ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দেশটির আইনি ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। আদালত এক ব্যক্তির ধর্ষণের দণ্ডাদেশ বাতিল করে এই মন্তব্য করেন যে, মামলাটির উৎপত্তি এক ‘সম্মতিমূলক সম্পর্ক’ থেকে, যা পরে বিচ্ছেদ ও আইনি বিরোধে রূপ নেয়। শুধু তাই নয়, আদালতের মধ্যস্থতায় বিবাদমান প্রেমিক-প্রেমিকা পরস্পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং এখন সুখী দাম্পত্য জীবনযাপন করছেন।
বিচারপতি ভি. নাগরত্ন ও বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার বেঞ্চ এই অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত দেন।
মামলার পটভূমিতে বলা হয়, অভিযোগকারী নারী ও অভিযুক্ত পুরুষ ২০১৫ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পরিচিত হন। তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বিবাহে রূপ না নেওয়ায় ২০২১ সালে মহিলা ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৬ (ধর্ষণ) ও ৩৭৬(২)(এন) (বারংবার ধর্ষণ) এর অধীনে এ মামলা দায়ের করেন। একটি ট্রায়াল কোর্ট অভিযুক্ত পুরুষকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের কঠোর কারাদণ্ড দেয়। পরে হাইকোর্ট তার জামিন আবেদন নাকচ করে দিলে তিনি সুপ্রিম কোর্টে আসেন।
গত মার্চ মাসে, আবেদনকারীর জামিন শুনানিতে আদালত তখনই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তাদের ‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়’ বলছে যে, অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত পুনর্মিলিত হতে পারেন। আদালতের এই পর্যবেক্ষণই ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
মামলাটির জটিলতা উপলব্ধি করে বিচারপতিদ্বয় অভিনব একটি পন্থা গ্রহণ করেন। তারা আদালত কক্ষে আলাদাভাবে ঐ পুরুষ, মহিলা এবং তাদের পিতামাতার সাথে কথা বলেন, তাদের সম্পর্কের প্রকৃতি ও মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেন। উভয় পক্ষই আদালতকে জানান যে তাদের পরস্পরের প্রতি বিয়ের ইচ্ছা ছিল এবং পরিবারও এ ব্যাপারে সম্মত। এই খবর পেয়ে সুপ্রিম কোর্ট বিয়ের উদ্দেশ্যে পুরুষটিকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করে। এরই ফলশ্রুতিতে দম্পতি গত জুলাই মাসে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
সাম্প্রতিক চূড়ান্ত শুনানিতে আদালতকে জানানো হয় যে নবদম্পতি এখন সুখে সংসার করছেন। এই তথ্য ও পূর্ণ অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট অভিযোগ, দণ্ডাদেশ ও সাজা রদ করে দেয়।
রায়ে আদালত স্পষ্ট বলেন, আমরা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪২ এর অধিকার প্রয়োগ করছি। আমাদের বিবেচনায়, এটি একটি সম্মতিমূলক সম্পর্ক ছিল, যা পরে ভুল বোঝাবুঝির কারণে ফৌজদারি অপরাধের রূপ পেয়েছিল। আদালতের মতে, বিয়ের সময় পিছিয়ে যাওয়ায় মহিলার মনে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয় এবং সেই হতাশা থেকেই তিনি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন।
শুধু মামলা খারিজ করেই ক্ষান্ত হননি আদালত। রায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির পুনর্বাসনেরও ব্যবস্থা করা হয়। আদালত জানান, যেহেতু মামলার ভিত্তিতে তার সরকারি চাকরি (হাসপাতালে কর্মরত) স্থগিত করা হয়েছিল, তাই এখন তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে এবং স্থগিতাদেশের সময়ের সমস্ত বকেয়া বেতন তাকে পরিশোধ করতে হবে। মধ্যপ্রদেশের সাগর জেলার প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তাকে এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আদেশ জারি করে তার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বকেয়া বেতন মেটানোর নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।