আম্মিয়া বেগমের (৪৬) পরিবারে সাতজন সদস্য। স্বামী রিয়াজুল ইসলাম দিনমজুর। দুই মেয়ে ও তিন ছেলে। দুই সন্তান স্কুলে পড়ে। আগে সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। সন্তানের পড়াশোনার খরচ কিংবা হঠাৎ রোগব্যাধি হলে তাকে ধারদেনা করতে হতো। বর্তমানে সেই সমস্যা তার আর নেই।
আম্মিয়া বেগম জানান, ২০২৪ সালের শুরুতে একটি প্রতিষ্ঠান তাকে বিনামূল্যে একটি ভেড়া দেয়। ওই ভেড়া একবার চারটি ছানা দিয়েছে। এখন তিনি আটটি ভেড়ার মালিক। এর মধ্যে একটি ভেড়া বিক্রি করে ছেলের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছেন। গত ঈদে তিনি দুইটি ভেড়া বিক্রি করে সংসারের উন্নয়ন কাজে লাগিয়েছেন। এখন প্রয়োজন পড়লেই ভেড়া বিক্রি করতে পারবেন।
গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে বালাসিঘাট। সেখান থেকে নৌকা যোগে প্রায় দুই ঘন্টার পথ পারি দিয়ে মাইজবাড়ী চর। ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে প্রায় ৫০ বছর আগে জেগে ওঠা মাইজবাড়ি চরটি সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের অর্ন্তগত। ওই মাইজবাড়ি চরেই আম্মিয়া বেগমের বাড়ি।
সরেজমিন গিয়ে কথা হয় আম্মিয়ার সাথে। জানতে চাইতেই, হাঁসিমুখে তিনি জানান, চরাঞ্চলের নারীরাও আধুনিক পদ্ধতিতে ভেড়া পালন শুরু করেছে। তার মতো জেলার ২৪০ জন নারী উন্নতজাতের ভেড়া পালন করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। গাইবান্ধার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ফ্রেন্ডশিপের টেকসই উন্নয়নে সহায়ক প্রকল্প (এএসডি) তাদের সহযোগিতা করছে। চরাঞ্চলের নারী ও যুবকরা এই খাতে নতুন সুযোগ পাচ্ছেন। তারা ভেড়া পালনের সঙ্গে সঙ্গে লোম থেকে শিল্পজাত সামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করতে শুরু করেছেন। এতে বাড়ছে স্থানীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি। কিছুটা হলেও তাদের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছেন।
আম্মিয়ার সাথে কথা বলতেই এগিয়ে আসলেন একই চরের মোমেদা বেগম (৪৫)। জানতে চাইলে, তিনি বলেন, দুই বছর আগে তাকেও বিনামূল্যে একটি ভেড়া দেওয়া হয়। সেই ভেড়া দুই বার বাচ্চা দিয়েছে। এখন তার ছয়টি ভেড়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ভেড়া গর্ভবতী। খুব তাড়াতাড়ি এগুলো বাচ্চা দেবে। তখন আট থেকে ১০টি ভেড়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বন্যা আসলেই চরের অনেক ফসল পানি নিচে নষ্ট হয়েছে যায়। কিন্তু ভেড়া তো নষ্ট হয় না। ভেড়া পালন লাভজনক। কারণ ভেড়ার তেমন রোগবালাই হয় না। মৃত্যুহারও কম। ভেড়া বিক্রির টাকায় দুই ছেলেমেয়ের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি প্রায় তিন বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন। খেতে সার,কীটনাশকের খরচ বহন হয় ভেড়া বিক্রি করা টাকায়।
এএসডি সূত্র জানায়, ২০১৭ সাল থেকে লুক্সেমবার্গ অর্থায়নে এই প্রকল্প চলমান রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে এএসডি প্রকল্পটি জেলার চরাঞ্চলের আট গ্রামে কাজ করছে। এসব গ্রামের মোট ২৪০ জন নারী ভেড়া পালন করছেন।
গাইবান্ধা এএসডি প্রকল্প ব্যবস্থাপক দিবাকর বিশ্বাস বলেন, গাইবান্ধার চরাঞ্চলে দিন দিন ভেড়া পালন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কারণ ভেড়ার রোগব্যাধি কম। বছরের চার থেকে ছয়টা পর্যন্ত বাচ্চা দেয়। লালন পালনে খরচ কম। দুই থেকে আড়াই বছরে দেশীয় জাতের ভেড়া ১৮-২৫ কেজি ওজনের হয়। যার দাম সাড়ে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এখন দেশীয় ভেড়ার সঙ্গে ভারতের উন্নত জাতের ভেড়ার কৃত্রিম প্রজনন করানো হচ্ছে। সেগুলো আড়াই বছর পর ৪০ থেকে ৫০ কেজি ওজনের হবে। যার দাম হবে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। চরাঞ্চলে বন্যার কারণে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভেড়া তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ভেড়া পালন করলে দ্রুত লাভবান ও স্বাবলম্বী হওয়া যাবে। খাদ্য ভালো পেলে ভেড়া সুস্বাস্থ্য হয়। ফলে ভেড়ার গর্ভধারণের হার বেশি হয় আকারে বড় হয়। পাশাপাশি কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। গাইবান্ধার সাত উপজেলায় ৪১ হাজার ১৪১টি ভেড়া আছে। জেলার প্রায় চরাঞ্চলেই ভেড়া আছে।