বুলবুল চৌধুরী অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ। তার আদরের ধরন-ধারণও অদ্ভুত। আমি তার স্নেহ, সান্নিধ্য পেয়েছি। আমাকে তিনি লাই দিতেন। আদর করে আমাকে তিনি বলতেন, আপনে তো মিয়া আউরা। তার কাছে আউরা মানে পাগলা। মাঝে মাঝেই বুলবুল চৌধুরীর বাসায় চলে যেতাম। কত দুপুরে তার বাসায় যে খেয়েছি। বিকেলে নাশতা করেছি। এ রকম এক দুপুরে তার বাসায় খাওয়া-দাওয়া করে বিকেলের দিকে বেরিয়েছি। সূত্রাপুরের পূর্ণচন্দ্র ব্যানার্জি লেনে বুলবুল ভায়ের পৈতৃক বাড়ি। লঞ্চের মতন লম্বা দেড়তলা টানা বারান্দার এক বাড়ি। বাড়ির নিচতলায় তার ছোট দুই ভাই বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকেন। বাড়ির দরোজা দিয়ে ঢুকতেই কলতলা। দরোজার বাইরে সরু গলি। গলি থেকে বেরিয়ে শিংটোলার কাছাকাছি আসতেই দোকানপাট, মানুষজনের ভিড়ের ভেতর থেকে কে যেন তাকে ডাকে,
ভাই আমি এইখানে। আহেন আহেন শুনে বুলবুল ভাই দাঁড়িয়ে গেলেন। রিকশাওয়ালা গলির কোনার এক চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। কালো হ্যাংলা টাইপের। বয়স আন্দাজ করা যায় না। তবে ষাটের কাছাকাছি হবে চাইকি তারও বেশি হতে পারে। চেহারায় ভক্তি আর আনুগত্যের ছাপ লেগে রয়েছে।
বুলবুল ভাই মহল্লা থেকে বেরিয়ে শহরে এলে এই রিকশা করে আসেন। শহর মানে পুরানা পল্টন ধ্রুব এষের আস্তানা। রিকশাওয়ালার কাছে শহর মানে পুরানা পল্টন। অনেক বছর ধরে এই রিকশাওয়ালা তাকে বহন করে নিয়ে যায়, নিয়ে আসে। ধ্রুবর বাসায় গিয়ে হয়তো বুলবুল ভাই ঘণ্টার পর বসে থাকে। ততক্ষণ রিকশাওয়ালা আশপাশে ক্ষেপ মারে না হয় নিচে বসে থাকে। অনেক বছর ধরে এটা চলে আসছে। রিকশাওয়ালা প্রতিদিন সকালে একবার বাসায় এসে হাজিরা দিয়ে জানান দিয়ে যায়, আইজকা কি শহরে যাইবেন? আমি ধারেকাছেই আছি।
মাঝে মাঝে রিকশাওয়ালা দুপুরে বুলবুল ভাইয়ের বাসায় এসে বারান্দায় বসে থাকে। তামাক বানানোর কাজে সাহায্য করে। কাটাকাটির কাজ করে। দুপুর হয়ে গেলে খাওয়া-দাওয়াও করে। নাসরিন ভাবি কিছু বলেন না। তিনি জানেন, তার পাগল স্বামীর কাছে অনেক পাগল আসেন। ছোট, বড়, মাঝারি সব কিছিমের পাগল দেখতে দেখতে তিনি ধাতস্থ হয়ে গেছেন। এখন পাগল দেখলে তিনি আর কিছু বলেন না। বাড়িতে নতুন পাগলের আমদানি হলে বুলবুল ভাই খুব বড় গলায় স্ত্রীর কাছে তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, নাসরিন, এর নাম হাশেম, এর নাম রসুল, এর নাম জামাল এরা ভারী লক্ষ্মী ছেলে।
বুলবুল ভায়ের এমনতর পরিচয়ে তার স্ত্রী ভেতরে ভেতরে হেসে গড়িয়ে পড়লেও তা প্রকাশ করেন না। তিনি শুধু স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি বুঝতে পারেন না কে ভারি লক্ষ্মী ছেলে আর কে ভারি পাগল।
২.
রিকশায় উঠে বুলবুল ভাই সহজাত ভঙ্গিতে পা তুলে বসলেন। ঢাকা শহরে খুব কম মানুষকে আমি তার মতো করে শরীরে শাল জড়াতে দেখেছি। বুলবুল ভাই এমন কায়দা করে শাল গায়ে জড়াতেন যে, তখন শালটাকে আর শাল বলে মনে হতো না মনে হতো তিনি বুঝি শালটাকে জাদু দিয়ে মাফলারের চেয়েও আরামপ্রদ করে তুলেছেন। তিনি পৃথিবীর সেরা জাদুকরের মতো গায়ে শাল জড়িয়ে রাখার কায়দা জানতেন।
রিকশা নারিন্দা খ্রিস্টান কবরস্থানের কাছাকাছি এলে আমি দুষ্টুমি করে বললাম, কই যাইতাছি আমরা
পাগলের লারো লন
বুলবুল ভাই গাজীপুর কালীগঞ্জের মানুষ। সেখানকার আঞ্চলিক শব্দ লারো মানে কাছে।
বুলবুল ভাই কী বলে! ধ্রুব এষের বাড়ি যাচ্ছি আর তাকেই কিনা উনি বলছেন পাগল। আমি তার কথায় হতবাক হয়ে বলি,
ধ্রুব এষও পাগল!
আড্ডায় বুলবুল চৌধুরী কথা কম বলেন, তবে মাঝে মাঝে টুকটাক যা বলেন তা অনেক কথার চেয়েও ওজনদার আর রসে ভরপুর থাকে। তিনি খুব একটা হাসেন না। তার হাসিটা মøান ধরনের। তিনি যখন মুখের কোনায় সে রকম হাসি মেলে ধরেন তখন তা যেন গোধূলির আলোর মতো রক্তিম হয়ে লেগে থাকে।
আমার কথা শুনে বুলবুল চৌধুরী মিটিমিটি করে খুব মøান লয়ে হেসে দিলেন। আজ তার মøান হাসিটা সচরাচরের মতো না একটু বেশি মাত্রার উচ্চ লয়ের। তাকে দেখে মনে হলো, হাসিটা দিয়ে তিনি বেশ আনন্দ পেয়েছেন। বুলবুল ভায়ের দু’গালের পাশ দিয়ে স্বর্ণলতার মতো দোল খাচ্ছে পাটের হলদে আশের মতো চুল। তার মুখের কোনায় লেগে থাকা হাসিটা বাচ্চা শিশুর মতো খেলা করছে। তিনি বললেন,
ধ্রুব তো পাগলই পাগল না হইলে হেরে আমি এত পাই কেমনে!
৩.
রিকশা গোলাপ শাহ মাজারের কাছে এসে সিগন্যালে আটকে আছে। মাজারের চারপাশে নানা পদের মানুষ। বুলবুল ভাই মাজারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
এখানে রাইতের বেলা আইছেন নি?
আমি কিছু বলছি না দেখে তিনি বললেন,
না আইলে আইসেন। আইলে দেখবেন পাগলের কত জাত
পাগলের কত জাত পাইলেন
আমার কথা শুনে তিনি আবারও হাসলেন।
বুলবুল ভায়ের হাসি দেখে রিকশাওয়ালা পেছন ফিরে আমাকে বলল,
ভাইরে তো আমি হুজুর মানি। আমি হের আশেক
সিগন্যাল ছেড়ে দিলে রিকশাওয়ালা প্যাডেল মারা শুরু করল। রিকশা এগোচ্ছে। জিপিওর কাছাকাছি এসে রিকশাওয়ালা বলল,
জানেননি আমি আরও একজনরে হুজুর মানি
আমি বললাম,
আর কারে হুজুর মানেন?
কেন আমার হুজুর যারে মানে
আপনার হুজুর আবার কারে মানে?
রিকশাওয়ালা আমার কথায় কিছু বলল না। বুঝতে পারছি আমার কথা শুনে সে হাসছে।
রিকশা পল্টন মোড় অতিক্রম করে বিজয়নগর পানির ট্যাংকির দিকে এগোতে থাকে।
আমি আবার রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করি,
কী? কইলেন না আপনার হুজুর কারে হুজুর মানে?
আমার কথায় এতক্ষণ রিকশাওয়ালা হাসছিল। এবার সেই হাসির সাথে যোগ দিলেন বুলবুল চৌধুরী।
আমি এবার রিকশাওয়ালাকে হাল্কা ধমক দিয়ে বললাম,
আপনে কারে হুজুর মানেন?
ভাই, আমি যেই যাগো হুজুর মানি হেরা দুইজনই পাগল বলে রিকশাওয়ালা উচ্চৈঃস্বরে হাসতে থাকে।
রিকশাওয়ালাকে ওরকম হাসতে দেখে আমি বুলবুল ভাইকে বললাম,
লোকটা কি ধ্রুবর কথা বলছে!
বুলবুল ভাই নির্বিকারভাবে বললেন,
হ, তাইলে আর কার কথা কইব! ধ্রুব তো পাগলই
৪.
যে মানুষ ধ্রুব এষকে পাগল বলতে পারে সে নিজে কত বড় পাগল এই ভাবনাটা শুধু আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
রিকশা তখন বিজয়নগর পার হয়ে ধ্রুবর বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে।