রাজনীতিতে আসুক সময়ের উপলব্ধি

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচন হয়ে গেলে ভালো, সব ভালো না হলেও। সব ভালো হওয়ার অনেক কিছুই আমাদের ভালো নেই। তাই সবকিছুরই ‘সব’ হয় না। তবে এ ব্যাপারে দেশের নাগরিকদের কিছু ভূমিকা আছে। যা পালন করা নির্বাচন ভালো হওয়ার ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন ক) ভোট কেন্দ্রে যাওয়া। খ) নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া। গ) মার্কার চেয়ে ব্যক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া। ঘ) ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহযোগিতা করা। ঙ) নির্বাচন কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করা। চ) যে কোনো উচ্ছৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিহার করা। ছ) জনগণের পছন্দ ও অপছন্দের রায়কে মেনে নেওয়া। জ) শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে সবার সহযোগিতা করা। ঝ) উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ও অপপ্রচার থেকে বিরত থাকা এবং ঞ) জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ক্ষুদ্র শ্রেণিস্বার্থের বাইরে থাকা। এ সবের পথে অন্তরায় কী হতে পারে! হতে পারে রাজনৈতিক অসততা ও অনৈতিকতার প্রভাব বিস্তার করা, প্রার্থীর মাসল শক্তি ও অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা, প্রশাসনের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করা, বাইরের কোনো দেশের স্বার্থে জাতীয় ঐক্য নষ্ট করা,  সাম্প্রদায়িক কোন্দল বা সমস্যা সৃষ্টি করা, ভোটারদের অস্ত্র বা অর্থের ভয় দেখানো, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ছড়ানো, প্রশাসনের দায়িত্ব পালনে ন্যায়পরায়ণতার ব্যর্থতা এবং তেমন কোনো সমস্যা সৃষ্টি করা, যে কোনো রকম মাস্তানি, গু-ামি ও অনৈতিক আর্থিক প্রভাবকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিচর্চায় অপসংস্কৃতি অনুসরণ করা। অনেকের মনে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে নানান তর্ক-কুতর্ক সংশয় প্রশ্ন ও ইতিহাসের অপব্যাখ্যা বিভ্রান্ত করে। এ বিষয়গুলো সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার পরিবেশ নষ্ট করে। আসন্ন নির্বাচনকে নিয়ে যেসব সংশয় এবং আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে তারও কয়েকটা যেমন:

অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পেছনে মূলত আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবার সুযোগ এবং অধিকারের প্রশ্ন গুরুত্ব পাচ্ছে। এক অর্থে, এটা কোনো অন্যায় না। গুরুতর অন্যায় হচ্ছে, এ ব্যাপারে সাম্প্রতিক ইতিহাসকে খাটো করে দেখা। বিশেষ করে, বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগের দুঃশাসন এবং স্বৈরাচারী ও সন্ত্রাসী ইতিহাসকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা। বিগত পনের বছর (২০০৮-২০২৪) এই দলের দুঃশাসনে গণতান্ত্রিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির কোনো চর্চা এই দল ও তৎকালীন সরকার করেছে কি! এই বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। বিভিন্ন ধরনের কাজকর্মে বিগত ১৫ বছরে, এই দলের যে ইতিহাস আছে সেই সব পর্যালোচনা করে আপাতত দলটাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা কোনো নৈতিক অপরাধ না। আওয়ামী লীগ আমলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হয়নি। এখন যদি অনেক সত্য লুকিয়ে যাই, তাহলে ভিন্ন কথা। অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে বহু বছর থেকে অনুপস্থিত। শুধু নির্বাচনে ‘অন্তর্ভুক্তি’ হবে অন্য কিছুতে অগ্রাধিকার থাকবে না এর কী ব্যাখ্যা, জানি না। একটি স্বৈরাচারী রাজনৈতিক শ্রেণিশক্তিকে কয়েক বছর নির্বাচন থেকে দূরে রাখলে তাতে ‘অন্তর্ভুক্তি’মূলক চিন্তায়  কোনো নেতিবাচক ফল হবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি গত ৫৩ বছর সবকিছুতে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতির চর্চা করেছি? না হলে, এ প্রসঙ্গ তুলে আসন্ন নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। যার কোনো যুক্তি নেই। এ নিয়ে কু-তর্ক করলে, সমস্যার সমাধান হবে না। সবার আগে সামাজিক চিন্তা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় ইতিবাচক আদর্শ এবং দর্শনের অন্তর্ভুক্তির বিষয় প্রাধান্য না পেলে, কেবল রাজনীতি বা ভোটের বাজারে একে প্রাধান্য দিলেই ‘অন্তর্ভুক্তি’ সংস্কৃতির বাস্তবায়ন সম্ভব না।

