অলিম্পিক স্কলারশিপ হারানোর শঙ্কায় তিন শুটার

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অলিম্পিক সলিডারিটির অধীনে বাংলাদেশের ছয় ক্রীড়াবিদ পাচ্ছেন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির আকর্ষণীয় স্কলারশিপ। প্রতি মাসে একেকজনকে দেওয়া হচ্ছে ১৫০০ মার্কিন ডলার করে। এই স্কলারশিপের সুবিধা তারা পাবেন আগামী ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকের আগ পর্যন্ত। স্কলারশিপের অধীনে আছেন তিনজন শুটার ও তিনজন আরচার। অথচ স্কলারশিপ যেকোনো সময় বাতিলের শঙ্কায় আছেন তিন শুটার কামরুন নাহার কলি, শায়রা আরেফিন ও রবিউল ইসলাম। এই তিন রাইফেল শুটার প্রায় মাসখানেক হলো অনুশীলনের সুযোগ পাচ্ছেন না। শর্ত অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আসরেও তাদের খেলার সুযোগ করে দেওয়া হয়নি বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের পক্ষ থেকে। ফেডারেশনের প্রভাবশালী এক কর্তার বিরুদ্ধে নারী শুটারদের যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর থেকেই সব কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা হয়েছে। তা ছাড়া তড়িঘড়ি নির্বাচন আয়োজন করে বর্তমান অ্যাডহক কমিটি চাইছে পাকাপোক্তভাবে মসনদ দখল করতে। অথচ দিনের পর দিন অনুশীলনের সুযোগ হারানোয় স্কলারশিপ হারানোর ভয় যেমন তিন শুটারকে পেয়ে বসেছে, তেমনই অনেক নবীন শুটারের পারফরম্যান্স গ্রাফও নামছে হু হু করে।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টগুলোতে বাংলাদেশের অনেক পদক এসেছে শুটিং থেকে। অথচ শুধু ফেডারেশনের নেতৃত্ব সংকটে খেলাটা সম্ভাবনা প্রায় শেষ হওয়ার পথে। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর ফেডারেশনে কিছু সময়ের জন্য স্থবিরতা নেমে এসেছিল তৎকালীন মহাসচিব ইন্তেখাবুল হামিদ গা-ঢাকা দেওয়ায়। তারপরও এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক কর্নেল মোহাম্মদ আলী সোহেল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নিয়ে কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। তবে সরকার ১৬ জুলাই সেই কমিটি ভেঙে দিয়ে অ্যাডহক কমিটির কাছে দায়িত্ব দেয়। অ্যাডহক কমিটির মহাসচিব করা হয় অশীতিপর আলেয়া ফেরদৌসীকে। একটি জাতীয় ফেডারেশনের দায়িত্ব পালনের তার শারীরিক সামর্থ্য নিয়ে সে সময় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। পরে দেখা যায় আলেয়া ফেরদৌসীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে ফেডারেশনে একক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন যুগ্ম সম্পাদক জিএম হায়দার সাজ্জাদ। সাবেক এ শুটারই বলতে গেলে ফেডারেশন চালাচ্ছেন নিজের মতো করে। তাতেই যত গোলমাল। সম্প্রতি সাজ্জাদের বিরুদ্ধে একঝাঁক নারী শুটার যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাকে অপসারণের দাবিতে সরকার ও বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগও করেছেন তারা। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে মানববন্ধনের মতো কর্মসূচিও হয়েছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অবশ্য অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয়। এরপর থেকেই বলতে গেলে বন্ধ হয়ে গেছে সব ধরনের কর্মকাণ্ড। ৫ ডিসেম্বর একটি প্রতিযোগিতা হওয়ার পর বন্ধ ঘোষণা করা হয় ক্যাম্প। এরপর থেকেই শুটারদের অপেক্ষা ক্যাম্পে ফেরার।

জিএম হায়দার সাজ্জাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলাদের একজন কামরুন নাহার কলি স্কলারশিপ বন্ধ হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘কী কারণে এতদিন জাতীয় দলের ক্যাম্প বন্ধ আছে, সেটাই বুঝতে পারছি না। অনুশীলন নিয়মিত না করলে পারফরম্যান্স গ্রাফ নিচের দিকে নেমে যায়। আগামীকাল (আজ) থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন বছরের বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক আসরে হবে অলিম্পিকের কোটা প্লেস পাওয়ার। অলিম্পিক আমাদের স্কলারশিপ দিচ্ছে, যাতে আমরা সেরা প্রস্তুতি নিয়ে কোটা প্লেসের আসরে খেলতে পারি এবং কোটা নিয়ে সরাসরি অলিম্পিকে যেতে পারি। অথচ সর্বশেষ প্যারিস অলিম্পিকের পর থেকে বাংলাদেশের শুটাররা একটিও আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি। আর এখন তো ক্যাম্পই বন্ধ আছে। যদি এভাবে চলতে থাকে, স্কলারশিপ কেন দেবে আমাদের অলিম্পিক?’

এরপর তিনি ক্ষোভ ঝেড়েছেন জিএম হায়দার ইস্যু নিয়ে, ‘একজন লম্পট, চরিত্রহীন ও বিতর্কিত ব্যক্তিকে ফেডারেশনে রাখার জন্য পুরো কমিটি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অথচ এতে শুটারদের, সর্বোপরি দেশের চরম ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের কথা হলো সরকার তদন্ত কমিটি করেছে। সেই তদন্ত চলার পাশাপাশি তো অনুশীলন ক্যাম্পও চলা উচিত। যদি আমাদের অভিযোগ অসত্য হয় তদন্তে, তখন আমাদের বাদ দিয়ে দিক। তার আগে কেন সব বন্ধ করে রাখা হবে। অথচ ফেডারেশন তো ঠিকই স্কলারশিপের ৬৫ শতাংশ আমাদের কাছ থেকে নিয়ে নিচ্ছে অনুশীলন পরিচালনা, খাবার-দাবার, ভালো কোচ, উন্নতমানের সরঞ্জামাদি ও বিদেশে খেলার সুযোগ করে দেওয়া বাবদ।’

কলির মতো ততটা ফুঁসে ওঠেননি রবিউল ইসলাম। প্যারিস অলিম্পিকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা এই শুটার চান দ্রুত ক্যাম্পে ফিরতে, ‘ক্যাম্প না হলে, অনুশীলনের সুযোগ না পেলে এবং আন্তর্জাতিক আসরে খেলতে না পারলে তো এই স্কলারশিপ আমরা পাব না। এটা বন্ধ হয়ে গেলে ভীষণরকম ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। আমি তাই সবার কাছে অনুরোধ করব যাতে দ্রুত ক্যাম্প শুরুর ব্যবস্থা করা হয়।’

এদিকে প্যারিস অলিম্পিকের পর থেকে শুটাররা বিদেশি কোচের অধীনে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারছেন না। ৫ আগস্ট পরবর্তী কিছুদিন সাবেক শুটার শারমিন আক্তার রতœা ও গোলাম শফিউদ্দিন শিপলুর অধীনে ক্যাম্প চলেছে। এরপর অ্যাডহক কমিটি এসে দুই কোচকে বিদায় করে দায়িত্ব দিয়েছে সাফ গেমস সোনাজয়ী শুটার শারমিন আক্তারকে। যার কোচিং নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। জাতীয় দলের এক শুটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা এখন যে পর্যায়ে আছি এবং যে পর্যায়ে কমপিটিশন করি, সে পর্যায়ে আমাদের বিদেশি কোচের বিকল্প নেই। অথচ এখন শারমিন আপার কাছে আমাদের কোচিং করতে হচ্ছে। এভাবে আর যাই হোক, অলিম্পিকের কোটা প্লেস পাওয়া অসম্ভব।’

গত বছর জুলাই মাসে প্যারিস অলিম্পিক হওয়ার মাস দুই আগে ফেডারেশন জাতীয় এয়ারগান চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করেছিল। এরপর শীর্ষ পর্যায়ে আর কোনো ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে পারেনি ফেডারেশন। বিগত কমিটি সরকারের তারুণ্য উৎসবের ব্যানারে দেশব্যাপী একটি টুর্নামেন্ট করেছিল। বর্তমান কমিটি এখন পর্যন্ত ঘরোয়া বা আন্তর্জাতিক কোনো আসরই আয়োজন করেনি। শুটিংয়ের এ উল্টো পথে যাত্রার কারণে জানতে চাইলে মহাসচিব আলেয়া ফেরদৌসী বলেন, ‘আমরা নির্বাচন আয়োজন নিয়ে কিছুটা ব্যস্ত আছি। তাছাড়া কিছু শুটারের ইনজুরি আছে, তাই ক্যাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। এখন আমরা কাজ করছি নতুন করে ক্যাম্প শুরু করার।’

জিএম হায়দার সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে আলেয়া ফেরদৌসী বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর নিয়মিত রাত ৯টা পর্যন্ত অফিস করি। কোনো শুটারই তো তার (সাজ্জাদ) বিরুদ্ধে কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ আমাদের কাছে করেনি। করলে তো ফেডারেশন থেকেই আমরা তদন্ত করে সত্য উদঘাটনের ব্যবস্থা নিতাম। আর যেহেতু আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি, তাই তাকে দূরে সরিয়ে রাখার কোনো কারণই নেই। তিনি তার মতো দায়িত্ব পালন করছে। তিনি তো সাবেক শুটার। কোচিংয়ের কাজও তিনি করে থাকেন। আর কেউ অভিযোগ করলেই তো একজন দোষী সাব্যস্ত হবে না।’

জানা গেছে, গত সোমবার তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কাছে হস্তান্তর করেছে। যদিও এ কমিটি নিয়েও আছে প্রশ্ন। কমিটির একজন সদস্য শুটিং ফেডারেশনের নির্বাহী সদস্য দাইয়ান নাফিজ। যার বিরুদ্ধে আছে ৫ জুলাই পরবর্তী স্বেচ্ছায় রাজপথের বিশৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ করা ছাত্রদের প্ল্যাটফর্ম ট্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট গ্রুপের অর্থ তছরুপের গুরুতর অভিযোগ। আরও অভিযোগ আছে, সাজ্জাদ দাইয়ান নাফিজসহ তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ঘনিষ্ঠদের ঘুষ দিয়ে ফেডারেশন পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।

শুটিংয়ের সঙ্গে অতীতে কোনো সম্পৃক্তা না থাকা সত্যেও প্রথমে নির্বাহী কমিটিতে সুযোগ পাওয়া এবং পরে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে তদন্তে গঠিত কমিটিতে দাইয়ান নাফিজকে সদস্য করায় পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েই আছে প্রশ্ন।