নকিয়া শুধু মোবাইল ফোন ব্র্যান্ড নয়, প্রযুক্তির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্বর্ণালি অধ্যায়। একটা সময় মোবাইল ফোন বলতে নকিয়ার কথাই মনে হতো। মজবুত গঠন, দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি ও সহজ ব্যবহারÑ এই তিন গুণে বিশ্ব জুড়ে মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। স্মার্টফোন বিপ্লব নকিয়ার সম্রাজ্যে ভাটা আনলেও, সম্প্রতি প্রযুক্তি দুনিয়ায় নকিয়া আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
ফিনল্যান্ডে একটি কাগজ কল থেকে ১৮৬৫ সালে নকিয়ার যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯০-এর দশকে মোবাইল ফোন উৎপাদনে নেমে নকিয়া বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দেয়। ঘড়শরধ ১১০০, ৩৩১০, ৬৬০০-এর মতো ফোনগুলো মোবাইল ফোনের ইতিহাসে নাম লিখে নিয়েছে। এত জনপ্রিয়তার পেছনের কারণ ছিল অত্যন্ত টেকসই ও শক্ত গঠন, সবার জন্য সহজ অপারেটিং সিস্টেম, দীর্ঘ ব্যাটারি ব্যাকআপ, সব বয়সী ব্যবহারকারীর জন্য উপযোগী ডিজাইন।
অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএসের দ্রুত উত্থানের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় নকিয়া পিছিয়ে যায়। মাইক্রোসফটের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং উইন্ডোজ ফোন ব্যবহার নকিয়ার প্রত্যাশিত সাফল্য এনে দিতে পারেনি। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে নকিয়ার। বর্তমানে ঐগউ এষড়নধষ-এর মাধ্যমে নকিয়া আবার স্মার্টফোন বাজারে সক্রিয়। মোবাইল ফোনের পাশাপাশি নকিয়া বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ৫জি, নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তি ও টেলিকম অবকাঠামোতে। প্রযুক্তির এই নতুন যুগে নকিয়া আবারও বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নকিয়া যেভাবে ফিরে এলো
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মোবাইল ফোনের বাজারে একক আধিপত্য ছিল নকিয়ার। তবে ২০০৭ সালে আইফোনের আগমনের পর এবং পরবর্তী সময়ে অ্যান্ড্রয়েড ফোনের বাজার দখলের কারণে নকিয়া ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়তে থাকে, যা একসময় প্রতিষ্ঠানটির পুরো মোবাইল ব্যবসাকে প্রভাবিত করে।
তবে গত বছর নকিয়া নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে আসে। ক্লাউড সার্ভিস ও ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার সরবরাহের ক্ষেত্রে নকিয়ার সক্ষমতা চোখে পড়ে বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার। এরপরই নকিয়ায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের ঘোষণা দেয় কোম্পানিটি। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণ বলছে, দুই কোম্পানির এ উদ্যোগের মাধ্যমে নকিয়া শুধু বাজারে পুনরায় শক্ত অবস্থান গড়বে না, বরং ক্লাউড ও ডেটা সেন্টার প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নিজেদের গুরুত্ব বাড়াবে।
প্রযুক্তি বিশ্বে বড় ধরনের এক পরিবর্তনের সংকেত দিয়ে গত অক্টোবরে নকিয়ায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানায় এনভিডিয়া। টেলিকম নেটওয়ার্কগুলোয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার নিশ্চিত করতে দুই প্রতিষ্ঠান একটি কৌশলগত অংশীদারত্বে আবদ্ধ হয়। নকিয়ার বর্তমান প্রধান নির্বাহী জাস্টিন হটার্ড বলেন, ‘নকিয়া বরাবরই পুরনো সমস্যা পেছনে ফেলে সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলতে দক্ষ। এনভিডিয়ার সঙ্গে চুক্তির ফলে ভবিষ্যৎ মোবাইল নেটওয়ার্ক আরও স্মার্ট ও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
প্রায় ২০ বছর ধরে মোবাইল ফোনের বাজারে নকিয়ার যে রাজত্ব ছিল, তার মূলে ছিল ‘জিএসএম’ প্রযুক্তি। নকিয়াই প্রথম টু-জি নেটওয়ার্ক প্রযুক্তিকে দ্রুত গ্রহণ করেছিল, যা আজকের আধুনিক মোবাইল যোগাযোগের ভিত্তি তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নকিয়ার কি-বোর্ড যুক্ত ছোট পর্দার ফোনগুলোই মূলত সাধারণ মানুষের মাঝে টেক্সট মেসেজিং বা এসএমএস আদান-প্রদানের নতুন এক যুগের সূচনা করেছিল। ওই সময় ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ থেকে শুরু করে ‘চার্লি’স অ্যাঞ্জেলস’-এর মতো হলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমাগুলোয় নকিয়ার হ্যান্ডসেট বিশেষভাবে প্রদর্শিত হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইফোনের কাছে হেরে গিয়ে নকিয়া শেষ হয়ে যায়নি, বরং ফোন তৈরির ব্যবসা ছেড়ে টেলিকম নেটওয়ার্ক ও এআই প্রযুক্তির পেছনের মূল যন্ত্রাংশ তৈরির বিশাল এক ব্যবসায়িক শক্তিতে পরিণত হয়েছে ফিনল্যান্ডভিত্তিক কোম্পানিটি।
আইফোনের আগমনে ফোন ব্যবসা হারানোর পর নকিয়া মূল নজর সরিয়ে নেয় টেলিকম নেটওয়ার্ক ও ক্লাউড অবকাঠামোর দিকে। ২০১৫ সালে ১ হাজার ৫৬০ কোটি ইউরোয় ‘অ্যালকাটেল-লুসেন্ট’ কেনার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত কোম্পানির নেটওয়ার্ক ব্যবসার ভিত শক্ত করে। প্রতিষ্ঠানটিকে ‘এআই সুপারসাইকেল’-এর উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করছেন সিইও জাস্টিন হটার্ড। তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি বছর ডেটা সেন্টারগুলোর পেছনে বিশ্বজুড়ে যে শত শত কোটি ডলার খরচ হচ্ছে, সে বাজারের একটি বড় অংশ দখলের লক্ষ্য নকিয়ার।