কেউ কেউ বলেন নির্বাচনের পরিবেশ নেই। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের পর্যালোচনা এবং ব্যাখ্যা করলে বলতে পারব কি, দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিবেশ কখন, কার নেতৃত্বে ইতিবাচক ছিল সেই ভাবে? আমরা সবসময় একটা  বৈরী পরিবেশের মধ্যেই বড় হয়েছি বিগত ৫৩ বছর। একটা মিথ্যা, উদ্ধত এবং অহমিকার পরিবেশ সৃষ্টি করে বেড়ে উঠেছি কয়েক যুগ। পাশাপাশি পরিবেশকে দূষিত ও অভিশপ্ত করেছি শ্রেণিস্বার্থে। তাই চট করেই নির্বাচনে একটা ‘সুপরিবেশ’ থাকবে, সেটা হতে পারে না। পরিবেশকে দুর্গন্ধ করেছি নিজের স্বার্থে। পরিবেশ কোনো একটি ইনস্টিটিউশন বা কয়েক ব্যক্তির ওপরে নির্ভর করে না। নির্ভর করে সমাজের উৎপাদন সম্পর্ক এবং ন্যায়নীতির দীর্ঘদিনের যাত্রার ওপর। সামগ্রিক একতার ওপর। এটা বহুদিন থেকেই আমাদের মধ্যে নেই বললেই চলে।  রাজনৈতিক পরিবেশ, সমাজের অনেক কিছুর ওপর নির্ভরশীল। যাকে কলুষমুক্ত করতে কঠিন শ্রম ও সাধনার প্রয়োজন। এখানে আমাদের শিথিলতা আছে। চট করে পরিবেশের পরিবর্তন হবে না। পরিবর্তনের চেষ্টা ও সংগ্রাম অব্যাহত থাকতে হবে। নির্বাচন সেই চেষ্টা ও সংগ্রামের একটা অংশ। যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের আরেকটা বড় সমস্যা। এটাও নতুন না। অর্থের বিনিময়ে প্রার্থী নির্বাচন করা, গুন্ডামি বা অন্য কোনো প্রভাবের দাপটে নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া প্রমাণ করে, রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা এবং সততার অভাব রয়েছে। এই পুরনো সংস্কৃতি নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীর সংকট বাড়িয়েছে। এখনো তার ব্যতিক্রম হবে, তেমনটি মনে হয় না। এটি পরিবর্তনে সময় দরকার। গত ৫৩ বছর ধরে আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অযোগ্য প্রার্থী দ্বারা অনেক নির্বাচন করেছি, করিয়েছি। এই সত্য ও বাস্তবতাকে চট করে পরিবর্তন করে দেব বা পরিবর্তন হবে এই ভাবনাও কু-তর্ক সৃষ্টি করে, কিন্তু সমাধান দেয় না। দেশে সবসময় নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দিয়ে, ময়লা পানির স্রোতকে ভালো পানির স্রোত দিয়ে মুছে দিতে হবে। এর জন্য সময় ও সঠিক নেতৃত্ব প্রয়োজন, ত্যাগ প্রয়োজন। প্রয়োজন  ধৈর্য, সংগ্রাম ও লড়াইয়ে সত্যের পথে থাকার বিরতিহীন যাত্রাকে ধরে রাখার গতি চালু রাখা। নির্বাচনে আমাদের চাওয়ামতো সমস্ত যোগ্য প্রার্থীর সমাগম তখনই হবে যখন সামাজিক, রাজনৈতিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে। অসংখ্য ভুল, অপরাধ ও অন্যায় সামনে হয়তো অপেক্ষা করছে। এ জন্য প্রয়োজন বৃহত্তর ঐক্য। আজ আওয়ামী লীগের মতো একটা ফ্যাসিস্ট দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগকে আমরা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচনের অন্যতম যুক্তি হিসেবে দেখাতে চাই। অবাক বাংলাদেশ! আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেই কি সেখানে সব যোগ্য প্রার্থী, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন! 

