পরপুরুষ

বিকেলে আমি যাচ্ছি বাপের বাড়ি। বিয়ের তিন দিন পর বাপের বাড়ি যাওয়ার প্রথা নাকি। আমিও রেডি হয়ে বসে আছি ড্রেসিং টেবিলের সামনে। লাল একটা জামদানি পরেছি। বিয়ের পর এদিক-সেদিক যাওয়ার জন্য শাশুড়ি আলাদা করে গহনা বেছে দিয়েছেন। গলার মাঝারি ধরনের হার, কানে মাঝারি দুল, হাতে দুখানি চিকন চুরি আর দুটি আংটি। সঙ্গে ম্যাচিং করে লাল চুরিও পরেছি। কাজলও দিয়েছি, লিপস্টিকও বুলিয়েছি। এর বেশি মেকআপ করা হয় না আমার।

ঘরভর্তি মেহমান। একদল ননদ-দেবর রাত ছাড়া সার্বক্ষণিক ঘিরে আছে আমাকে ধরে।

‘ভাবি এই, ভাবি সেই।’

আসা পর্যন্ত একদণ্ড বিশ্রাম পাচ্ছি না। রাতে চলে স্বামীর সোহাগ-আদর। ইচ্ছে থাকুক আর না থাকুক, ঘুম ভেঙে যাক চোখ বা নির্ঘুম কাটুক, স্বামীর আচরণে সাড়া দিতে হয়। সাড়া বলতে জেগে তো থাকতে হয়। এরপর হুট করেই দেখি ভোর হয়ে যায়। এরপর দু-তিন ঘণ্টার ঘুম। তার মধ্যেই ডাক পড়ে দরজার ওপারে।

ভাবি উঠো, নাশতা করবে।

চোখের নিচে কালি কারও চোখে পড়ে না? কই আয়নার সামনে বসে আছি, আমারও তো চোখে পড়ছে না। কাজল দিয়ে লেপটে দিয়েছি। চোখের কালি কাজলের কালি সব মিলেমিশে একাকার।

এই বাড়ির সবাই ওই বাড়িতে এখন। আমাদের বিশালাকার বাড়ি জুড়ে এখন মানুষে মানুষে গিজগিজ। আমাদের বাড়ির মেহমান, তাদের বাড়ির মেহমান। এত বিশাল বাড়ি তবু আমি গা এলিয়ে দেওয়ার মতো একটা বিছানা পাচ্ছি না। যেই রুমেই যাই একদল বিছানার ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে।

বউ আসো এদিকে।

ভাবি আসো এদিকে।

আপু আসো এদিকে।

আমি ফুটবলের মতো ছুটতে থাকি এই রুম থেকে ওই রুম। হয়তো রাতে সব খালি হবে। আমি হাত-পা ছড়িয়ে সাপের শীত নিদ্রায় যাব। আমি অপেক্ষা করি। ঘুমের। বিছানার।

খাওয়ার পর্ব শুরু হলো। সেই তেল আর মাংসের ছড়াছড়ি। মুখ অস্বাদ হয়ে গেছে এই খেতে খেতে।

কোনো মতে একটু খেয়ে নিলাম দেবর-ভাবির রঙ্গরসিকতার মধ্যে।

আমাদের বাড়ির পেছনে বিশাল এক দোলনা আছে। দেবর-ননদের ধাক্কায় সেখানে গেলাম তাদের সঙ্গ দিতে। আমাকে দোলনায় দোলাতে হবে সবার। আমিও দুলছি।

দুলতে দুলতে হঠাৎ আমার পৃথিবী দুলে উঠল মনে হয়।

দূরে পানির কলের সামনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। কালো শার্ট,  ব্লু জিনস। সে নাকি?

মহিন দা?

আমি দুলতে থাকি। দুলতে দুলতে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়।

কালো ছায়া কাছে আসতে থাকে।

সে। হ্যাঁ সে-ই। আমি কিছুক্ষণ নিথর তাকিয়ে থাকি তার দিকে। ঠিক যেভাবে সেও তাকিয়ে থাকে আমার দিকে।

আমার মনে হয় যেন অনন্তকাল তাকিয়ে আছি। তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখি আমি এখন ভেতর বাড়িতে। আমার আশপাশে বহু মানুষ। ছোট থেকে শুরু করে মুরব্বি। আমার চোখ খুঁজতে থাকে এদের বাইরে কাউকে। খুঁজে খুঁজে হয়রান যখন হয়ে যাচ্ছি তখনই সেই কালো শার্ট উঁকি দেয় সামনে।

বিষন্ন চোখ আর ভাঙা গাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই বিষণœ চোখে কী যেন ছিল, যা আমাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। আমি এই আকর্ষণকে উপেক্ষা করতে চাই। কিন্তু পারছি না। এই না পারার জন্য আমার অপরাধবোধ হচ্ছে। তিন দিন আগেও তার দিকে তাকাতে আমার বিন্দুমাত্র সংকোচ কাজ করত না। বরং মনে আনন্দের একটা শিহরণ বয়ে যেত। আমার ভেতর-বাইর সব থরথর করে কাঁপত। কাঁপতে কাঁপতে আমি গড়িয়ে পড়তে চাইতাম তার ওপর।

কতবার এমন হয়েছে। আমি নির্জন দুপুরে তাকে বারান্দায় দেখে ছুটে যেতাম। ছুটে গিয়ে থেমে যেতাম। নির্বাক চার চোখ শুষে নিত একে অপরের ভেতরের সব উত্তেজনা।

এই তিন দিন আগেও আমি বহুবার তাকে খুঁজেছি। খুঁজেছি যখন জেনেছি আজ কেউ আসবে আমাকে দেখতে। আমি দৌড়ে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে পাশের বাড়ির শম্পাকে ধরেছি।

শম্পা বলেছে, ‘মহিনদা কোথায় সে তো আমরাও জানি না রে’

‘জানিস না আবার কী! কোথায় গেছে বলে যায়নি?’

‘তুই তো জানিস, মহিনদা হুট-হাট কোথায় চলে যায়, কিছুদিন আর পাত্তা থাকে না। এরপর আসে জগতের সব ধুলো ময়লা আর একরাশ চুল দাড়ি নিয়ে। এবারও তেমন হবে হয়তো।’

‘ফোন? ফোন করে দেখ।’

‘ফোনও তো বন্ধ।’

এবারও তবে আগের মতো মাস কাটিয়ে ঘরে ফিরবে? নিজে নিজেই বলতে থাকি। বলতে বলতে ফিরে আসি। ফিরে এসে দেখি দৌড়ে বের হওয়ার সময় আমার সখের কাচের এক ফুলদানি ভেঙে গেছে ধাক্কা লেগে। আমি টেরই পায়নি।

সেই দিনের পর আজ মহিনদাকে দেখলাম। না, চুল-দাড়ি বড় হয়নি। শুধু চোখের নিচে কালি আর ভেতরে গভীর বিষন্নতা।

বিষন্ন চোখের মন্ত্রে আমি মহিনদাকে পেয়ে গেলাম বাড়ির পেছনেই।

মহিনদার নির্বাক মুখ সচল হলো।

জেবা, এ কেন হলো?

আমি তীব্র চোখে তাকালাম। বললাম, ‘তুমি ছিলে না তাই হলো।’

‘তুই অপেক্ষা করতে পারলি না?’

‘অপেক্ষা?’ আমি যেন গর্জে উঠলাম। গর্জে উঠেও শান্ত স্বরে বললাম, ‘যে কথা দিয়ে যায় তার জন্য অপেক্ষা করা যায়। তুমি কথা দিয়েছিলে? বলে গিয়েছিলে কখন ফিরবে?’

মহিনদার ঠোঁট আবার নির্বাক হয়ে গেল। তবে চোখ ছলছল করে উঠল। আমি আর গর্জন করতে পারলাম না।

দুজনের কেউ কিছু করতে পারিনি। না আমি পেরেছি কাউকে কিছু বলতে না মহিনদা পেরেছে বোঝাতে। এমনকি কোনো দিন একে অপরকেও বোঝাতে পারিনি কেমন লাগে ‘তোমার জন্য আমার, বা আমার জন্য তোমার।’

তবে আজ কেন এই প্রশ্ন? আজ কেন দোষারোপ? আজ কেন জলসিক্ত চোখ?

