অসাংবিধানিক গণভোট এবং সংসদ নির্বাচনে একতরফা অংশগ্রহণ করবে না জাসদ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সুস্পষ্টভাবেই নিরপেক্ষ না। এই সরকার নিরপেক্ষ অন্তর্ভুক্তি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বদলে একটি অসাংবিধানিক গণভোট ও একপাক্ষিক, একতরফা সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছে। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণভাবে সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছা বাস্তবায়নে অসাংবিধানিক গণভোট ও একপাক্ষিক একতরফা সংসদ নির্বাচনের প্রহসন করছে।

তাই জাসদ অসাংবিধানিক গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে একপাক্ষিক একতরফা নির্বাচন বর্জন করছে।
  
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির পক্ষ থেকে সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) ২০২৫ সকালে এক বিবৃতিতে জানাচ্ছে যে, জাসদ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ও নির্বাচনমুখী একটি রাজনৈতিক দল হিসাবে মনে করে, একটি অনির্বাচিত অসাংবিধানিক সরকারের চেয়ে একটি নির্বাচিত সাংবিধানিক সরকার যে কোনো বিবেচনায় শ্রেয়। সেই বিবেচনা থেকেই জাসদ কয়েকটি বিতর্কিত নির্বাচন ছাড়া অতীতে অনুষ্ঠিত সকল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। জাসদ একটি নির্বাচনমুখী দল হয়েও আসন্ন অসাংবিধানিক গণভোট এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে একপাক্ষিক, একতরফা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। 

জাসদ কেন নির্বাচন বর্জন করছে?

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স নিয়ে "রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্য পরিচালনার নিমিত্ত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা" হিসাবে সংবিধানের ১৫দশ সংশোধনীপূর্ব নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আলোকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যেদিন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল, সেই দিনই জাসদ বিবৃতি দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করে দ্রুততম সময়ে সকল দলের অংশগ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের তথা নির্বাচিত সাংবিধানিক সরকারের হাতে দেশের শাসনভার ন্যস্ত করার আহ্বান জানিয়েছিল। 

কিন্তু সমগ্র দেশবাসী ও বিশ্ববাসী লক্ষ্য করলেন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অতীতের নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর মত ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বদলে একের পর এক ফন্দিফিকির তালবাহানা করে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘ মেয়াদি করছে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে দেশের বিভাজিত রাজনীতির একটি পক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আরেক পক্ষের উপর চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া, মুক্তিযুদ্ধে মীমাংসিত বিষয়গুলো অমীমাংসিত ও অস্বীকার করা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্মারক—ভাস্কর্য—ম্যুরাল—স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে ভেঙ্গে গুড়িয়ে ফেলা, সঙ্গীত ও নাট্যায়োজনে বাধা প্রদান করা, বাঙালি ও আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি—লোকসংস্কৃতি এমনকি ইসলামের শান্তিবাদী, সহিষ্ণুতাবাদী, সমন্বয়বাদী, সুফিবাদী, মরমীবাদী ধারার উপর একের পর আঘাত হানার মত জঘন্য অপরাধে মদদ দিতে থাকে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আনার বদলে মব উস্কে দিয়ে দেশকে মবের মুল্লুকে পরিণত করে। নিম্ম আদালত থেকে উচ্চ আদালত—প্রশাসন—গণমাধ্যম—শিক্ষাঙ্গণ এবং পাড়া—মহল্লা—ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি রাস্তাঘাটে মববাজি আর খুন—গুম—ধর্ষণ—সন্ত্রাস—চাঁদাবাজির মাধ্যমে দেশে নরক গুলজার পরিস্থিতি তৈরি করে। সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান—কাজ—মজুরি—জীবিকা ধ্বংস এবং উৎপাদন ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে ছয় কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে পাঠিয়ে দেয়ার বন্দোবস্ত করে।  

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিজেদের দলনিরপেক্ষ, নিরপেক্ষ রাখার বদলে দেশে বিভাজিত রাজনীতির একটি পক্ষকে প্রকাশ্যে মদদ দেয়ার পাশাপাশি কিংস পার্টিও গড়ে তোলে। অন্য পক্ষকে সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও শত্রু বানিয়ে তাদের উপর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে কোনো আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে হরেদরে ঢালাও মিথ্যা মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তার করে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় এই পক্ষের কার্যালয়ে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও বেদখল করে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে জাতির উপর পরিচালিত যুদ্ধাপরাধের বিচার করার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন বেআইনিভাবে পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী জাতীয় নেতা হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননসহ বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার রাজনৈতিক নেতা ও পেশাজীবীদের ঐ পরিবর্তিত ট্রাইব্যুনালে (Inverted ICT) সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন মিথ্যা অভিযোগে সাজানো মামলায় বিচারের নামে প্রহসন করে বিচারিক হত্যার জন্য তোড়জোড় করছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের ক্ষমতাকালে প্রমাণ করেছে তারা কোনো বিবেচনাতেই নিরপেক্ষ না। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও তাদের ছিল না। তারা বিভাজিত রাজনীতির একটি পক্ষকে নির্বাচনে জিতিয়ে এনে এবং তাদের ক্ষমতাকালে তাদের সকল অসাংবিধানিক ও বেআইনি কার্যক্রমকে জুলাই সনদের নামে গণভোটে পাশ করিয়ে নিজেদের আইন ও বিচারের উর্ধ্বে রাখার জন্যই অসাংবিধানিক গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে একপাক্ষিক, একতরফা নির্বাচন করতে যাচ্ছে।
 
নির্বাচন কমিশন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছাপূরণের জন্য এই অসাংবিধানিক গণভোট এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে এই একপাক্ষিক, একতরফা নির্বাচনের আয়োজন করেছে। 

সমগ্র দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আশংকার সঙ্গে মিলিয়ে জাসদও মনে করে এই অসাংবিধানিক গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে এই একপাক্ষিক, একতরফা নির্বাচন দেশে সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক শাসন ও শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা তো রাখবেই না, বরং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিকে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার প্রতিহিংসার রাজনীতি এবং ধর্মান্ধ জঙ্গীবাদী, সন্ত্রাসবাদী, মববাদী রাজনীতিকে উৎসাহিত করে দেশে অশান্তি তৈরি করার অপরাজনীতি এবং এগুলোর হোতা অপশক্তিগুলিকে বৈধতা দিবে। জাতির সমস্ত অর্জনকে ধ্বংস করে জাতির উপর এই অপশক্তির হিংস্র আক্রমণ প্রলম্বিত করবে। তাই জাসদ দেশের সচেতন শুভবুদ্ধি সম্পন্ন গণতন্ত্রকামী, শান্তিকামী সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এই অসাংবিধানিক গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে একপাক্ষিক, একতরফা নির্বাচন বর্জন করছে।