ইতিহাস বলে, বিগত ৫৩ বছরের আমাদের রাজনীতির ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুশীল সমাজ বলে কিছু ভদ্রলোক। সমাজ ও রাষ্ট্রে একটা ‘প্রেসার গ্রুপ’ থাকতেই পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রেসার গ্রুপের প্রেসার কীসে? এটা কি তাদের রক্তের প্রেসার নাকি আদর্শের! আদর্শের হলে সেটা কোন আদর্শ? কোন দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপনিবেশ রাখার আদর্শ, নাকি আমাদের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব ও সংস্কৃতির বাস্তবতাকে রক্ষার আদর্শ! আপাতত যেসব প্রেশার গ্রুপ কাজ করছে বা কাজ করার চেষ্টা করছে তাদের লক্ষ্য অর্জনে, তারা কিন্তু সব কিছুর ওপরে দেশের বন্ধু না। বাইরের কারও বন্ধু। এদেরই অনেকে আবার সুশীল! এরা ঐক্যবদ্ধভাবে সমাজের মধ্যে একটা অনৈক্য সৃষ্টি করে রাখছেন। যেটি সাধারণ মানুষ ও কথিত সুশীলদের মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টি করে। এদেরই একটা অংশ কোনো পরিবর্তনের বিপক্ষে গিয়ে দাঁড়ায়। কারণ এরা শ্রেণি, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের কারণে পরিবর্তনে ভয় পান। ১৯৭২ থেকে আজ পর্যন্ত, এই বিষয়টা কবে, সাধারণ মানুষ ও দেশের পক্ষে ছিল? মূলত অধিকাংশ সময় এটা ছিল ক্ষমতাসীনদের পক্ষে। তাদের মোটিভ সার্ভ করেছে। এখনো তাই করে। একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচন দেখবার জন্য আমাদের যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিচর্চার প্রয়োজন, সেটা আমরা গত ৫৩ বছরেও পারিনি। সহসাই করতে পারব বলে, মনেও হয় না। একটা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য যা যা করণীয়, গত ৫৩ বছর তার কে কতটা করেছি। সেই ব্যবস্থাপনা কি আগামী পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব?

শুরু থেকেই লক্ষ করছি, আমাদের মধ্যে অনেকেই বর্তমান সরকারের সবকিছুতে অবিরাম একটা খুঁত ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছি। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে এই পর্যন্ত সমাজের প্রতিটি স্তরে যেসব মরণ ফাঁদ ও ছিদ্র তৈরি করেছি, সেখান থেকে উত্তরণের কোনো সহজ সরল পথ আছে কি সামনে? দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, আমরা আওয়ামী লীগের মতো বিশেষ করে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের মতো একটা স্বৈরশাসন এবং স্বৈরতন্ত্রকে বাদ দিতে বা পরিত্যাগ করার জন্য এখনো সম্মিলিতভাবে একত্র হতে পারিনি। এটা কি আমাদের বড় ব্যর্থতা নয়? আসন্ন নির্বাচনে অনেক সমস্যার কোনো সমাধান হবে না এখনি, তাও সত্যি। যে দলই এই নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসেন না কেন তারা দেশের স্বার্থে এ দেশের মানুষের কল্যাণে আহামরি কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন বলেও মনে হয় না। তবু আমাদের নির্বাচন হওয়া চাই। নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন। যে দল নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসবে, তারা যদি পাশর্^বর্তী দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করে নিঃসন্দেহে তার পরিণাম ভয়াবহ হবে, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। কারণ সময়কে উপলব্ধি করতে হবে। মনে রাখতে হবে আমরা কী চেয়েছিলাম, কী চাই আর কী করব? আগুনে পুড়তে পুড়তেই লোহা সোনা হয়। আমাদের সামনে সে রকম আগুন অপেক্ষা করছে। আমাদের দেশে সোনার দামাল ও লোহার মতোন কঠিন সন্তানরা এখনো বেঁচে আছে। এক হাদি চলে গেছেন অসংখ্য হাদিকে রেখে। পরিশেষে এও বলতে ইচ্ছা করে, আসন্ন নির্বাচনে যে-ই বিজয়ী হয়ে আসেন না কেন তারা যদি দেশের সার্বভৌমত্ব, রাজনীতি ও সংস্কৃতি রক্ষা করতে গিয়ে আগের মতো পররাষ্ট্র কৌশল অবলম্বন করেন, তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। এই বিষয়টা আমরা সবাই যেন মনে রাখি।

লেখক: রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক

Mahmud315@yahoo.com