অর্থনীতিতে আস্থার সংকট

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে সরাফত আলী নামে একজন মধ্যবয়েসি ‘বালক’ বাস করেন। মধ্যবয়েসি মানুষকে ‘বালক’ বলার কারণ নিশ্চয়ই আছে। আজসহ চারদিন পর বাংলাদেশের বিজয় লাভের ৫৪তম বার্ষিকী পালিত হবে। সেই বাংলাদেশকে মাঝ বয়েসি বালক রাষ্ট্র বলা যাবে কি না, সেটা হয়তোপ বিতর্কের ব্যাপার। কিন্তু সরাফত আলীর বেলায় ব্যাপারটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য এবং অবশ্যই আলাদাভাবে ভাবার অবকাশ রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থেকে, নরসিংদীর মাধবদীর দূরত্ব মাত্র ৬৭ কিলোমিটার। গাড়িতে গেলে ২ ঘণ্টা ১৯ মিনিটের পথ। সর্বেসর্বা গুগল ম্যাপের বদৌলতে, আজকাল ফ্রি কনসালট্যান্সি পাওয়া যায়। আজকাল বাজার সদাই না করে দিলেও, এআই এত চটপটে যে যেন রান্না পর্যন্ত করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। যা হোক, সরাফত আলীর ভয় ভূমিকম্প নিয়ে। নরসিংদীর মাধবদীতে ৫.৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পের ‘এপিসেন্টার’এটি শুনে সরাফত আলী ইদানীং বেশ বিচলিত বোধ করেন। বিচারক মহোদয়রা কখনো সখনো শুনানি গ্রহণে বিব্রত বোধ করেন। সরাফত আলীর বিচলিত বোধ সে ধরনের না। ভূমিকম্পের ভয় শুধু সরাফত আলীর নয়, গোটা দেশের প্রায় সবার মধ্যে ছড়িয়ে গেছে বললে কম বলা হবে। ভীষণ ভয় ধরিয়ে গেছে ২১ নভেম্বরের ৫.৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি।

ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ, যা বলে-কয়ে ঘটে না। এই দুর্যোগ অতিমাত্রায় জানমালের ক্ষতিসাধন করতে পারে। সমৃদ্ধ জনপদকে উল্টিয়ে দিতে পারে। শত সহস্র বছর গবেষণা করে ভূকম্পের পূর্বাভাস পাওয়ার কোনো পন্থা বের করা যায়নি। যেটা গিয়েছে ভূমিকম্পের ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়। এর জন্য ব্যাপক ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, নির্বাণের পথ পরিষ্কার রাখা এবং ভূমিকম্প-উত্তরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার পুনর্বাসন কার্যক্রম উন্নত রাখা। এটা সময়সাপেক্ষ।  জীবনযাপন প্রণালিতে পরিবর্তন আনার জন্য নাতিদীর্ঘ সময় প্রয়োজন। কিন্তু সেটা না করে বা সে পথে না হেঁটে, ভূমিকম্পের ভয়ে শহর থেকে পালিয়ে বেড়ানোর পথ খোঁজা, পড়ালেখা বন্ধ রাখা, বিমর্ষ ও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলে, উদ্যম উদ্যোগ হারিয়ে গেলে, সিদ্ধান্তহীনতায় উৎপাদনশীলতা কমে যাবে। ভূমিকম্প মোকাবিলায় সমন্বয়ধর্মী কার্যকলাপের পরিবর্তে পারস্পরিক দোষারোপের দ্বারা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অর্থের অপচয় ঘটবে। বরং জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কীভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়, অবকাঠামো তৈরিতে কী কী করণীয় পরিপালনীয় সেগুলো সম্পর্কে জানা, শোনা, দেখার কাজ শুরুতেই মনোনিবেশ করতে হবে। এ কথা অতীতে বহুবার বলা হয়েছে, বিশেষ করে একেকটা দুর্যোগকাল উপস্থিত হলে। দিনকয়েক হা-হুতাশ করে, বড় বড় কথা বলে ভুলে যাওয়া আরেকটি দুর্যোগ আসা পর্যন্ত। প্রকৃতির প্রতি বিরূপ আচরণ, অন্যায় অনিয়ম অনৈতিকতা, পাপাচার যত অগ্রসর হবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ তত কাছাকাছি আসবে বয়স্ক বালক সরাফত আলীর মাথাব্যথার কারণ সেখানে।  

