চট্টগ্রামের শীর্ষ ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদের জামিনে আতঙ্ক, স্থগিতাদেশে স্বস্তি

চট্টগ্রামের শীর্ষ ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী শারমিন তামান্নাকে খুনের সাত মামলায় দেওয়া জামিন স্থগিতাদেশে খবরে স্বস্তি ফিরে এসেছে জনমনে। 

এর আগে খুনের এসব মামলায় উক্ত সন্ত্রাসীর জামিন পাওয়ার সংবাদে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় ভুক্তভোগী পরিবারসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায়। এ ছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পুলিশের তালিকাভুক্ত এই সন্ত্রাসীর জামিনে নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল বলে অভিমত নগর পুলিশ কর্তাদেরও।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে শুধু সাজ্জাদ নয়, কারাবন্দি আরও অনেক দাগী সন্ত্রাসীকে মাঠে ‘ব্যবহারের’ জন্য কারাগার থেকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করছে একটি ‘রাজনৈতিক চক্র’। চক্রটি সন্ত্রাসীদের কারামুক্ত করতে আইনি লড়াইয়ের পেছনে লাখ লাখ টাকাও ঢালছেন। ছোট সাজ্জাদকে জামিনে মুক্ত করতে সাত খুনের মামলায় আইনি লড়াইয়ের পেছনে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাতটি খুনের মামলায় উচ্চ আদালত থেকে ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্নার জামিন পাওয়ার পর বিষয়টি কঠোরভাবে গোপনও রাখা হয়। সাজ্জাদের পরিচয় আড়াল করতেই ওই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। সাধারণত হাইকোর্ট থেকে জামিন হলে সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মধ্যে জামিননামা কারাগারে পৌঁছানোর কথা থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা হয়নি। জামিন পাওয়ার পরপরই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালত বা কারাগারে পাঠানো হয়নি। বরং পদে পদে কৌশল অবলম্বন করে বিষয়টি আড়াল রাখার চেষ্টা করা হয়। 

এদিকে সাজ্জাদের জামিনের বিষয়টি স্বীকার করে তার আইনজীবী আবু বক্কর সিদ্দিক দুই দিন আগে একটি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘কারাবন্দি সাজ্জাদ ও স্ত্রী তামান্না চারটি হত্যা মামলায় জামিন পেয়েছেন এবং জামিননামা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে হাইকোর্ট থেকে কাগজ চট্টগ্রামে  পৌঁছাতে দেরি হওয়ার কারণ জানি না।’ গত বছরের ২১ অক্টোবর বিকেলে নগরের চান্দগাঁও থানার শমসের পাড়া এলাকায় নাম আফতাব উদ্দিন তাহসিন (২৬) নামে এক ইট-বালু ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ।

নাম প্রকাশ না করে বালু ব্যবসায়ী তাহসীনের ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে উচ্চ আদালত থেকে একে একে সাতটি খুনের মামলায় সন্ত্রাসী সাজ্জাদের জামিনের খবরে মনে এক ধরনের হতাশা ও আতঙ্ক পেয়ে বসেছিলও। বুধবার তার জামিন স্থগিতের সংবাদে স্বস্তি পেলাম।’

জানা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রথমে চারটি, পরে তিনটি খুনের মামলায় হাইকোর্ট  থেকে জামিন পান শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ  হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না। বিষয়টি পুলিশ, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের নজর এড়াতে দীর্ঘ সময় ধরে  গোপন রাখা হয়। গত সপ্তাহে বিষয়টি জানাজানি হলে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ খুনের পৃথক সাতটি মামলায় সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীর জামিন স্থগিত করেন। এদিকে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি  জেনারেল অনিক আর হকের বরাত দিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সরকারি  কৌঁসুলি রায়হানুল ওয়াজেদ  চৌধুরী বলেন, ‘সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীর খুনের সাত মামলায় জামিন পান গত বছরের  সেপ্টেম্বরে। গত সপ্তাহে চট্টগ্রাম  কেন্দ্রীয় কারাগারে জামিননামা আসার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ জামিন স্থগিতের জন্য আবেদন করেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তা মঞ্জুর করেন।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চান্দগাঁও থানার  দোকান কর্মচারী শহিদুল ইসলাম হত্যা মামলায় গত ১৫  সেপ্টেম্বর সাজ্জাদ ও তামান্নাকে জামিন  দেন হাইকোর্ট। একই দিন একই বেঞ্চে ১৮ আগস্ট পাঁচলাইশ থানার ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলায় তাদেরসহ তিনজনকে জামিন  দেওয়া হয়। এক সপ্তাহ পর ২২  সেপ্টেম্বর পাঁচলাইশ থানার  দোকান কর্মচারী মো. ফারুক হত্যা মামলায় এবং একই দিনে আফতাব উদ্দিন তাহসীন হত্যা মামলাতেও তারা জামিন পান।

জানা গেছে, উক্ত চারটি খুনের মামলাতেই কোর্ট রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি ইউসুফ আবদুল্লাহ সুমনের  দ্বৈত বেঞ্চ তাদের জামিন দেন। যদিও ১৫ ও ২২ সেপ্টেম্বর জামিনের আদেশ  দেওয়া হয়, হাইকোর্টের সহকারী  রেজিস্ট্রা মো. ইউসুফ আলী যথাক্রমে ১৮  সেপ্টেম্বর ও ৫ অক্টোবর আদেশে স্বাক্ষর করেন। এরপরও সেই জামিননামা চট্টগ্রাম আদালতে পৌঁছায় প্রায় আড়াই মাস পর, ৮ ডিসেম্বর।

পুলিশ সূত্র জানায়, সন্ত্রাসী সাজ্জাদ ১০টি হত্যাসহ মোট ১৯ মামলার আসামি। তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও একাধিক হত্যাসহ আটটি মামলা রয়েছে। ছোট সাজ্জাদ বর্তমানে সিলেট কারাগারে এবং তার স্ত্রী শারমিন তামান্না ফেনী কারাগারে রয়েছেন। গত ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিং মল  থেকে সাজ্জাদকে  গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যমে ‘বান্ডিল বান্ডিল টাকা ছুড়ে’ সাজ্জাদকে জামিনে মুক্ত করার কথা উল্লেখ করে তামান্নার একটি বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তাকেও গ্রেপ্তার করেন পুলিশ।