বন বিভাগের সংবাদ সম্মেলন

মানুষ দেখলেই অস্বাভাবিক আচরণ করছে ফাঁদে আটকা পড়া বাঘটি

হরিণ শিকারীদের ফাঁদে আটকে পড়া সুন্দরবন থেকে উদ্ধারকৃত চিকিৎসাধীন বাঘটির সুস্থ হতে বেশ সময় লাগবে। তবে গত দুইদিন ধরে বাঘটি সামান্য খাবার গ্রহণ করেছে। একটু সুস্থ হওয়ার পর বুধবার সকালে ভয়ংকর চেহারায় গর্জন করেছে। মানুষ দেখলেই বাঘটি অস্বাভাবিক আচরণ করছে। ফাঁদে আটকা পড়া বাঘটির বাম পায়ের শিরা, নার্ভ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রক্ত চলাচল বন্ধ ছিল। এ ছাড়া বাঘটি তার স্বাভাবিক শক্তি হারিয়েছে। বাঘটিকে স্বাভাবিক ও সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।

আজ বুধবার দুপুরে খুলনা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সুন্দরবন বন বিভাগের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, গত ৪ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জ হতে উদ্ধারকৃত আহত বাঘটি বন বিভাগের খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে খুলনায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। বাঘটি প্রাথমিক অবস্থায় অত্যন্ত দুর্বল থাকলেও চিকিৎসা প্রাপ্তির পর এটি পানি পান ও খাদ্য গ্রহণ শুরু করেছে। ধীরে ধীরে এর ভেতর বন্য ক্ষীপ্রতা আসতে শুরু করেছে।

তিনি বলেন, বনবিভাগের ভেটেরিনারি অফিসার হাতেম সাজ্জাদ জুলকারনাইনের নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিল বাঘটি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের প্রফেসর ড. হাদী নূর আলী খানের নেতৃত্বে ঢাকা হতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল মঙ্গলবার রাতে খুলনা পৌঁছান এবং আহত বাঘটিকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ করেন।

বুধবার সকালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে বাঘটির অবস্থা সম্পর্কে পরামর্শ দেন। ফাঁদে আটকে থাকার কারণে বাঘের সামনের বাম পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বাঘটির চলনভঙ্গি দেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল ধারণা করছেন যে এটির কোনও হাড় ভাঙেনি, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল আশা প্রকাশ করেন অল্প সময়ের মধ্যেই বাঘটি সুস্থ হয়ে বনে ফিরে যেতে পারবে। তবে বর্তমানে এটির ক্ষত শুকানোর প্রক্রিয়া চলছে বিধায় এটির কাছে মানুষের সমাগম হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। এটি সম্পূর্ণ রূপে একটি বন্য প্রাণী যা কখনো মানুষের সংস্পর্শে আসেনি, তাই এটিকে সুস্থ করতে হলে এর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

ঢাকা সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হসপিটালের এডিশনাল ভেটেরিনারি অফিসার ডা. নাজমুল হুদা বলেন, বাঘটি বর্তমানে তিনটি সমস্যা রয়েছে। প্রথমত বাঘটির বাম হাতে পেইন হচ্ছে। এ অবস্থায় তার পক্ষে শিকার ধরা খুবই কঠিন। তাছাড়া ফাদের সুতায় বাম পায়ের শিরা, নার্ভ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রক্ত চলাচল বন্ধ ছিল। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হলেও শিরা, উপ-শিরাগুলো ঠিক হতে সময় লাগবে। বাঘটি হাটছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। দ্বিতীয়ত তার শরীরে পানিশুণ্যতা রয়েছে। তবে গত দুই দিন সে পানি পান করেছে। যা সুস্থ হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছে। তৃতীয়ত চার বছরের বেশি বয়স্ক হওয়ায় বাঘটি তার শক্তি হারিয়েছে। ফলে এখনই শংকামুক্ত বলা যাচ্ছে না। এই তিনটি বিষয়কে বিবেচনায় রেখে ১০ দিনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এরপর কোর্স বদলাবে।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের প্রফেসর ড. হাদী নূর আলী খান বলেন, উন্নত চিকিৎসা প্রদানের জন্য আমরা মঙ্গলবার খুলনায় পৌঁছাই। ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘটি ২-৩ দিন কিছুই খায়নি। এমনকি পানি পান না করায় পনিশুন্যতা দেখা দিয়েছে। তবে গত দুই দিন পানি পান করেছে। সামান্য মাংও খেয়েছে। মাংসের সঙ্গে মেডিসিন মিশিয়ে অল্প অল্প দেওয়া হচ্ছে। তার কাছে গেলে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে আর্বিভূত হচ্ছে। বিকট শব্দে গর্জন করেছে। আমরা বাঘের আসল ভয়ংকর মূর্তি দেখতে পেয়েছি।

তিনি বলেন, এটি চিড়িয়াখানার বাঘ না, তাই মানুষ দেখলেই অস্বাভাবিক আচরণ করছে। বাঘটিকে কোলাহরের বাইরে রেখে চিকিৎস্যা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে জনসমাগম, কোনও প্রকার ভিডিও ও ছবি তোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হতে দুই সপ্তাহ বা দুই মাসও লাগতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদ বিভাগের প্রফেসর ড. মো. গোলাম হায়দার, ঢাকার কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগার (সিডিআইএল) প্রিন্সিপাল সাইন্টিফিক অফিসার ড. মো. গোলাম আযম চৌধুরী প্রমুখ।