সরাফত আলীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা আছে, কিন্তু তুলতে পারছে না। এটা কেন হলো, কী করা হবে এ ব্যাপারে তার কোনো কিছু জানা নেই। টাকা তার, সেই টাকা ব্যাংকে জমা রেখে রক্ষা করার পরিবর্তে পাচার করার, লুট হওয়ার, ব্যবস্থা-অব্যবস্থার ব্যাপারে তার কিছু জানা নেই। তাকে সব সময় সংশয়-সন্দেহে থাকতে হয়। প্রচ- আস্থাহীনতায় ভুগছে সে। আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবরের দরকার কখনই ছিল না। কিন্তু আদার ব্যাপারীর সামান্য পুঁজিপাটা, জাহাজ ব্যবসায়ীরা দিন দিন নিঃশেষ করে দেবে এটা তো মেনে নেওয়া যায় না। সরাফত আলী দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছে, এখন তার দেশে তার চেয়ে চালাক লোকের সংখ্যা বাড়ছে। আর সরাফত আলীদের অন্ধকারে রাখার ফন্দি-ফিকিরও বেড়েছে। অথচ সবাইকে আস্থায় আনতে যা-যা করা দরকার তা করলে, অর্থনীতির চাকা ভালোভাবে ঘুরবে এবং সমস্যারা গণসমাধানের সামগ্রীতে পরিণত হবে এটা যারা বলবে, তারাও আস্থাহীনতার রোগে ভুগছে।   মানুষ তার নিজের বোধ-বিশ্বাসের বিশ্বে বাস করতে চায়। সে তার সব পদক্ষেপকে নিজের নিরিখেই যৌক্তিক ভাবতে ভালোবাসে। জগৎ ও সংসার সংক্রান্ত উপলব্ধি ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলো, যার যেমন চিন্তা-চেতনা, সেভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে। মনসচক্রবালের চৌহদ্দিভেদে দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্য হয়। নৃতত্ত্ববিদ আর সমাজতত্ত্ববিদ যথাক্রমে পৌরুষ ও পরিবেশকে মানুষের বোধ-বিশ্বাস সৃষ্টির নিয়ামক ভেবে থাকেন। উভয়ের মতবাদের মধ্যে বৈরিতা নেই বরং পরিপূরকের সম্পর্ক আছে। অস্থিমজ্জার সঙ্গে মিশে থাকা জাত্যাভিমানে এবং পরিবেশ প্রভাবের মেলবন্ধনে যে অয়োময় প্রতীতি গড়ে ওঠে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে, তা ব্যষ্টি ও সমষ্টির সমাজকে গতিদান করে। সমাজ এগুচ্ছে না পিছিয়ে যাচ্ছে, ভাঙছে না গড়ছে তা শনাক্তকরণের কাজে নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিকের সমীক্ষা সমীকরণের বিকল্প নেই। ‘সবার ওপর মানুষ সত্য’ এ উপলব্ধিরও কোনো বিকল্প নেই। মানুষই নিজ ও সবাইকে, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের অবয়বে সময়কে, পরিবার-সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণকে নিয়ন্ত্রণ করে। অবকাঠামো গড়ে যে সভ্যতা সংস্কৃতির বিকাশ সে ঘটায়, তার ধ্বংসের কারণও আবার সে-ই সৃষ্টি করে। মুক্তবুদ্ধি মানুষ যেমন দৃষ্টির প্রসারে আলোকিত হয়, অবরুদ্ধ চিন্তা-চেতনায় বন্দিত্ববরণের ফলে অন্ধকারে ডুবে যাওয়াও তার ভাগ্যে ঘটতে পারে। ভালো পথ যাচাই ও গ্রহণ-বর্জনের প্রশ্নটি, আদিকাল থেকেই অব্যাহতভাবে অমীমাংসিত আছে বলেই জীবন ও সমাজ গতিশীল। বৈধ অবৈধর প্রতি আসক্তি ও আকর্ষণের তারতম্যের মধ্যে সমাজের পরিবেশ-পরিচয় প্রকাশ পায়। সৃজনশীলতা মানুষের অন্যতম ধর্ম। প্রকৃতির অপার সম্পদ ও সৌন্দর্যকে রূপান্তর ও বহুমাত্রিক ব্যবহারোপযোগী করে তুলতে, মানুষ তার মেধা ও মননকে কাজে লাগায়। মানুষের মধ্যে যে সুকুমার বৃত্তিগুলো সৃজন সম্ভাবনায় উন্মুখ হয়ে আছে উপযুক্ত পরিবেশের পরিপোষক সমর্থনে ফল্গুধারার মতো তা বেরিয়ে আসতে পারে। এখানেও সৃজনশীলতা গঠন ও ধ্বংসের উভয় পর্যায়েই হতে পারে। সৃজনশীলতা গঠন না ধ্বংসের তা নির্ভর করে পরিবেশের প্রযতœ প্রয়াস ও চাহিদার ওপর। ঘটনার প্রকৃত কারণ নিহিত থাকে নেপথ্যে। যার দ্বারা ঘটনা ঘটে সে উপলক্ষ মাত্র, যে কারণে ঘটনা ঘটে কিংবা যে ঘটনা ঘটায় সেটিই মুখ্য। ভাড়াটিয়া খুনিকে দোষী সাব্যস্ত করার পাশাপাশি কার দ্বারা এবং কেন খুনি ভাড়া করা হলো তার যথাযথ হদিস হওয়া বাঞ্ছনীয়। এটি সমস্যার প্রকৃত নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই। নইলে সমাজের নৈতিক ভারসাম্য আর মূল্যবোধের প্রতি আস্থার ভিত্তিতে ধরতে পারে ভাঙন। প্রকৃতির অমোঘ বিধান, অন্যায়-অনিয়মের পরিবেশ সৃষ্টিকারী ও ইন্ধনদাতা অন্যায়কারীর  চেয়ে বেশি দায়ী। একে সুকৌশলে পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই কেননা প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘনকারীর অনিবার্য পরিণতিও অলঙ্ঘনীয়। কার্যকারণ ছাড়া কোনো কিছু যেমন ঘটে না, তেমনি কোনো ক্রিয়াই প্রতিক্রিয়াহীন থাকে না।

