খুলনা

বসতভিটা কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে

খুলনায় ভূমিদস্যুদের দখলচেষ্টার মুখে পড়েছে ৩২টি দরিদ্র পরিবার। নগরীর উপকণ্ঠে মাথাভাঙ্গা মৌজায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত এসব পরিবার অভিযোগ করেছে, ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজ’ নাম ব্যবহার করে একটি ভূমিদস্যু চক্র তাদের বসতভিটা জোরপূর্বক দখলের পাঁয়তারা করছে।

ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন প্রায় সত্তর বছরের বৃদ্ধা জাবেরুন নেছা। তিনি রাজমিস্ত্রির যোগালের কাজ করে সারাজীবনের জমানো অর্থ দিয়ে প্রায় ১৭ বছর আগে নিজের নামে এক কাঠা এবং ছেলের নামে দুই কাঠা জমি কিনে বসতঘর নির্মাণ করেন। এখন সেই জমি দখলের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ তার।

শুধু জাবেরুন নেছা নন, একই এলাকায় বসবাসরত মসজিদের মোয়াজ্জেম আজিজুর রহমান, গৃহকর্মী লাইলী বেগম, শ্রমিক রশিদ শেখ, শাহানারা বেগম, আব্দুল আজিজ গাজীসহ মোট ৩২টি পরিবার একই সংকটে পড়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সাইনবোর্ড টাঙিয়ে জমির মালিকানা দাবি করে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাথাভাঙ্গা মৌজায় প্রায় ৩ একর জমির একটি অংশ থেকে ২ থেকে ৫ কাঠা পর্যন্ত জমি কিনে ৩২টি পরিবার বসবাস করছে। কেউ কেউ ৫০ বছর, কেউ ১৭ বছর আগে জমি কিনে বাড়িঘর নির্মাণ করেছেন। তাদের প্রত্যেকের নামেই মিউটেশন ও খাজনার দাখিলা রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজ’ নাম ব্যবহার করে আল মামুন নামের এক ব্যক্তি জমির মালিকানা দাবি করছেন। ইতোমধ্যে একজনের ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং জমিতে সার্বক্ষণিক লোক বসিয়ে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় ভীতসন্ত্রস্ত পরিবারগুলো লবণচরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করলেও তারা যথাযথ সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) জমির সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে মালিকরা বলেন, তারা সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। অন্য কোনো জায়গায় জমিজমা বা সম্পদ বিক্রি করে এখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছেন। জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হলে তারা চরম মানবিক সংকটে পড়বেন।

ভুক্তভোগীদের দাবি, জমিটির মূল মালিক ছিলেন রামচরণ মণ্ডল, যিনি ১৯৭১ সালে দেশ ত্যাগ করার পর জমিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়। ১৯৭২ সালে নাজির আহম্মেদ মোল্লা বন্দোবস্ত নেন। এরপর কয়েক দফা মালিকানা বদলের মাধ্যমে তারা জমি কিনেছেন। ১৯৯১ সালে মর্জিনা সিদ্দিকী একতরফা আদেশ নিয়ে মালিকানা দাবি করলেও হাইকোর্ট ওই আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ ও স্থিতাবস্থা জারি করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আল মামুন খুলনা মহানগরীর গল্লামারী এলাকার বাসিন্দা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আগে যুবলীগের পরিচয়ে ভূমিদস্যু কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে জমি দখলের চেষ্টা করছেন।

জমির মালিক মিনারা মসজিদের মোয়াজ্জেম আজিজুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘পৈত্রিক জমি বিক্রি করে ২০১৭ সালে এখানে ৩ কাঠা জমি কিনে বসবাস করছি। এখন স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে কোথায় যাব?’

গৃহকর্মী লাইলী বেগম বলেন, ‘আমি বিধবা। সন্ত্রাসীরা হুমকি দিয়ে জমি দখল নিতে চায়। এই বয়সে উচ্ছেদ হলে পথে বসতে হবে।’

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজ’- এর স্বত্বাধিকারী মো. আল মামুন বলেন, ‘জমিগুলো আমি বৈধভাবে কিনেছি। যারা এখানে আছে তারা প্রতারণার শিকার। তাদের কাছে বৈধ দলিল থাকলে ক্ষতিপূরণ দিয়ে সমাধান করা যাবে।’

লবণচরা থানার ওসি মো. তুহিনুজ্জামান বলেন, ‘৩২ জনের পক্ষে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’