২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত মৌসুমে লিগ শিরোপা ঘরে তুলেছিল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। পেশাদার যুগে প্রথম লিগ জয়ের পর সবার আশা ছিল, মোহামেডান তাদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে, প্রবল পরাক্রমশালী রূপে দেখা যাবে সাদা-কালোদের। কয়েক মাস যেতে না যেতেই সে স্বপ্ন ভেঙে চৌচির। যার দায় পুরোটাই বর্তায় ক্লাব কর্তাদের ওপর। ২০২৩ সালের মার্চে মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া পরিচালনা পর্ষদ সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে আছে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির ওপর। বেশিরভাগ পরিচালক বেশ কয়েক বছর ধরেই নিষ্ক্রিয়। তারপরও মাঠে তারা সেরা হয়েছিল দুটি মানুষের ঐকান্তিক চেষ্টায়। ক্লাব সভাপতি জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল মুবিন ও ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোহাম্মদ আলমগীর মিলে কয়েক কোটি টাকা ঢেলেছেন ফুটবল দল গঠন ও পরিচালনায়। তবে শেষ চার মাসে ক্লাব সভাপতি হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। ফলে সব চাপ এসে পড়ে আলমগীরের ওপর। শেষ পর্যন্ত তিনিও অভিমানে সরে দাঁড়িয়েছেন। কেবল ফুটবল কমিটি নয়, ছেড়েছেন পরিচালকের পদও। তাতে চলমান সংকট আরও বেড়েছে। ফুটবলারদের বকেয়া বেতন কে দেবে, এ নিয়ে ক্যাম্পে সবার মধ্যেই হতাশা। এ অবস্থায় কাল ফেডারেশন কাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মোহামেডানের ফুটবলারদের মাঠে নামানোই কোচ আলফাজ আহমেদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।
সবাইকে ছাপিয়ে গত জুনে লিগ শিরোপা নিশ্চিত করেছিল মোহামেডান। ফুটবল কমিটির প্রধান আলমগীর এসে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান ফুটবলারদের। দেন শক্তি বাড়িয়ে সামনের মৌসুমে শিরোপা ধরে রাখার ঘোষণা। নিজের কথা রাখতে কার্পণ্য করেননি আলমগীর। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২১ কোটি টাকার বেশি তিনি খরচ করেছেন ফুটবল দলের পেছনে। অন্য পরিচালকদের নিষ্ক্রিয়তায় বিরক্ত ছিলেন আগে থেকেই। লিগ জয়ের পরেই দিয়েছিলেন ফুটবল কমিটি থেকে সরে দাঁড়ানোর চিঠি। তবে সভাপতি সেটা গ্রহণ করেননি। বিরক্তি নিয়েই দায়িত্ব চালিয়ে যাচ্ছিলেন এ আশায় যে, নভেম্বরে পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত হবে এ আশায়। গত সপ্তাহে জরুরি সাধারণ সভায়ও এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ২৯ নভেম্বর সভাপতির কাছে চিঠি দিয়ে পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন আলমগীর।
আলমগীরের সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে দলের কোচ আলফাজ আহমেদের। লিগের সর্বশেষ ম্যাচে ফকিরেরপুলের কাছে ২-০ ব্যবধানে হারেই বোঝা গেছে দলের ফুটবলারদের মনোযোগ আর খেলায় নেই। দিনের পর দিন বেতন না পেয়ে স্থানীয় ও বিদেশি খেলোয়াড়রা মাঠে নামলেও সেরাটা দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় নেই। আলফাজ বলেন, ‘ওদের যতই আঙুর-বেদানা খাওয়াই, ওরা চায় বেতন। সেটা না পেলে তো খেলতে চাইবেই না। স্থানীয় খেলোয়াড়রা গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেতন পেয়েছে। বিদেশিদের মধ্যে মোজাফফরভের দুই মাস ও অন্যদের এক মাসের বেতন বকেয়া। কোচরা চার মাস কোনো বেতন পাননি। এ অবস্থায় ছেলেদের অনুরোধ করে মঙ্গলবার মাঠে নামানোই দায়।’
ব্যর্থ হয়ে ক্লাবের টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়কের পদ থেকে আগেই সরে দাঁড়িয়েছেন সাবেক তারকা ইমতিয়াজ সুলতান জনি। কমিটির আরেক সদস্য রুম্মন বিন ওয়ালি সাব্বির বলেন, ‘ক্লাবে এমন কিছু পরিচালক আছেন, যাদের আর্থিক বা অন্য কোনোভাবে কোনো অবদান নেই। অথচ তারা বছরের পর বছর পদ আঁকড়ে বসে আছেন। এ অবস্থায় একটা নির্বাচনের বিকল্প নেই। সেটার অপেক্ষা করছিলাম। এর মধ্যে আলমগীর ভাই সরে গেলেন।’
নানা কারণেই বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিতে নেই লোকমান হোসেন ভুঁইয়া। তবে ক্লাবের দুঃসময়ে হাল ধরার কথা বলেছেন তিনি, ‘আমি সবাইকে নিয়ে একটা উদ্যোগ নিচ্ছি। আশা করছি ১৫ দিনের মধ্যে সংকট অনেকটাই কাটিয়ে তুলতে পারব।’