মানবকল্যাণকামিতার আদর্শ সময়ও সমাজভেদে নানান চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে থাকে। মানবকল্যাণধর্মী মূল্যবোধের বিকাশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত জরুরি যে, শত বাধা-বিপত্তি সংশয়-সংকট সন্ধিক্ষণেও সত্য সুন্দরের সনাতন উপলব্ধি থাকবে জাগ্রত। বিভ্রান্তির বেড়াজালে শাশ্বত মূল্যবোধ হারিয়ে যাবে কি না কিংবা নিরুদ্দিষ্ট হবে কি না তা নির্ভর করে ব্যষ্টি ও সমষ্টির আকাক্সক্ষার আকৃতি আর সজাগ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকৃতির ওপর। জনকল্যাণের নামে, সংস্কারের নামে কুশাসন, শোষণ মুক্তির নামে নানান মতবাদ-উপায়-উপলব্ধির অবয়বে শাশ্বত মূল্যবোধের ভাঙাগড়া চলে। শুভ উদ্যোগে বিশ্বাস ও প্রত্যয় হয় সুদৃঢ়। আত্মমর্যাদাবোধের বিকাশ আর কল্যাণকামিতায় আসে প্রাণপ্রাচুর্য। পক্ষান্তরে ক্ষুদ্র স্বার্থ চিন্তা-চেতনা দ্বারা তাড়িত পদক্ষেপে সৃষ্ট হতবাক পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম দেয় সব ক্ষেত্রে। বিশ্বাস আর আস্থায় ধরে ভাঙন। মানুষ বিশ্বাসের বিশ্বে নিরাপত্তা নির্ভরতায় বাস করতে চায়। আস্থা নিজের প্রতি, সমাজের প্রতি অতীব প্রয়োজন। আস্থার অবর্তমানে কিংবর্তব্যবিমূঢ় ব্যক্তি, সমাজে জগদ্দল পাথর হয়ে দাঁড়ায় এবং কিয়ৎকাল পরে তার চলৎশক্তির গতিধারায় ঘটতে পারে অশুভ দিক পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণহীন ট্রাফিক যেমন পদে পদে কারণে-অকারণে অহেতুক যানজটের হেতুতে পরিণত হয়। অসহিষ্ণুতা আর পারস্পরিক দোষারোপের বেড়াজালে, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মেলবন্ধন হয়ে পড়ে সুদূর পরাহত। রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি যেমন বহু রোগ সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায় চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে, আত্মস্বার্থ উদ্ধারের ভেদবুদ্ধি প্রবল হলে, ব্যষ্টি ও সমষ্টির সর্বনাশের সঙ্গে নিজের সর্বনাশও যে জড়িত এ উপলব্ধিটা হারিয়ে গেলে সমূহ বিপদ।

