি লাগে তাওহীদ হৃদয়কে নিয়ে, ৩৫ লাখ টাকা ভিত্তিমূল্যের হৃদয়ের দর ওঠে ৯২ লাখ টাকা। এই দুজনকেই দলে নেয় রংপুর রাইডার্স।
নিলামের প্রথম ভাগে ৩৫ লাখ টাকা ভিত্তিমূল্যে মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে দলে নিতে আগ্রহ দেখায়নি কোনো দলই। বাধ্যতামূলকভাবে খেলোয়াড় নেওয়া শেষে মাহমুদউল্লাহকে দলে নেয় রংপুর, মুশফিককে রাজশাহী। দুজনেই দল পেয়েছেন ভিত্তিমূল্যে।
নিলামে একাধিক দলের আগ্রহ ও চাহিদায় থাকার কথা ছিল জাতীয় দলের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান পারভেজ হোসেন ইমনের। কিন্তু নিয়মের মারপ্যাঁচে পারভেজ ইমনকে নিয়ে দর হাঁকা থেমে যায়, কারণ যারা দর হাঁকছিল তাদের এরই মধ্যে ২ জনের কোটা পূরণ হয়ে যায়। নিয়মটা ধরিয়ে দেন রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের কোচ হান্নান সরকার। অন্য দলগুলো আগ্রহ দেখায়নি ইমনের জন্য, তাই ৩৫ লাখ টাকা ভিত্তিমূল্যেই সিলেট টাইটানস তাকে দলে নিতে পারে। অন্যদিকে নিলামে এ এবং বি গ্রুপ থেকে বাধ্যতামূলক কোনো খেলোয়াড়ই নিতে না পারায় তারা জাকের আলী অনিক ও মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনকে দলে নিতে বাধ্য হয়। দুজনকেই তারা পেয়েছে ভিত্তিমূল্যে। ওদিকে নিলামে ভালো দাম পেয়েছেন জাতীয় দলের বাইরে থাকা বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার। ৫০ লাখে দল পেয়েছেন হাবিবুর রহমান সোহান, তাকে দলে নিয়েছে নোয়াখালী এক্সপ্রেস। ২৫ লাখে রিপন ম-লকে নিয়েছে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স, আলিস আল ইসলামকে রংপুর রাইডার্স নিয়েছে রাজশাহী। টেস্টের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান মাহমুদুল হাসান জয় পেয়েছেন ৩৭ লাখ, তাকে নিয়েছে চট্টগ্রাম রয়্যালস। ৪৪ লাখে ইয়াসির আলি রাব্বিকে নিয়েছে রাজশাহী, আফিফ হোসেনকে ২২ লাখে নিয়েছে সিলেট। ওদিকে মমিনুল হককেও দেশীয় ক্যাটাগরির শেষ ডাকে নিয়েছে সিলেট। টেস্ট দলের পেসার এবাদত হোসেনকেও নিয়েছে ২২ লাখে। টেস্ট দলের অফস্পিনার নাঈম হাসানকে ৮০ লাখে নিয়েছে রংপুর, ৫২ লাখে মোহাম্মদ মিঠুনকে দলে নিয়েছে নোয়াখালী।
নাঈমের মূল্য যেখানে কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে খেলোয়াড়দের দাম নিয়ে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে চট্টগ্রাম রয়্যালসের বেশিরভাগ খরচই ছিল জাতীয় দলের বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের জন্য। আবু হায়দার রনি, সুমন খান, জিয়াউর রহমান, আরাফাত সানি তাদের জন্যই মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করেছে দলটি। এই দলের মালিকানায় আছেন ট্রায়াঙ্গল সার্ভিসেস লিমিটেড, যাদের একটা সময় খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না। বিপিএলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু বলেছিলেন, দলগুলো টাকা না দিলে তারা ‘টেকওভার’ করতেও প্রস্তুত। চট্টগ্রাম রয়্যালসের কোচের চেয়ারে ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলের কোচ মমিনুল হক, নেই কোনো চেনামুখ। এই দলের খরচের বহর সন্দেহ জাগাচ্ছে শুরু থেকেই।
বুদ্ধি খাটিয়ে খেলোয়াড় কিনেছে রাজশাহী। রাইজিং স্টারস এশিয়া কাপের পেস বোলার অলরাউন্ডার আব্দুল গাফফার সাকলায়েনকে ১৮ লাখ ভিত্তিমূল্য থেকে নিলামে দর হাঁকিয়ে ৪৪ লাখে কিনেছে রাজশাহী। তরুণ ওপেনার জিশান আলমকে তারা পেয়েছে ভিত্তিমূল্য ১৮ লাখে। নিয়েছে রিপন ম-ল, হাসান মুরাদ, মেহেরব হোসেন, আকবর আলী, তানজিম হাসান সাকিবকে। ২০২০ যুব বিশ্বকাপের সময়ে বয়সভিত্তিক দলের নির্বাচক ছিলেন হান্নান সরকার, তিনিই রাজশাহীর কোচ। অভিজ্ঞ নামি ক্রিকেটারদের চেয়ে তরুণদের দিকেই তার আস্থা।
রংপুর তাদের চাহিদার বাইরের ক্রিকেটারের জন্য দরই হাঁকেনি, আর যাদের চেয়েছে নিয়েই ছেড়েছে। লিটন দাস, তাওহীদ হৃদয়, নাহিদ রানা, রাকিবুল হাসানদের নিয়েছে রংপুর রাইডার্স।
সিলেট এবং নোয়াখালীর খেলোয়াড় কেনায় ছিল না কোনো পরিকল্পনার ছাপ। সিলেট তো টেস্ট দলের খালেদ, এবাদত, জাকির হাসান, মমিনুল হককে নিয়ে রীতিমতো টেস্ট দল বানিয়েছে। ঢাকা ক্যাপিটালসও গত আসরের মতোই ফলের দিকে এগিয়ে গেছে নিলামেই। সেরা সময়কে পেছনে ফেলে আসা বেশিরভাগ ক্রিকেটারকেই দলে নিয়েছে তারা। মোহাম্মদ মিঠুন, তাইজুল ইসলাম, সাব্বির রহমান, নাসির হোসেন, ইরফান শুক্কুরকে দলে নিয়েছে ঢাকা ক্যাপিটালস। নোয়াখালী এক্সপ্রেসে কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনের পছন্দের প্রভাব। তাদের দলে মুশফিক হাসান, শাহাদাত হোসেন দিপু আর রেজাউর রহমান রাজা।
৫ দল থেকে বাড়িয়ে ৬ দল করা হয়েছে বিপিএলে, তাতে ১৫-১৬ জন দেশীয় ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পাবেন বলেই বলেছিলেন ইফতেখার রহমান মিঠু। বাড়তি খেলোয়াড়দের সুযোগে বানের জলে ভেসে এসেছেন এমন অনেকেই, যাদের অনেকেই হয়তো দল কম হলে সুযোগ পেতেন না। বিদেশি ক্রিকেটারদের তালিকাও জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, আফগানিস্তান থেকে। সব মিলিয়ে আরেকটি হযবরল বিপিএলেরই পূর্বাভাস মিলল খেলোয়াড় নিলামে।