বছরটা দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসকে দুই ভাগে ভাগ করবে নিঃসন্দেহে। খ্রিস্টপূর্ব এবং খ্রিস্টাব্দের মতো প্রোটিয়াদের ক্রিকেট ইতিহাসকে ভাগ করা হবে ২০২৫ পূর্ব এবং ২০২৫ পরবর্তী সময়ে। কারণ ২০২৫ সালেই যে প্রথম কোনো বিশ্বকাপ জিতল দক্ষিণ আফ্রিকার পুরুষ দল। এখন নিশ্চয়ই বৈশ্বিক আসরগুলোতে আর তাদের নামের পাশে থাকবে না ‘চোকার’ উপাধি!
আসছে বছরের গোড়াতেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, তাই বিদায়ী বছরটায় সীমিত ওভারে টি-টোয়েন্টি সংস্করণেই বেশি খেলেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়মিত দলগুলো। আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির মাধ্যমে বহুদলীয় আন্তর্জাতিক আসর ফিরেছে পাকিস্তানে, তবে ভারত খেলতে না যাওয়াতে আকর্ষণীয় অংশ অর্থাৎ একটি সেমিফাইনাল ও ফাইনাল হয় দুবাইতে। পাকিস্তান গ্রুপ পর্বও উৎরাতে না পারায় নিজের দেশে রীতিমতো দর্শকই হয়ে থাকতে হয়, স্বাগতিক হয়েও একটি ম্যাচও যে তারা জিততে পারেনি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে!
আইপিএল এবং পিএসএল, দুই প্রতিবেশীর দুই ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগ চলেছে প্রায় একই সঙ্গে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে দুই দেশেরই লিগ থেমে যায়। পাকিস্তানে পিএসএল খেলতে যাওয়া ক্রিকেটাররা ভয়ে দেশ ছাড়েন, রাওয়ালপিন্ডিতে একটি স্টেডিয়ামের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিধ্বস্ত হওয়া ড্রোনে। আইপিএলের ক্রিকেটাররাও ব্ল্যাকআউট কর্মসূচির কারণে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে বিমানের বদলে ট্রেনে করে অন্য শহরে আসেন, বদলানো হয় ভেন্যুও।
ঘটনাবহুল এই আইপিএলের শিরোপা জেতে বিরাট কোহলির দল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। ২০০৮ সালে, অনূর্ধ-১৯ বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে আসা অধিনায়ক কোহলিকে দলে নিয়েছিল বিজয় মাল্যর আরসিবি; এরপর ভারত মহাসাগরে অনেক জল গড়ালেও বিরাট কোহলি আর আরসিবির বাঁধন ছেঁড়েনি। ১৮ বছর পর রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু জিতল প্রথম আইপিএল ট্রফি, বিরাট কোহলির প্রথম আইপিএল শিরোপা। এই আনন্দ উৎসবের আয়োজনে বেঙ্গালুরুর হোম গ্রাউন্ড চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে পদদলিত হয়ে মারা যান ১১ জন, ৫৬ জন আহত হন।
যে বছর যে সংস্করণের বিশ্বকাপ, তার আগের বছরে হবে সেই সংস্করণের এশিয়া কাপ। এই নীতিতে ২০২৫ সালে এশিয়া কাপ হয় টি-টোয়েন্টি সংস্করণে। এশিয়া কাপের আয়োজন স্বত্ব ছিল ভারতের, কিন্তু এসিসি প্রধান পাকিস্তানে ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি মহসিন নাকভি, যে মানুষটি একই সঙ্গে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীও। পেহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলায় পর্যটকের মৃত্য এবং পরবর্তী সময়ে অপারেশন সিঁদুরসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক অস্থিরতায় এশিয়া কাপ হয় দুবাইতে। যেখানে ভারত এবং পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা ম্যাচ শেষে হাত মেলান না, কেউ মাঠে বিমান ভূপাতিত করার ইশারা করেন এবং শেষ পর্যন্ত ভারত এশিয়া কাপের শিরোপা জিতে নাকভির কাছ থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এসব নানান রাজনৈতিক রঙ খেলাটিকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
২০২৪ সালের শুরুতে, নিউজিল্যান্ড সফরে দক্ষিণ আফ্রিকার যে টেস্ট দলটি পাঠানো হয়েছিল; তা নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় তখন এসএ২০ চলছে। শীর্ষ তারকাদের বাদ দিয়ে আনকোরাদের নিয়ে গড়া টেস্ট দল গেল নিউজিল্যান্ডে। তা নিয়ে কত কথা, অথচ পরের বছর এই দক্ষিণ আফ্রিকাই জিতে গেল আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। টেস্টের বিশ্বকাপ। তাও আবার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে, যে অস্ট্রেলিয়া বহুবার তাদের কাঁদিয়ে বিদায় করেছে সাফল্যের দোরগোড়া থেকে। এখানে অবশ্য খানিকটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২৩-২৫ চক্রে খেলেছে সবচেয়ে কম, ১২ টেস্ট। যেখানে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারতের মতো দল খেলে ১৯ থেকে ২২টি টেস্ট। শতাংশ ভিত্তিক পয়েন্ট, চক্রে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের সঙ্গে না খেলা আর পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো ক্ষয়িষ্ণু দলগুলোকে একই চক্রে পেয়ে যাওয়াতে সুবিধা হয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার। মাত্র ৮ টেস্ট জিতেই তারা ফাইনালে, ভারত ৯টা আর ইংল্যান্ড ১১টা জিতেও পারেনি ফাইনালে উঠতে। তবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লর্ডসের ফাইনালটা তারা জিতেছে দারুণ খেলে। প্রথম ইনিংসে ৭৮ রানে পিছিয়ে থাকার পর অস্ট্রেলিয়াকে ২০৭ রানে দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট করে দিয়ে এইডেন মার্করামের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালটা জিতে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রোটিয়াদের টেস্ট সাফল্য অবশ্য থেমে থাকেনি কেবলই আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের ভেতরই। ২০২৫ সালে ভারত সফরে এসে ২৫ বছর পর তারা ভারতকে হোয়াইটওয়াশ করে ২-০তে টেস্ট সিরিজে হারিয়েছে তাদেরই মাটিতে।
বাংলাদেশ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেয়ে বাঘ হয়ে উঠলেও দেশের মাটিতে এমন সব দলের কাছে টেস্ট সিরিজ হারছে ভারত, যাদের বিপক্ষে একটা সময় ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও জিততে পারত। ২০২৪ সালে নিউজিল্যান্ডের মিচেল স্যান্টনার, আইজাজ প্যাটেলদের পর ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সাইমন হারমারকে খেলতেই পারছেন না ভারতের তারকা ব্যাটসম্যানরা। টেস্ট দলের ক্রিকেটার বাছতেও আইপিএলকে প্রাধান্য দেওয়া, ভুল নীতি ও কৌশল অবলম্বন; এমন অনেক কারণেই গৌতম গম্ভীর টেস্ট দল নিয়ে সমালোচনার মুখে। চলতি বছর ভারত আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ও এশিয়া কাপ (টি২০) জিতেছে, সাদা বলে ভারতের সাফল্যের কৃতিত্ব যেমন পাচ্ছেন গম্ভীর তেমনি সমালোচিত টেস্টে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক ব্যাটিং কৌশল এবং একাদশ নির্বাচনে খেয়ালখুশির জন্য। টেস্ট একাদশে তিনে ব্যাটিং নামাচ্ছেন সাই সুদর্শনকে অথবা ওয়াশিংটন সুন্দরকে, একই দলে একসঙ্গে অক্ষর প্যাটেল, কুলদীপ যাদব এবং রবীন্দ্র জাদেজাকে খেলাচ্ছেন। মিডল অর্ডারে সরফরাজ খানকে বসিয়ে রাখছেন, আজিঙ্কা রাহানেকেও সুযোগ দিচ্ছেন না। এসব কারণের পরও গম্ভীর হয়তো কোচ হিসেবে টিকে যাবেন কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড লাল বল ও সাদা বলে আলাদা কোচ রাখার বিপক্ষে আর শুধু টেস্ট দলের কোচ হতে রাজি হচ্ছেন না ভিভিএস লক্ষ্মণও। তবে এতটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। ২০১১’র পর এই রবিবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম কোনো টেস্ট জিতল ইংল্যান্ড, সেটা আবার