আন্তর্জাতিক সমুদ্রে ভেনেজুয়েলার উপকূলসংলগ্ন এলাকায় একটি তেলবাহী জাহাজকে নজরদারিতে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযানটি সফল হলে গত দুই সপ্তাহের মধ্যে এটি হবে ভেনেজুয়েলা–সংশ্লিষ্ট তেল পরিবহনে তৃতীয় বড় ধরনের পদক্ষেপ।
আজ রবিবার (২১ ডিসেম্বর) একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনে জড়িত তথাকথিত ‘ডার্ক ফ্লিট’-এর একটি ট্যাংকারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজটি ভুয়া পতাকা ব্যবহার করছে এবং এটি বিচারিক জব্দ আদেশের আওতায় রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ট্যাংকারটি আনুষ্ঠানিকভাবে আটক করা হয়নি।
কর্তৃপক্ষ জানায়, এ ধরনের অভিযান বিভিন্ন কৌশলে পরিচালিত হতে পারে। সন্দেহভাজন জাহাজের কাছাকাছি নৌযান বা আকাশযান মোতায়েন করে নজরদারি বাড়ানোও এর অংশ। নিরাপত্তাজনিত কারণে পিছু নেওয়া জাহাজটির অবস্থান ও পরিচয় সরকারি সূত্র প্রকাশ করেনি।
তবে ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ট্যাংকারটির নাম ‘বেলা ওয়ান’। বড় আকারের এই জাহাজটি গত বছর মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় বলা হয়েছিল, জাহাজটির সঙ্গে ইরানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
ট্যাংকারট্র্যাকার্সডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ভেনেজুয়েলার দিকে অগ্রসরমান বেলা ওয়ান খালি অবস্থায় ছিল। তবে ২০২১ সালে এই জাহাজ ভেনেজুয়েলার তেল চীনে পরিবহন করেছিল—এমন তথ্য রাষ্ট্রায়ত্ত ভেনেজুয়েলা তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর অভ্যন্তরীণ নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি, অতীতে এটি ইরানি অপরিশোধিত তেল বহন করেছে বলেও নজরদারি সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল পরিবহন কার্যক্রমে নজরদারি আরও জোরদার করেছে। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সব তেলবাহী জাহাজের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেন। ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজগুলো এই ব্যবস্থার আওতায় পড়ছে। একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো এবং সমুদ্রপথে একাধিক অভিযান পরিচালনার তথ্যও প্রকাশ পেয়েছে।
এর আগে, ১০ ডিসেম্বর ভেনেজুয়েলা–সংশ্লিষ্ট প্রথম তেলবাহী জাহাজ হিসেবে ‘দ্য স্কিপার’ নামের একটি ট্যাংকার জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্র। রবিবার সেটি হিউস্টনের কাছে গ্যালভেস্টন অফশোর লাইটারিং এলাকায় পৌঁছায়। বড় আকারের ট্যাংকারগুলো হিউস্টনের নৌপথ অতিক্রম করতে না পারায় সেখানে সাধারণত ছোট ট্যাংকারে তেল স্থানান্তর করা হয়।
হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক পরিষদের পরিচালক কেভিন হ্যাসেট বলেন, জব্দ হওয়া প্রথম দুটি ট্যাংকার অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এবং নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশগুলোতে তেল সরবরাহে যুক্ত ছিল। তাঁর মতে, এ ধরনের জাহাজের সংখ্যা খুবই সীমিত হওয়ায় এতে মার্কিন বাজারে তেলের দামে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।
এরই মধ্যে এশিয়ার বাজারে তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪২ সেন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ৮৯ ডলারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম বেড়ে হয়েছে ব্যারেলপ্রতি ৫৬ দশমিক ৮৯ ডলার।
ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভান্নি স্টাউনোভো মনে করেন, ট্যাংকার জব্দ ও নজরদারি বাড়ানোর ঘটনাকে ব্যবসায়ীরা বাজারে উত্তেজনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আটক হওয়া একটি জাহাজ আগে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় না থাকায় বিষয়টি বাড়তি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এর আগে বলেছেন, দেশটির তেল বাণিজ্য অব্যাহত থাকবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নজরদারি ও অভিযান জাহাজ পরিবহনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এর ফলে রপ্তানি আয় কমে গেলে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদনও চাপের মুখে পড়তে পারে।
এনার্জি বিশ্লেষক ফ্রান্সিসকো মোনালদি বলেন, কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির ফলে ভেনেজুয়েলার তেল আয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, রপ্তানি হ্রাস পেলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে হতে পারে, যা দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।