‘সাইদা খানম’ হয়ে ওঠার রোডম্যাপ

শিল্পের অন্যান্য শাখার চর্চা আর আলোকচিত্র শিল্পচর্চার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। সাহিত্য, সংগীত বা চিত্রাঙ্কনের সঙ্গে আলোকচিত্রের পার্থক্য হলো, অন্যান্য শিল্পমাধ্যম গৃহকোণে চর্চা করা গেলেও আলোকচিত্রে তা সম্ভব নয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। আলোকচিত্রশিল্পীর শিল্পভাবনা ও দক্ষতা আলোকচিত্রকে শিল্পরূপ দেয় বটে কিন্তু পছন্দনীয় বিষয় বা বস্তুকে পছন্দসই স্থানে স্থাপন করে তাকে ফ্রেমবদ্ধ করলে তার অকৃত্রিমতা থাকে না। যে বিষয় যেখানে থাকার কথা আলোকচিত্রশিল্পী যদি শিল্পরূপ যোগ করে সেখানেই ফ্রেমবন্দী করতে পারেন তবেই আলোকচিত্রটি শিল্পে পরিণত হয়। একটি আলোকচিত্র আর কোন কোন বিষয়ে উত্তীর্ণ হলে শিল্পরূপ পায় তা নিয়ে নিশ্চয়ই বিশদ আলোচনা করা যায়। কিন্তু আমাদের আজকের উদ্দেশ্য সেটি নয়। উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি, অধিকাংশ আলোকচিত্রীকেই ক্যামেরা নিয়ে মাঠে-ঘাটে-পর্বতে, যেখানেই বিষয়বস্তু অবস্থান করে তাকে সেখানেই যেতে হয়। যেকোনো মানুষের জন্য এটি যথেষ্ট কষ্টসাধ্য কাজ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর জন্য এটি আরও বেশি কঠিন এজন্য যে, সমাজ নারীর পায়ে এমন অসংখ্য অদৃশ্য শেকল বেঁধে দেয় যা পুরুষদের মোকাবেলা করতে হয় না। সেই বাধার পাহাড় কেটে পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে নারীদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন সাইদা খানম। আলোকচিত্রী, গবেষক, লেখক সাহাদাত পারভেজ তার ‘একজন সাইদা খানম’ বইয়ে এই পথিকৃৎ আলোকচিত্রীর জীবনে আলো ফেলে দেখতে চেয়েছেন (এবং দেখাতে চেয়েছেন) একজন সাইদা খানম কীভাবে তৈরি হন। পরিবারের অনেক সদস্যের নিরব সমর্থন এবং সে সময়ে কিছু আলোকিত মানুষকে সাইদা খানম অনুপ্রেরণা হিসেবে পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু যে ত্যাগ ও সাধনার কঠোর পথ তিনি বেছে নিয়েছিলেন, তা-ই তাকে এ অঞ্চলের নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ, একজন ‘সাইদা খানম’ করে তুলেছিল। এই হয়ে ওঠাকে ডিকোড করার জন্য তার জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় জানার বিকল্প নেই।

ছোটবেলা থেকেই নানা রকম অসুখে ভুগতেন বলে তার শিক্ষাজীবন তেমন মসৃণ নয়। প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিক, আই এ পাস করলেন। বি এ পাসও প্রাইভেটেই করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে করলেন মাস্টার্স। পরে তার ইচ্ছা হয়েছিল লাইব্রেরি সায়েন্সে পড়বেন। সে বিষয়েও করেছিলেন আরেকটি স্নাতকোত্তর। শারীরিক অসুস্থতা সরল শিক্ষাজীবন পেতে তার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বটে কিন্তু সে বাধার কাছে তিনি হার মানেননি। সাইদা খানমের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে আমরা এই ‘হার না মানা’র চারিত্রিক প্রবণতার উপস্থিতি দেখতে পাই।

সাইদা খানমের নানা ছিলেন এক কৃতি পুরুষ, খান বাহাদুর সোলায়মান সিদ্দিক। নানীর মৃত্যুর পরে তার মা ছোট ছোট ভাইবোনদের দেখভালের জন্য নানা বাড়িতে থেকে যান। সাইদা খানমরা (সাইদা খানম ও তার ভাইবোন) বেড়ে উঠতে থাকেন খালাদের সঙ্গে। নানা একই সঙ্গে সংস্কার মেনে চলা মুসলিম অভিজাত পুরুষ আবার শিল্পসাহিত্যের সমঝদার সহৃদয়বান ব্যক্তি। একদিকে তিনি যেমন প্রায় পুতুল খেলার বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন আবার তিনিই সাইদার ‘কবি খালা’র সাহিত্যানুরাগ দেখে সব বিষয়ে স্বাধীনতা দিতেও কসুর করেননি। তারই বদৌলতে বাড়িতে ঢাকা-কলকাতার সমস্ত নামীদামী পত্রিকা বাড়িতে আসত। সে সব পত্রিকায় কবি খালার খেলা নিয়মিত ছাপা হতো। বোঝা যায়, পর্দার ব্যাপারে খান বাহাদুর সাহেবের পক্ষপাত থাকলেও বাড়ির মেয়েদের সাহিত্যচর্চা বা জ্ঞানচর্চার ব্যাপারে তার মনোভাব ইতিবাচক-ই ছিল।

এই পত্রপত্রিকার সুবাদে ঢাকা বা কলকাতার মতো কেন্দ্র থেকে দূরে, পাবনায় বাস করলেও, বাইরের জগতটা সম্পর্কে জানতে, দেখতে, বুঝতে পারতেন সাইদা খানমরা। তার মা বই পড়তে ও থিয়েটার দেখতে ভালোবাসতেন। কবি খালা বাড়িতে ক্যামেরা এনে পরিবারের সদস্যদের ছবি তোলাতে পছন্দ করতেন। সাইদা প্রথম ক্যামেরা পেয়েছিলেন বোনের বান্ধবীর কাছ থেকে। ছবি তোলাকে জীবনের ব্রত হিসেবে নেবেন সেটি নির্ধারিত হয়েছিল একটি ঘটনায়। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে দেখলেন লাইফ পত্রিকার আয়োজনে ‘লাইফ’ শিরোনামে আলোকচিত্র প্রদর্শনী হচ্ছে। সেখানে দেখা পুরোনো বন্ধু প্রবাল বসুর সঙ্গে। অপূর্ব সব আলোকচিত্র দেখতে দেখতে সাইদা খানমের মনে হয়েছিল আলোকচিত্র, চিত্রকলার মতোই একটি বর্ণাঢ্য শিল্প। বন্ধু প্রবাল সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘ফটোগ্রাফি কখনো আর্ট হতে পারে না।’ সাইদা খানম সেদিন বলেছিলেন, ‘ফটোগ্রাফি যে আর্ট, একদিন আমি তা প্রমাণ করে দেব।’ তা জীবদ্দশায় প্রমাণ করেছেনও, নিজের তোলা অপূর্ব সব আলোকচিত্র দ্বারা।

সাইদা খানম একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তা ফলবান করে ছাড়তেন। গিরিডিতে পরিচয় হয়েছিল সুষমাদির সঙ্গে। তিনি তাকে পড়তে দিয়েছিলেন একশর বেশি মহামানবের জীবনী গ্রন্থ। সে সব বই পড়ে তিনি ভাবতেন, লেখক হবেন। লেখকও হয়েছিলেন তিনি। আলোকচিত্রী হিসেবে খ্যাতি লাভ করলেও তিনি ছিলেন বেগম পত্রিকার প্রথম দিকের নিয়মিত লেখকদের একজন। খুব ভালো স্কেচ করতেন। শিখেছিলেন ধনুক ছোঁড়া, বন্দুক চালানো, হাসপাতালে রোগীর জন্য বেড তৈরি। তার এই নিরন্তর শিখতে চাওয়া মন তাকে দিয়ে করিয়েছে নতুন নতুন দিকের উন্মোচন।

একটি ঘটনা দিয়ে এই লেখা শেষ করতে চাই। একবার সাইদা খানম ভাবলেন, এবার কলকাতায় গেলে (তখন তিনি নিয়মিত বেগমের জন্য ছবি তুলছেন, লিখছেন, চিত্রালী পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধিও) সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা করে আসবেন, তার ছবি তুলবেন। সে কথা জানিয়েছিলেন চিত্রালী পত্রিকার সম্পাদককেও, যেন তাকে একটু ব্রিফ করেন। শুনে সম্পাদক একটু হেসেছিলেন। কথা আর এগোয়নি। এতক্ষণে পাঠক নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন, কোনো একটি বিষয় সাইদা খানম মনস্থ করলে সে বিষয়ে কোনো বাধার মুখেই হাল ছেড়ে দেওয়ার মানুষ তিনি ছিলেন না। সম্পাদকের কাছ থেকে কোনো উৎসাহ না পেলেও কলকাতা গিয়ে সাইদা খানম সত্যজিতের বাসায় ফোন করে অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়েছিলেন। প্রথমে কুণ্ঠা থাকলেও সত্যজিতের প্রশ্রয়েই সাইদা খানম সদ্য শ্যুট করা কাঞ্চনজঙ্ঘা নিয়ে প্রশ্ন করেন আর ছবি তোলেন। সেই এক সাক্ষাতেই সত্যজিৎ ও বিজয়া মুগ্ধ। বিজয়া বলেছিলেন, ‘এবার থেকে তোমার আর অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে আসতে হবে না।’ সত্যজিতের সেটে যে কয়জন আলোকচিত্রীর অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল সাইদা খানম তাদের একজন।

সাইদা খানমের কীর্তি বহুমুখী ও গভীর। আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছিলেন কিশোরী বয়সেই। গল্প প্রকাশও সেই বয়সেই। কাজ অনেক, সেই তুলনায় প্রকাশ অনেক কম। মাত্র ছয়টি একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, বইয়ের সংখ্যাও তদরূপ। একটি গল্পগ্রন্থ, একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ, সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতি ও আলোকচিত্র নিয়ে একটি গ্রন্থ। এছাড়া রয়েছে তিনটি উপন্যাস নিয়ে আরেকটি বই। আর সম্পাদনা করেছেন একটি যুদ্ধবিরোধী প্রবন্ধের সংকলন। অগ্রন্থিত রয়েছে দুইটি উপন্যাস। তার অসংখ্য ছবি যেমন পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও প্রদর্শনীর আলো দেখেনি তেমনি তার নেওয়া অসংখ্য সাক্ষাৎকারও গ্রন্থভূক্ত হয়নি। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে পারত দুই বাংলার গল্প সংকলন। ওপার বাংলার বাঘা বাঘা সাহিত্যিকরা সে অনুমতি দিলেও এপার বাংলার বেশ কিছু খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের বিরোধীতায় সেটি আর হয়ে ওঠেনি। বোঝা যায়, জীবনের শেষদিনটি পর্যন্ত তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। নারীদের জন্য ঘরের ভেতরে বা বাইরে- পরিস্থিতি খুব কি বদলেছে? বদলায়নি বলেই সাইদা খানমের জীবনীগ্রন্থ আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ তিনি তো অনুপ্রেরণার দীপশিখা। আর তার বর্ণাঢ্য, হার না মানা জীবনটিকে ভাস্কর্যের মতো খোদাই করে আমাদের সামনে মূর্ত করে তোলার জন্য লেখক সাহাদাত পারভেজ পাবেন টুপি খোলা সম্ভাষণ। তিনি ‘একজন সাইদা খানম’ বইটিতে তুলে ধরেছেন ‘সাইদা খানম’ হয়ে ওঠার রোডম্যাপ। যা অনুসরণ করলে আমরা পাব আরও অগণিত সাইদা খানম, যারা আমাদের জাতিকে মুক্ত করবেন অন্ধকার থেকে, চিরকালের জন্য।