দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দ্বন্দ্ব এবার প্রকাশ্যে এসেছে ইয়েমেনে সাম্প্রতিক এক হামলার পর। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে উপসাগরীয় এই দুই তেলসমৃদ্ধ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এক সময় ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে একসঙ্গে কাজ করা রিয়াদ ও আবুধাবি এখন ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও স্বার্থের পথে হাঁটছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের মধ্যকার দূরত্বও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ইয়েমেন, সুদান, আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল থেকে শুরু করে বৈশ্বিক জ্বালানি নীতি,সবখানেই তাদের অবস্থান এখন মুখোমুখি।
ইয়েমেনে এই বিভাজন সবচেয়ে প্রকট। হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গঠিত জোটে থাকলেও সৌদি আরব ও আমিরাত সেখানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের ভেতর ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছে। সম্প্রতি আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণী বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি পূর্ব ইয়েমেনের কয়েকটি এলাকায় সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে হটিয়ে দেওয়ার পর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। এর জেরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট একটি অভিযানে আমিরাত থেকে আসা অস্ত্রের চালান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরব যেখানে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধরে রাখতে চায়, সেখানে আমিরাত প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোকে সমর্থন দিতে আগ্রহী। রাজনৈতিক ইসলাম ও মুসলিম ব্রাদারহুড নিয়ে দুই দেশের আদর্শগত পার্থক্যও এই বিরোধকে তীব্র করছে। ইয়েমেনের বাইরেও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছড়িয়ে পড়েছে। সুদানে সৌদি আরব নিয়মিত সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিলেও আমিরাতের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী আধাসামরিক বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। আবার লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগর ঘেঁষা আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলেও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে দুই দেশ মুখোমুখি অবস্থানে।
এই বিরোধের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়াতে পড়বে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর লাখ লাখ শ্রমিক সৌদি আরব ও আমিরাতে কাজ করেন। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হলে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং কর্মসংস্থানের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে উন্নয়নশীল এসব দেশের আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এক সময়ের শক্তিশালী সৌদি-ইউএই জোট এখন প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। এই দ্বন্দ্ব দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শ্রমনির্ভর দেশগুলোর জন্যও তা বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠবে।