হোটেলের জানালার বাইরে গুলির শব্দ প্রথম শুনেছিলেন গভীর রাতে। কিন্তু বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি আম্মার কামালদিন তাইফুর। ভেবেছিলেন, দূরের কোনো গোলমাল—ঘুম ভাঙানোর মতো নয়। পরদিন ম্যাচ আছে, বিশ্রাম দরকার। আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি।
কয়েক ঘণ্টা পর বাস্তবতা বদলে যায়। ভোর হতেই আবার শুরু হয় গুলিবর্ষণ। এবার আর দূরে নয়—হোটেল ঘিরে ফেলেছে সশস্ত্র লোকজন। সুদানের ওমদুরমানে থাকা সেই হোটেলের চারপাশে অস্ত্র হাতে ঘুরছিল তারা, আকাশে উড়তে থাকা সেনাবাহিনীর বিমানের দিকেও ছোড়া হচ্ছিল গুলি। তখনই ২৮ বছর বয়সী আমেরিকান–সুদানি মিডফিল্ডার বুঝতে শুরু করেন, দেশজুড়ে যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তারই প্রথম সাক্ষী হয়ে উঠছেন তিনি।
“জানালা দিয়ে দেখলাম—চারদিকে মানুষজন বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে। কেউ কল্পনাও করেনি এমন কিছু ঘটতে পারে,” আফ্রিকা কাপ অব নেশন্স চলাকালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন তাইফুর।
এরপর টানা দুই দিনেরও বেশি সময় হোটেলের ভেতর আটকা পড়ে থাকেন তাইফুর ও তাঁর সতীর্থরা। কোচিং স্টাফ, চিকিৎসক—সবাই। খাবার আর পানির সংকট বাড়তে থাকে। বাইরে বেরোনোর কোনো উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত বন্দুকধারীরা সরে গেলে হোটেল ছাড়তে সক্ষম হন তাঁরা। সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে তাইফুরের সুদান অধ্যায়ের শেষ। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে বাধ্য হন তিনি, রেখে আসেন নিজের পেশাদার ক্যারিয়ার, পরিবার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
তাইফুর একা নন। যুদ্ধ সুদানের বহু ফুটবলারকে একই পরিণতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। কেউ পরিবার রেখে পালিয়েছেন, কেউ দেশ ছাড়তে না পেরে ক্যারিয়ার হারিয়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতার মাঝেই তাঁরা লড়ছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টিকে থাকার জন্য।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধকে জাতিসংঘ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ—বাস্তব সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে মনে করে ত্রাণ সংস্থাগুলো। ঘরছাড়া হয়েছেন এক কোটিরও বেশি মানুষ। রোগ, অনাহার আর নিরাপত্তাহীনতায় বিপর্যস্ত পুরো দেশ।
এই অন্ধকার সময়েও এক টুকরো আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে সুদানের জাতীয় ফুটবল দল—‘ফ্যালকনস অব জেদিয়ান’। দেশের বাইরে অনুশীলন আর ম্যাচ খেলেই আফ্রিকা কাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে তারা। বাছাইপর্বে ঘানার মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেওয়াটা ছিল রীতিমতো বিস্ময়।
মরক্কোর রাজধানী রাবাতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের আগে সুদানি সমর্থকদের উচ্ছ্বাস যেন যুদ্ধের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়েছিল। জাতীয় পতাকা হাতে শত শত মানুষ স্লোগান দিয়েছেন, নেচেছেন, উল্লাসে ভেঙে পড়েছে রাস্তা। কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও যেন যুদ্ধ থেমে গিয়েছিল।
জাতীয় দলের খেলোয়াড় মোহাম্মদ আবুয়াগলা বলেন, “এই যুদ্ধ আমাদের দেশকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে। আমরা যখন খেলি, জিতি—তখন মানুষ একটু হলেও আনন্দ পায়। কষ্টের ভেতরে হাসির ছোট্ট একটা বীজ বুনতে চাই আমরা।”
যুদ্ধের মূল্য দিতে হয়েছে তাঁকেও। নিজের কাকাকে হারিয়েছেন আবুয়াগলা। চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ধরে আসে ফুটবলারের।
দেশের ঘরোয়া লিগ বন্ধ। খেলতে হচ্ছে বিদেশে—প্রধানত লিবিয়া, রুয়ান্ডা কিংবা মৌরিতানিয়ায়। সুদানের দুই শীর্ষ ক্লাব আল-মেরিখ ও আল-হিলাল এখন রুয়ান্ডার লিগে অংশ নিচ্ছে। যুদ্ধের বাস্তবতায় ফুটবলও হয়ে উঠেছে ভাসমান।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় দলটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা এক বিরল প্রতীক। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস ও’ডোনোহু বলেন, “এই দলটি মানুষকে এক করতে পারে, কিছু উদযাপনের উপলক্ষ এনে দিতে পারে। তবে শুধু ফুটবল দিয়ে যুদ্ধ থামানো সম্ভব নয়—এই সংঘাতে বহু দেশি ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে।”
আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হারলেও এখনো গ্রুপ থেকে ওঠার সুযোগ আছে সুদানের। তবে ইনজুরিতে ভুগছে দল—অধিনায়কসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিটকে গেছেন। কোচ জেমস কুয়েসি আপিয়াহ জানালেন, সীমিত শক্তি নিয়েই এগোতে হবে।
তবু স্বপ্ন ছাড়েননি খেলোয়াড়রা। ট্রফি জয়ের স্বপ্ন যেমন আছে, তেমনি দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর দায়বদ্ধতাও। “প্রতিটি ম্যাচের আগে আমি সুদানের মানুষের জন্য দোয়া করি,” বলেন আম্মার তাইফুর। “ওরা সুখের যোগ্য। মাঠে নামলে আমি চেষ্টা করি—আমার সেরাটা দিতে, যেন তাদের কষ্টের ভেতর একটু আনন্দ এনে দিতে পারি।”
যুদ্ধের ছায়ার মধ্যেও তাই সুদানের ফুটবল কেবল খেলার গল্প নয়—এটি টিকে থাকার, আশা বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব সংগ্রাম।