যে কাজ মহিনদা কোনো দিন করেনি। আজ সেটাই করল। আমার হাত দুটো আচানক নিজের মুঠোতে নিয়ে চেপে ধরল অনেকক্ষণ। আমি থমকে গিয়েও সরে আসিনি। পারিনি ‘পরপুরুষের’ হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে।

এরপর সময় কাটে, বছর কাটে। কোলজুড়ে দু-তিনটি দেবশিশু আসে।

আমি ভুলে যাই সেই ‘পরপুরুষের স্পর্শ’। কিন্তু সেই বিষন্ন চোখ ভুলিনি।

একদিন অফিসফেরত আমার বর রাতে ভাতের সঙ্গে লেবু চিপতে চিপতে বলে,

‘আজ মহিনদাকে দেখলাম নিউ মার্কেটের ওখানে’

আমার ডাল মাখানো ভাতের ওপর হাত থেমে যায়। মহিনদাকে সে চিনে? কীভাবে? কখন থেকে?

আমি হা করে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে।

আমার বর সেদিকে দৃষ্টিপাত না করেই বলল, ‘একটা নতুন পাবলিকেশন হাউজ খুলেছে ওদিকে। সেখানেই দেখলাম। কেমন যেন উ™£ান্তভাবে বসে ছিলেন। ছন্নছাড়া ভাব। চুল অনেক বড় হয়েছে দেখলাম।’

আমার হা করা দৃষ্টি আর মুখ স্বাভাবিক হচ্ছে না দেখে বর খানিক হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অবাক হচ্ছ? কীভাবে চিনি?’

বিয়ের তিন দিন পর যেদিন তোমাদের বাড়িতে গেলাম সেদিন তোমাদের দুজনকে এক সঙ্গে বাড়ির পেছনে দেখেছি। বুঝেছিলাম কিছু না পাওয়ার লেনদেন হচ্ছিল।

আমি লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম। এত বছর, এতটা বছর ও আমাকে কিছু জানতে দিল না? কিছু বুঝতেও দিল না? তবে আজ কেন বলল? আজ কী বলে আমাকে মর্মজ¦ালা দিতে চাচ্ছে? বোঝাতে চাচ্ছে সে অনেক মহৎ আমি অনেক নিচ?

আমার ভাতের প্লেটের ওপর এক ফোঁটা জল পড়তেই বাম হাতের ওপর আরেকটা হাতের স্পর্শ টের পেলাম। দেখি এ তারই হাত।

‘তুমি ভাবছ কেন এতদিন তোমাকে বলিনি এসব যে আমি জানি?

বলিনি কারণ আমি দেখেছি তুমি বিয়ের পর নিজেকে সম্পূর্ণ আমার কাছে সঁপে দিয়েছ। আমাকেই তোমার রাজ্য বানিয়েছ। সে রাজ্যে আমি আকুণ্ঠ সুখী। তাই এসব অতীত আমার নিজেরও মনে ছিল না।’

আমি তবু গাল ভার করে বললাম, ‘তবে আজ কেন বললে?’

বললাম, ‘মহিনদাকে দেখে মনে হলো সে যেন এখনো বিচ্ছিন্ন। এখনো কোথাও আটকা পড়েনি। এখনো দিশেহারা। ঠিক যেমনটা সেদিন বাড়ির পেছনে দেখেছিলাম। দেখে খারাপই লাগল।’

আমার হাত আবার ভাতে যায়। একটা ছোট শ্বাস বের হয়ে যায়, যেন হালকা হলাম।

রাতে আমি স্বামীর বুকে হাত রেখে ঘুমাই। ঘুম যখন ভাঙে তার দিকে তাকিয়ে ভাবি,

সেই বহু বছর আগের ফেলে আসা মহিনদার জন্য কষ্ট পাবো না এই মানুষটার এমন নির্মোক সরল ভাবনায় গর্ব করব? কে আসলে জয়ী হয়েছে? আমি না সে?

হয়তো দুজনই। হয়তো মহিনদা পরাজিত। না লড়েই পরাজিত। অথবা দুজনেই হেরে গেছি। 