কাতারের সতর্কতা

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কাতার। উপসাগরীয় এই দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলও গুরুতর অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানী দোহায় এক বক্তব্যে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেন, দুই দেশের মধ্যে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা পুরো অঞ্চলের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সে কারণেই কাতার পরিস্থিতি শান্ত রাখার পক্ষে এবং উত্তেজনা প্রশমনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে চায় বলে তিনি জানান।

এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। গত বছরের জুনে ইরানের পরমাণু প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর পাল্টা জবাবে কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল ইরান। কাতারের ভূখণ্ডে এটিই ছিল কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি হামলার ঘটনা। সে সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে কাতার, যা এখনো কার্যকর রয়েছে।

বর্তমানে ইরানে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে। দিন যত যাচ্ছে, আন্দোলনের তীব্রতাও বাড়ছে। মূলত দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট থেকেই এই বিক্ষোভের সূচনা হয়েছে। বছরের পর বছর অবমূল্যায়নের কারণে ইরানি রিয়াল এখন বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রাগুলোর একটি। সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়াল পাওয়া যাচ্ছে।

জাতীয় মুদ্রার এই চরম দুরবস্থার প্রভাবে ইরানে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটের ডাক দেন। সেই কর্মসূচি থেকেই আন্দোলনের সূচনা হয়।

অল্প সময়ের মধ্যেই এই বিক্ষোভ ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের তীব্রতায় অনেক এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ সীমিত করেছে এবং পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে এ পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার মানুষের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে।

এই আন্দোলনের শুরু থেকেই ইরানের বিক্ষোভকারীদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সর্বশেষ তিনি ইরানি জনগণকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে শিগগিরই মার্কিন সহায়তার ইঙ্গিত দেন।

অন্যদিকে তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে সামরিক হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা জবাব দেবে ইরানের সেনাবাহিনী। এই পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যেই কাতারসহ আঞ্চলিক দেশগুলো উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানাচ্ছে।