ডেড রাবার। অর্থাৎ ৩-০তে অ্যাশেজ খোয়ানোর পর। সিরিজ শুরুর আগে বলা হচ্ছিল স্মরণকালের সবচেয়ে দুর্বল অস্ট্রেলিয়া দলের বিপক্ষে খেলতে যাচ্ছে ইংল্যান্ড, মাঠে ফল হয়েছে উলটো। ‘বাজবল’-এর প্রবর্তক ম্যাককালাম ও তার ভাবাদর্শে দীক্ষিত গম্ভীর, কারও দলই ভালো করছে না। অ্যাশেজে প্রথম টেস্ট ২ দিনে, দ্বিতীয় টেস্ট সাড়ে ৩ দিনে আর তৃতীয় টেস্ট গিয়েছিল পঞ্চম দিনে। চতুর্থ টেস্ট শেষ দুই দিনেই। রবিবারের আগেই খেলা শেষ হয়ে যাওয়াতে প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। টিকিটের দাম ফেরত, সম্প্রচার সংস্থার ক্ষতি...সব মিলিয়ে এবারের অ্যাশেজ ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে। যে কারণে বিগব্যাশ লিগ-এর ফ্র্যাঞ্চাইজি স্বত্ব ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির চিন্তাভাবনা করছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া।
নারীদের ক্রিকেটে বছরটা ছিল বিশ্বকাপের। ভারত ছিল স্বাগতিক, পাকিস্তানের ম্যাচগুলো হয় শ্রীলঙ্কায়। প্রথমবারের মতো নারী বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে ভারত। তবে এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল প্রাইজমানি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপের প্রাইজমানি ছিল ৩.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখান থেকে ২০২৫ সালের আসরে প্রাইজমানি বাড়িয়ে করা হয় ১৩.৮৮ মিলিয়ন ডলার যা ২০২৩ সালের পুরুষদের ওয়ানডে বিশ্বকাপের চেয়েও বেশি! এমনকি ফিফা নারীর বিশ্বকাপের জয়ী দলের চেয়েও মেয়েদের ওয়ানডে বিশ্বকাপের বিজয়ীরা বেশি অর্থ কামিয়েছেন! ভারতীয় দল আইসিসি থেকে পেয়েছে ৪.৪৮ মিলিয়ন ডলার, এরপর বিসিসিআই দিয়েছে আরও ৫১ কোটি রুপি। হারমানপ্রিত কউর, স্মৃতি মান্দানা, জেমিমা রদ্রিগেসরাও এখন রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলিদের কাতারে।
ব্যক্তিগতভাবে এই বছরটা দারুণ কেটেছে শুবমান গিলের। এই বছরই ভারতের টেস্ট অধিনায়ক হয়েছেন। বছরের সর্বোচ্চ রানও তার, ৯ টেস্টে ৯৮৩। সেঞ্চুরি ৫টি। জো রুটও দারুণ ছন্দে ছিলেন, তবে অ্যাশেজে তার ব্যাটের রান খরায় শচিন টেন্ডুলকার হয়তো খানিকটা স্বস্তিতে। রিকি পন্টিংকে ছাড়িয়ে টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্যারিয়ার রান এখন রুটের (১৩৭৭৭), সামনে শুধুই টেন্ডুলকার (১৫৯২১)। বিরাট কোহলি এই বছর ওয়ানডে সেঞ্চুরির সংখ্যায় ছাড়িয়ে গেছেন টেন্ডুলকারকে। ভারতীয় ক্রিকেট ঈশ্বরের ৪৯ ওয়ানডে সেঞ্চুরি এক সময় মনে হচ্ছিল হিমালয়, এই বছর রাঁচিতে সেঞ্চুরির হাফসেঞ্চুরি করেন কোহলি। এরপর সেই সংখ্যাটাকে এখন ৫৩-তে নিয়েছেন কোহলি, সামনে হয়তো সেটা আরও বাড়বে।
টেস্টে বল হাতে বছরের সবচেয়ে বেশি শিকার মিচেল স্টার্কের, ১১ টেস্টে ৫৫টি। টেস্ট ক্যারিয়ারের উইকেট সংখ্যা ৪২৮। অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের ভেতর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তবে দিনরাতের গোলাপি বলের টেস্টে স্টার্কের ধারেকাছে কেউ নেই উইকেট-সংখ্যায়। স্টার্কের উইকেট ৮৯টি, হয়তো প্রথম ১০০ উইকেট হবে এই বামহাতি পেসারেরই।
বছর জুড়ে শুবমান গিল, মিচেল স্টার্ক, বিরাট কোহলিদের দাপুটে পারফরম্যান্সের আড়ালে অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে অনেকের চলে যাওয়ার খবর। আম্পায়ার ডিকি বার্ড, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক ববি সিম্পসন, ভারতের স্পিন কিংবদন্তি দিলিপ দোশি, ইংল্যান্ডের রবিন স্মিথ পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন এই বছরই।