বিপদাপদে গুনাহ মাফ হয়

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমরা মুখোমুখি হই নানা পরীক্ষার। কখনো শারীরিক অসুস্থতা, কখনো অর্থনৈতিক টানাপড়েন, আবার কখনো বা প্রিয়জন হারানোর বিচ্ছেদ, এই সবকিছুই যেন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ। আপাতদৃষ্টিতে এসব কষ্ট কেবলই বেদনা বা দুঃখের উৎস মনে হতে পারে। তবে যিনি এই বিশ^জগতের স্রষ্টা, সেই মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষের এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতিটি আঘাত ও যন্ত্রণা রহমত ও আত্মার পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া। ইসলামে বিপদ-আপদ বা কষ্টকে কখনো অর্থহীন মনে করা হয় না, বরং তা বান্দার জন্য এক বিশেষ সুযোগ নিয়ে আসে। এই কষ্টগুলো আমাদের দুর্বলতা দূর করে, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে শেখায় এবং জীবনের সব গুনাহের কালিমা মুছে দেয়।

মহান আল্লাহ মানুষকে ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ ও প্রাণের ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষা কষ্টের মাধ্যমে মুমিনকে ধৈর্যশীল বান্দা হিসেবে গড়ে তোলে। মুমিনের জীবনে কষ্ট বা আনন্দের প্রতিটি ঘটনাই কল্যাণকর।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন নারী-পুরুষের ওপর, তার সন্তান ও ধন-সম্পদের ওপর বিপদ-আপদ অনবরত লেগেই থাকে, শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় মিলিত হয় যে তার ওপর কোনো গুনাহ থাকে না।’ (তিরমিজি)

মানুষের চোখে বিপদ মানে ক্ষতি, কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে এটি হতে পারে পবিত্রতার অগ্নিপরীক্ষা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, প্রাণ ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৫)

এই আয়াত যেন মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য এক সত্য ঘোষণা করে। যেখানে বলা হয়েছে, কষ্ট আল্লাহর অপ্রসন্নতার নিদর্শন নয়, বরং এটি তার প্রিয় বান্দাদের জন্য এক আত্মিক পরিশুদ্ধির সুযোগ।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিনের ব্যাপার কতই না বিস্ময়কর! তার সব অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। সে যদি আনন্দে থাকে, তাহলে আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা আদায় করে। এতে তার কল্যাণ। আর যদি কষ্টে নিপতিত হয়, তাহলে ধৈর্যধারণ করে। এটাও তার জন্য কল্যাণ।’ (সহিহ মুসলিম)

এ হাদিস স্পষ্ট করে দেয়, মহান আল্লাহর কাছে প্রকৃত সফলতা কষ্টহীন জীবনে নয়, বরং ধৈর্য ও সন্তুষ্টির জীবনে। বিপদ-আপদ গুনাহ মুক্তির এক অপার পথ। বিপদ-আপদকে মহান আল্লাহ এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে তা বান্দার অন্তরের গুনাহের কালিমা মুছে দেয়।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলিম যখন কষ্ট, ব্যাধি, দুঃখ, দুশ্চিন্তা বা কোনো ধরনের যন্ত্রণা ভোগ করে, এমনকি একটি কাঁটাও যখন তার বিঁধে যায়, আল্লাহ এতে তার কিছু গুনাহ মোচন করে দেন।’ (সহিহ বুখারি) এই হাদিস প্রমাণ করে, মুমিনের অশ্রুবিন্দু বৃথা যায় না, প্রতিটি ব্যথা পরিণত হয় আত্মার পরিশুদ্ধি ও সওয়াবের সিঁড়িতে।

কষ্টের মধ্যেও রয়েছে আনন্দের গোপন রহস্য। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘যখন মহান আল্লাহ কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি তাকে পরীক্ষা করেন। কারণ কষ্টের মাধ্যমেই বান্দা তার রবের কাছে ফিরে আসে, আত্মা পরিশুদ্ধ হয় এবং গুনাহ দূর হয়।’ (আল-ফাওয়ায়িদ ৮৭) সুতরাং যিনি কষ্টকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আত্মার প্রশিক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করেন, তার জীবনেই মুমিনের মর্যাদা প্রস্ফুটিত হয়।

আল্লাহর প্রিয় বান্দারাই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পড়েছেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা আসে নবীদের ওপর, তারপর যারা তাদের নিকটতম অনুসারী, তাদের ওপর।’ (তিরমিজি)

হজরত ইউসুফ (আ.)-এর কারাবাস, আইয়ুব (আ.)-এর দীর্ঘ ব্যাধি, ইয়াকুব (আ.)-এর দৃষ্টিহানি, সবই ছিল মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের মর্যাদা বৃদ্ধির পর্যায়। মুমিন যখন ধৈর্যের সঙ্গে বিপদে স্থির থাকে, তখন তার অন্তর এক অনন্য প্রশান্তিতে ভরে যায়। কারণ সে জানে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৩)

এই সঙ্গে থাকার অনুভূতি মুমিনের জন্য সব কষ্টকে সহজ করে দেয়। মহান আল্লাহর সান্নিধ্যই তখন তার আশ্রয় ও প্রাপ্তির চূড়ান্ত রূপ। মুমিনজীবনের বিপদ-আপদ তাকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং তাকে পরিশুদ্ধ ও সম্মানিত করার জন্য। যিনি কষ্টে মহান আল্লাহর রহমত অনুভব করেন, তিনি আসলে মহান আল্লাহর ভালোবাসায় ধন্য। কারণ প্রতিটি রোগ, প্রতিটি ক্ষতি, প্রতিটি অশ্রু, তার গুনাহ মোচনের সাক্ষী হয়ে থাকে।

অতএব, মুমিনের বিপদ তার পতনের নয়, বরং তার পুনরুত্থানের সূচনা। তার কষ্টই তাকে গুনাহমুক্ত, পরিশুদ্ধ ও আল্লাহর প্রিয় করে তোলে।

জীবনের প্রতিটি বিপদ, প্রতিটি দুঃখ এবং প্রতিটি আঘাত মুমিনের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। আমরা বুঝতে পারি যে, মহান আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদেরকে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়েই মর্যাদা দান করেন। নবী-রাসুলগণ মহান আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন, তাদের জীবনেই এসেছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। পরীক্ষা আসে অন্যান্য মানুষের জীবনেও। জীবনের সেই পরীক্ষা ও কষ্টগুলো আমাদের পতন ঘটানোর জন্য আসে না, বরং তা আসে আমাদের আত্মাকে আরও উন্নত ও পরিশুদ্ধ করার জন্য।

মুমিন যখন দৃঢ় ইমান ও ধৈর্যের সঙ্গে এসব পরীক্ষার মোকাবিলা করেন, তখন তার অন্তর এক স্বর্গীয় প্রশান্তিতে ভরে যায়। কারণ তিনি জানেন, মহান আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই আছেন। এই সান্নিধ্যের অনুভূতি বান্দাকে সব দুঃখ-কষ্টের ঊর্ধ্বে এক চূড়ান্ত প্রাপ্তির দিকে নিয়ে যায়।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক