আধ্যাত্মিকতার অমর কবি

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৯ এএম

ত্রয়োদশ শতকের বিখ্যাত কবি মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি। প্রেম, বিরহ, মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব সমন্বয়ে রচিত তার সাহিত্য আজও বিশ্বের কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে। সময়ের সীমানা পেরিয়ে রুমি হয়ে উঠেছেন বিশ্বসাহিত্যের এক চিরন্তন নাম। তার অমর কাব্য মসনভি শরিফ মানুষকে নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি, মানবিকতা ও খোদাপ্রেমের শিক্ষা দেয়।

জন্ম ও শৈশব : মাওলানা রুমি ১২০৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের বালখ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক, আইনজ্ঞ ও সুফি সাধক। মায়ের নাম মুইমিনা খাতুন। রুমির জন্মের সময় বালখ ছিল ফারসি সংস্কৃতি ও সুফিবাদের অন্যতম কেন্দ্র।

শৈশব থেকেই রুমি ধর্মীয় শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তার বাবার কাছ থেকেই ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন। ১২১৫ থেকে ১২২০ সালের মধ্যে মঙ্গলরা এশিয়ায় আক্রমণ চালালে তার বাবা পরিবার ও অনুসারীদের নিয়ে ইরানের নিশাপুরে যান। সেখানে বিখ্যাত সুফি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের সঙ্গে রুমির সাক্ষাৎ হয়। আত্তার তার প্রতিভা উপলব্ধি করে তাকে আশীর্বাদ করেন। এরপর তারা মক্কায় হজ পালন করে বিভিন্ন শহর ঘুরে বর্তমান তুরস্কের কোনিয়া নগরীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এখানেই রুমির জীবনের অধিকাংশ সাহিত্যকর্ম রচিত হয়।

জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক জীবন : কোনিয়ায় রুমি তার বাবার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে তার জীবন অতিবাহিত হচ্ছিল। কিন্তু ১২৪৪ সালে দরবেশ শামস তাবরিজির সঙ্গে সাক্ষাতের পর তার জীবনে বড় পরিবর্তন আসে।

শামস তাবরিজি ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক সাধক। তার সঙ্গে রুমির সম্পর্ক ছিল গভীর আত্মিক বন্ধনের। শামসের সান্নিধ্যে রুমি আধ্যাত্মিকতা ও অতীন্দ্রিয় সাধনার প্রতি আরও গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। একজন প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক ও আইনজ্ঞ থেকে তিনি হয়ে ওঠেন আত্মশুদ্ধির সাধক।

কথিত আছে, শামস একদিন রুমিকে বলেছিলেন, তিনি এমন একজন সঙ্গী খুঁজছেন, যিনি তাকে সঙ্গ দেবেন। রুমি জানতে চান, বিনিময়ে শামস কী দেবেন। শামস উত্তর দেন, তার শির। রুমি তখন নিজেকে শামসের কাক্সিক্ষত সঙ্গী হিসেবে পরিচয় দেন।

১২৪৮ সালের এক রাতে শামস রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। কথিত আছে, পেছনের দরজা দিয়ে কেউ তাকে ডাকলে তিনি সাড়া দিয়ে বেরিয়ে যান, কিন্তু আর ফিরে আসেননি। প্রিয় গুরুকে হারিয়ে রুমি গভীর শোকে নিমজ্জিত হন। এই বিরহের বেদনা তার কবিতায় বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে। শামসকে কেন্দ্র করে রচিত তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ দেওয়ান-এ শামস-এ তাবরিজি। এতে গুরুপ্রেম, বিরহ ও আধ্যাত্মিক আকাক্সক্ষার গভীর প্রকাশ ঘটেছে।

মসনভি শরিফ : রুমি প্রায় ১২ বছর ধরে ছয় খণ্ডে মসনভি রচনা করেন। ফারসি সাহিত্যের এই অসাধারণ সৃষ্টি কোরআন, হাদিস, নবী-রাসুলদের কাহিনি, নৈতিক শিক্ষা ও সুফি দর্শনের সমন্বয়ে সমৃদ্ধ। এতে অসংখ্য গল্প, উপমা ও শিক্ষণীয় ঘটনা স্থান পেয়েছে।

মসনভির মাধ্যমে রুমি মানুষের আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সঠিক জীবনযাপনের পথ তুলে ধরেছেন। তার রচনায় পার্থিব স্বার্থের মোহ থেকে মুক্তি, অন্তরের পবিত্রতা এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তিনি অসংখ্য গজল ও রুবাই রচনা করেছেন। তার সাহিত্যকর্মের অধিকাংশ ফারসি ভাষায় হলেও তুর্কি, আরবি ও গ্রিক ভাষাতেও কবিতা লিখেছেন।

জনপ্রিয়তা : মসনভি ভারতীয় উপমহাদেশে মসনভি শরিফ নামে পরিচিত। ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় আলোচনায় রুমির কবিতা ও উপমা বহুল ব্যবহৃত হয়। তার রচনার মাধ্যমে মানুষ নৈতিকতা, সৎসঙ্গ, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক জীবনের শিক্ষা লাভ করে।

মৃত্যু : ১২৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে রুমি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৭ ডিসেম্বর ৬৬ বছর বয়সে তুরস্কের কোনিয়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাকে তার বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।

রুমির সমাধির এপিটাফে লেখা রয়েছে, ‘যখন আমি মৃত, তখন আমাকে আমার সমাধিতে না খুঁজে মানুষের হৃদয়ে খুঁজে নাও।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত