ফোনের ওপাশে কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন সাবেক তারকা সাঁতারু মাহফুজা রহমান তানিয়া। ১৯৯১ সাফ গেমসে পদকজয়ী এই সাঁতারু ছিলেন বাংলাদেশের তিন মেয়াদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ভক্ত। খেলোয়াড়ি জীবনে ঘটা এক ঘটনার পর থেকেই বেগম জিয়ার আদর্শকে বুকে লালন করা তানিয়া নেত্রীর মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছিলেন না। তানিয়ার মতো মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার মৃত্যু শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ে গোটা ক্রীড়াঙ্গন। দেশনেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ বেশিরভাগ ক্রীড়া ফেডারেশন তাদের নির্ধারিত খেলাগুলো স্থগিত করে।
মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা খালেদা জিয়াকে মৃত ঘোষণা করার পর থেকেই সারা দেশে নেমে আসে শোকের ছায়া। তার মৃত্যুতে পৃথক পৃথক শোকবার্তা দিয়েছে বাফুফে, বিসিবি, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনসহ সব ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশন।
শোকবার্তায় বিসিবি লিখেছে, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অবকাঠামোগত অনেক উন্নতি হয়েছে। ক্রিকেটকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ক্রিকেট আজ এই পর্যায়ে আসায় তার অবদান অনেক।’ বাফুফে তাদের শোকবার্তায় লিখেছে, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। রাজনীতিতে তার অবদান দেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।’
বাফুফে তার মৃত্যুতে স্থগিত করেছে মঙ্গলবারের সব খেলা ও কর্মসূচি। ফলে মাঠে গড়ায়নি সোমবার শুরু হওয়া নারী ফুটবল লিগ ও ফেডারেশন কাপ, মহানগরী ফুটবল লিগ, অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় চ্যাম্পিয়নের ফাইনালসহ সব ফুটবল ম্যাচ। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাৎক্ষণিক বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) নির্ধারিত সব খেলা স্থগিত করেছে বিসিবি। বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশন স্থগিত করে জাতীয় কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপের খেলা।
সাবেক তারকা অ্যাথলেট সামিমা সাত্তার মিমু বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক ছিল। আমার আপন খালাতো বোন ছিলেন তিনি। যদিও আমি রাজনীতির সঙ্গে কখনো জড়িত হইনি। তবে ওনার পরিবারের সবাই খেলাধুলা ভালোবাসত। খেলাধুলাকে প্রচ- ভালোবাসতেন খালেদা জিয়া।’ সাবেক তারকা সাঁতারু তানিয়া কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘১৯৯১ সালে যখন সাফ গেমসে অংশ নিতে যাচ্ছিলাম। তখন তিনি বিমানে এসেছিলেন আমাদের শুভ কামনা জানাতে। সবার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে হাত মিলিয়েছেন। বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে তার ব্যবহার আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করে। সেই থেকেই আমি তার ভক্ত হয়ে যাই। দোয়া চাই আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করে নেন।’
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আলফাজ আহমেদও শোকে বিহ্বল খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে, ‘২০০১ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ ট্রফি এসেছিল বাংলাদেশে। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। আমি সোনার ট্রফিটি ওনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। ট্রফি হাতে নিয়ে একটি প্রশান্তির হাসি দিলেন। খুবই ক্রীড়ানুরাগী ছিলেন তিনি। বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, দেশের ফুটবলকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।’
কমনওয়েলথ শুটিং ও এসএ গেমস সোনাজয়ী শুটার শারমিন আক্তার রত্না বলেন, ‘২০১৪ সালে যখন বারিধারায় নিজ বাসভবনে অবরুদ্ধ ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া, তখন আমিনুল হক ভাইয়ের সঙ্গে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। উনি এত অমায়িক ছিলেন এবং আমার খেলাধুলার রেজাল্ট সম্পর্কে যখন জানলেন তখন উনি এত হাস্যোজ্জ্বলভাবে কথা বলেছিলেন যে একবারও নিজের ভেতরে ওই সংকোচটা আসেনি যে আমি তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে এসেছি!’
জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক রাজিন সালেহ শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা দেশের একটা বড় সম্পদ আজ হারিয়ে ফেললাম। কিংবদন্তিতুল্য খালেদা জিয়া দেশের অন্যতম সেরা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। যার ভেতরে দেশের প্রতি অনেক মায়া ছিল। ওনার ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকো ভাই অনেক ক্রিকেট অনুরাগী ছিলেন। আমি মনে করি তিনি ছিলেন আধুনিক ক্রিকেটের রূপকার। পুরো পরিবারটাই ক্রীড়াঙ্গনে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিল।’
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল খান নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘তার প্রয়াণে দেশ হারাল এক দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীককে। মহান আল্লাহ তার রুহের মাগফিরাত দান করুন ও জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।’