সমাজে নানা উপায় ও উপলক্ষে এমন সব ঘটনাবলির উদ্ভব হয় যা সমাজের গতিপ্রকৃতির দিকনির্দেশ করে। গঠনমূলক কর্মকা-ে সমাজ সমৃদ্ধ হয়। অবকাঠামোগত উন্নয়নের দ্বারা বিজ্ঞান ও সভ্যতার অনেক সুযোগ সহজে হাতের কাছে এসে যায় ধ্যানধারণায় তা যেমন নতুন মাত্রা যোগ করে, মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সূচিত হয় নানা সুযোগ। শোষণ বঞ্চনা বৈষম্যের অবসান ঘটাতে মানুষ সংগ্রাম করে শোষণহীন বঞ্চনা বৈষম্যরহিত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় বুক বাঁধে। প্রত্যাশা পূরণের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেখলে সংগ্রামের সার্থকতা সে খুঁজে পায় উদ্দীপ্ত চেতনায় দীপান্বিত হয়ে ওঠে। তার এবং সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় উন্নয়ন ও সংহতি সুদৃঢ় হয়ে ওঠে। আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণের পরিতৃপ্তিতে তুষ্ট জনগোষ্ঠীকে কোনো বাদ-বিসম্বাদ বিভ্রান্ত করতে পারে না। আগে যেমন বলা হয়েছে মানুষ তার কর্মকা-ের যৌক্তিকতা খুঁজে ফিরে নিয়ত নিজের নিরিখে। যদি দেখা যায়, ক্ষুদ্র ও খ-িত স্বার্থবাদিতা নানা বিভ্রান্তি ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে, তখন আত্মত্যাগের মহৎ উদ্দেশ্যগুলো সক্রিয় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। তখন উদ্দেশ্য-অভিপ্রায়, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির খতিয়ানের আঙিনায় অপব্যাখ্যার আগাছা জন্ম হয়। প্রয়োজনের সময় সে আগাছাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের চলৎশক্তির জন্য সেটা এক দারুণ দুঃসংবাদ।

লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান

চেয়ারম্যান, সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন

 mazid.muhammad@gmail.com