বিপিএলে বিশ্বকাপগামীদের বেহাল দশা

এক মাস আগেও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলবে কি খেলবে না, খেললে কোথায় খেলা হবে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো জানা নেই বিশ্বকাপের দলে থাকা ক্রিকেটারদেরও। এমন পরিস্থিতিতে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে তাদের সমস্যায় পড়াটা অমূলক নয়। মেহেদী হাসান মিরাজ যতই বলুন মঙ্গল গ্রহে গিয়ে হলেও খেলতে হবে, আসল কথাটা বলেই দিয়েছেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধু নাজমুল হোসেন শান্ত। বাইরের এসব অস্থিরতায় ক্রিকেটারদেরও সমস্যা হয়, তারা ভালো থাকার অভিনয় করেন। এই দুজনই এই মুহূর্তে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলের বাইরে। তাদের কারও অভিনয় করার বা মঙ্গল গ্রহে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। তবে যারা বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন, তাদের বিশেষ করে ব্যাটসম্যানদের বিপিএলে এমন দুর্দশা চলছে যে তাদের ব্যাটিংকে ব্যাটিংয়ের অভিনয় হিসেবেও চালিয়ে দেওয়া যায়!

 

২০টা ম্যাচ শেষ হয়েছে বিপিএলের, একমাসের যাত্রার অর্ধেকটা শেষ। অনেকটাই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে শেষ চারের সমীকরণ। একদিকে আরব আমিরাতের ইন্টারন্যাশনাল লিগ টি-টোয়েন্টি শেষ হওয়াতে মইন আলি, রহমানউল্লাহ গুরবাজের মতো তারকা ক্রিকেটারদের পেয়েছে বিপিএল, অন্যদিকে পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা টি-টোয়েন্টি সিরিজের কারণে বেশ কয়েকজন চলেও গেছেন। তড়িঘড়ির আয়োজন আর একই সময়ে চলতে থাকা একাধিক লিগের কারণে বিপিএলের তারকাদ্যুতি কম। মূলত পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়া কিংবা বুড়িয়ে যাওয়া ক্রিকেটারদের সঙ্গে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয়-তৃতীয় বিভাগে খেলা ক্রিকেটারদের নিয়েই চলে বিপিএল। এদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েও রান করতে পারছেন না বাংলাদেশের বিশ্বকাপগামী ব্যাটসম্যানরা, যারা গত বছর দুয়েক ধরে টানা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলেছেন এবং ছিলেন বিদেশি ও দেশি বিশেষজ্ঞ কোচদের তত্ত্বাবধানে। বিশ্বকাপে খেলে যদি প্রথম রাউন্ডটা পার করতে হয়, তাহলে জোফ্রা আর্চার, স্যাম কারান, লুক উড কিংবা শামার জোসেফ, জেডন সিলসের গতি সামলাতে হবে। ভেদ করতে হবে আদিল রশিদ, আকিল হোসেনদের ঘূর্ণি বলের রহস্য। বিপিএলে বিশ্বকাপ দলে থাকা ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্স ভরসা জোগাচ্ছে কমই।

 

উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান তানজিদ হাসান তামিম। ২০২৫ সালে ৪১টা ছক্কা মেরেছেন টি-টোয়েন্টিতে, তবে এবারের বিপিএলে ৬ ইনিংসে তার ব্যাট থেকে এসেছে মাত্র দুটো ছক্কা। রাজশাহী ওয়ারিয়র্স নিলামের বাইরে সরাসরি চুক্তিতে দলে নিয়েছিল তানজিদ তামিমকে। তাদের ব্যাটিং পরিকল্পনার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিলেন এই বামহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। তবে ৬ ইনিংসে মাত্র ৮৭ রান আর সর্বোচ্চ ২৯, এই পরিসংখ্যান নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট করতে পারছে না কোচ হান্নান সরকারকে। ইনিংসের সূচনায় তামিমের ব্যাটিং সঙ্গী সাইফ হাসানের ব্যাটেও মরচে ধরেছে। লম্বা সময় পর টি-টোয়েন্টি দলে ঢুকে মাস ছয়েকের ভেতর বিশ্বকাপ দলে জায়গা তো করে নিয়েছেনই, হয়েছেন সহ-অধিনায়কও। ঢাকা ক্যাপিটালসের হয়ে খেলা সাইফের অবস্থা আরও করুণ, ৫ ম্যাচে রান করেছেন ৪৮। এই মোট রানের পর আসলে গড় কিংবা স্ট্রাইক-রেট খোঁজাও অর্থহীন। সাইফ প্রথম ৩ ম্যাচে দুই অঙ্কের ঘরেও যেতে পারেননি। সবশেষ দুই ইনিংসে ১৫ এবং ২২ রান করেছেন। সবশেষ ম্যাচে ব্যাট করতে নামার আগে প্যাড পরে থাকা অবস্থায় সাইফ হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন দুর্নীতি দমন বিভাগের কর্মকর্তারা, তাতে করে মানসিকভাবে খানিকটা বিপর্যস্ত এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। তবে আগের ম্যাচগুলোতে তো অমন কিছু হয়নি, সেসব ম্যাচে অল্প রানেই আউট হওয়ার ব্যাখ্যা কি দেবেন সাইফ?

 

ওয়ান-ডাউনে নামবেন লিটন দাস। রংপুর রাইডার্সে খেলছেন বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক, তবে ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্র্তৃপক্ষ তাকে অধিনায়ক হিসেবে ঠিক ভরসা করেনি। তারা ভরসা রেখেছে ‘ঘরের ছেলে’ নুরুল হাসান সোহানের ওপর। বিপিএলে লিটনের পারফরম্যান্স এখন পর্যন্ত ঠিকঠাক, খুব ভালো কিছুও নয় আবার একেবারে মন্দও নয়। ৬ ম্যাচে ১২৯ রান করেছেন, সর্বোচ্চ ইনিংস ৪৭ রানের, স্ট্রাইক-রেট প্রায় ১৩৮। লিটনের ইনিংসগুলো থেমে যাচ্ছে শুরুতেই। সবশেষ ৩ ইনিংসে রান ৬, ১০, ১৫। রংপুরে লিটন খেলছেন উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে, দ্রুতই লিটন আউট হয়ে যাচ্ছেন পাওয়ার-প্লের ভেতরেই। লিটনের ওয়ানডেতে বাজে ফর্ম এবং বাদ পড়ার কারণ নতুন বলে তার সমস্যা, টি-টোয়েন্টি দলে ওয়ানডাউনে এবং টেস্টে মিডল অর্ডারে নেমে রান করা লিটনকে নতুন বলে শুরুতেই ঠেলে দিয়ে খুব সম্ভবত তার আত্মবিশ্বাসটাই নড়িয়ে দিচ্ছেন রংপুর রাইডার্সের কোচ মিকি আর্থার।

বিশ্বকাপে পারভেজ হোসেন ইমনকে চারে ব্যাট করাতে চায় টিম ম্যানেজমেন্ট। এ রকম একটা বার্তাই নাকি দেওয়া হয়েছে সিলেট টাইটান্সকে,যে কারণে চারে ব্যাট করছেন ইমন। শুরুটা ভালোই হয়েছে ইমনের, প্রথম দুই ম্যাচেই হাফসেঞ্চুরি এরপর ৪৪ রানের  ইনিংস। খানিকটা ভাটা পরের তিন ম্যাচে, সবশেষ ম্যাচে ঢাকার বিপক্ষে ৩২ রান করে ফর্মে ফেরার ইঙ্গিত। সব মিলিয়ে ৮ ম্যাচে ২৩৬ রান, আসরের দ্বিতীয় আর বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। প্রায় ১৩২ স্ট্রাইক-রেটে ব্যাট করেছেন, ১৯টা বাউন্ডারি আর ১০টা ছক্কা মেরেছেন, সবচেয়ে বড় কথা তার রানটা স্রেফ পরিসংখ্যান নয় দলের জয় বা জয়ের সম্ভাবনা তৈরিতে অবদান রেখেছে। হাল আমলের ক্রিকেটে যে ধরনের ইনিংসকে বলা হয় ‘ইমপ্যাক্ট ইনিংস’ ইমনের বেশিরভাগ ইনিংসই সে রকম।

 

হৃদয়ভাঙার আরেক নাম তাওহীদ হৃদয়। এবারের বিপিএলের খেলোয়াড় নিলামে হৃদয়কে দলে নিতে রংপুর রাইডার্সের খরচ হয়েছে ৯২ লাখ টাকা। রংপুর যদি প্লে-অফে উঠতে না পারে তাহলে ম্যাচপ্রতি অন্তত ৯.২ লাখ টাকা করে দিতে হচ্ছে হৃদয়কে। বিনিময়ে রংপুর এখন পর্যন্ত পেয়েছে ৬ ম্যাচে ১০৬ রান। করেছেন একটা মাত্র হাফসেঞ্চুরি, তাতে অবশ্য দলের ভাগ্য খুলতে পারেননি হৃদয়, সহ্য করতে হয়েছে সুপার ওভারে হৃদয়ভাঙার বেদনা। একটা হাফসেঞ্চুরির বাইরে বিপিএলে হৃদয় বড্ড সাদামাটা। নামের পাশে রানগুলো এ রকম ১, ৬, ০। দুটো ইনিংস আছে ২০-এর আশপাশে। স্ট্রাইক-রেট ১০৯, গড় সাড়ে ১৭। এমন পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে বিশ্বকাপের আগে কেমন প্রস্তুতি হচ্ছে দলের মিডল অর্ডারের ভরসার।

জাতীয় দলে উইকেটের পেছনে লিটন থাকায় সেখানে সোহানের জায়গা নেই, অথচ রংপুর দলে উইকেট আগলান সোহান। লিটনের ব্যাটিং এবং কিপিং, দুই-ই বিশ্বকাপ প্রস্তুতির সঙ্গে অমিল রেখেই দলীয় সমন্বয় রংপুরের। ফিনিশারের ভূমিকায় সোহানের কিছুটা খ্যাতি আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, তবে মাঠে সেই প্রমাণ তিনি কমই দিতে পারেন। নোয়াখালী এক্সপ্রেসের  বিপক্ষে সবশেষ ম্যাচেও সোহান নামলেন হৃদয় আউট হওয়ার পর। ম্যাচের ১৬তম ওভারের পঞ্চম বলে। দলের রান তখন ১০৭-৫, জয়ের লক্ষ্য ১৪৯ রান। শেষ ২৫ বলে  ৪৩ রান লাগে। টি-টোয়েন্টিতে এমন পরিস্থিতিতেই ব্যাট করতে হবে ছয়ে-সাতে নামলে। সোহান ৬ বলে ৪ রান করে আউট হয়েছেন। বিপিএলে বেশ কিছু ম্যাচে তাকে নামতে হয়নি, যেসবে নেমেছেন সেসবে বেশিরভাগ সময়ে ম্যাচের ভাগ্য আগেই ওপরের দিকের ব্যাটসম্যানরা রংপুরের পক্ষে গড়ে দিয়েছেন।

যাকে দলে নিতে প্রধান নির্বাচকের সঙ্গে কথার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলেন লিটন, সেই শামীম পাটোয়ারি একবার জ্বলেই নিভে গেছেন। সিলেটের বিপক্ষে ৪৩ বলে ৮১* রানের ইনিংস খেলে দলকে জেতানোর সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন। পরের ইনিংসগুলো ৪, ১১ ও ১ রানের।

খেলাটা যখন ক্রিকেট, তখন মঙ্গল গ্রহে গেলেও রান করতেই হবে। তবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দলে থাকা ব্যাটসম্যানদের যে দশা, তাতে মনে হতে পারে রান করাটা পৃথিবীর দুরূহতম কাজ। অথচ নেপাল প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ রান করে নজর কেড়ে আচমকাই বাংলাদেশে আসা অ্যাডাম রসিংটনকে দেখে মনে হয়েছে রান করার চেয়ে সহজ কিছু নেই! অথচ রসিংটন ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের কাছাকাছিও নেই, বেশিরভাগ সময়ে খেলেছেন ইংলিশ কাউন্টির দ্বিতীয় বিভাগে। দ্যা হান্ড্রেডে অবশ্য নিয়মিত, এসএ২০’র শিরোপাও জিতেছেন প্রথম মৌসুমে, ফাইনালে করেছিলেন ৩০ বলে ৫৭ রান। এই ধরনের ক্রিকেটারদের সাফল্য আর বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতাই বলে দেয়, টি-টোয়েন্টিতে সফল হতে দরকার ভাড়াটে যোদ্ধার মানসিকতা, যেখানে বেঁচে থাকার মন্ত্রই হচ্ছে হয় মারো নয়তো মরো। উল্টোদিকে বাংলাদেশের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যানই টি-টোয়েন্টি খেলেন সরকারি চাকরিজীবীর মানসিকতায়, শেষ বয়সের নিশ্চিত পেনশনের হিসাব করে। এখানেই তৈরি হয় পার্থক্য।