বাংলাদেশের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে চলমান অচলাবস্থা কাটাতে ঢাকায় আসছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) দুই শীর্ষ কর্মকর্তা। বিসিবি পরিচালক ইফতেখার রহমান মিঠু শুক্রবার জানিয়েছেন, আইসিসি প্রতিনিধিরা শনিবার ঢাকায় আসছেন। 'আমরা তাঁদের সঙ্গে বসে কথা বলার অপেক্ষায় আছি। আশা করছি, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে', জানিয়ে ইফতেখার বলেন, বৈঠকটি ঢাকায় শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে ইফতেখার বলেছেন, “আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। বোর্ড বলেন আর সরকার—আমরা মনে করি, আমাদের টিম, খেলোয়ার এবং সমর্থকরা নিরাপদ না সেখানে। এটা নিয়েই আলাপ হবে। এটা সভাপতি নিজেই হ্যান্ডেল করছেন। দেখি কাল কি ফল হয়। আমাকে যদি মিটিংয়ে থাকতে বলে, থাকব। নয়তো উনি (আমিনুল ইসলাম বুলবুল) যাদের নিয়ে মিটিংয়ে বসবেন, তাঁরা এ বিষয়ে আলাপ করবেন। ভালো সাইন যে, তারা (আইসিসি প্রতিনিধি দল) আসছে। দেখা যাক বিষয়টি কোথা থেকে কোথায় যায়।” বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিও অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
৭ ফেব্রুয়ারি-৮ মার্চ অনুষ্ঠেয় টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের ম্যাচ ভারতে না খেলার দাবি জানিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছেন বিসিবি। সেই অবস্থানের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আইসিসি ও বিসিবির মধ্যে আলোচনা চললেও এখনো কোনো সমাধান হয়নি। আইসিসির কর্মকর্তাদের এই সফরকে তাই শেষ মুহূর্তের সমঝোতার চেষ্টা হিসেবেই দেখছে ক্রিকেট মহল।
ক্রিকবাজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিসি বলছে- এই সফরের উদ্দেশ্য শুধু বিসিবিকে রাজি করানো নয়; বরং বাংলাদেশ যেন নিজেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে একঘরে মনে না করে, সে জন্য আস্থা বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করাও একটি লক্ষ্য। গতক বুধবার অনুষ্ঠিত এক ভিডিও কলে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম অসন্তোষ প্রকাশ করলে আলোচনা প্রায় ভেস্তে যায়। এরপর আবার বিসিবির সঙ্গে যোগাযোগ করে আইসিসি এবং সরাসরি আলোচনার সিদ্ধান্ত নেয়। এই বৈঠকে অন্তর্বর্তীকালীন মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রতিনিধিরাও থাকতে পারেন বলে জানা গেছে।
এই বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু দুটি—ভারতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা এবং মোস্তাফিজুর রহমান–সংক্রান্ত বিতর্ক। আইসিসির নিরাপত্তা মূল্যায়নে ভারতে ঝুঁকির মাত্রা ‘মাঝারি থেকে কম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ক্ষেত্রে নতুন বা অস্বাভাবিক নয়। বরং বাংলাদেশে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, ‘মাঝারি থেকে উচ্চ’—এমন মূল্যায়নই উঠে এসেছে আইসিসির প্রতিবেদনে।
আইসিসির প্রতিনিধিরা বিসিবিকে বোঝাতে চান, বৈশ্বিক ক্রিকেট ব্যবস্থায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে একই সঙ্গে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বাকি ১৯টি দেশের স্বার্থ ও উদ্বেগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আয়োজক সংস্থা হিসেবে আইসিসির দায়িত্ব সব দেশের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া।
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম মূলত নিরাপত্তা প্রতিবেদনের একটি অংশ নিয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছেন। সেখানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার একটি কাল্পনিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে মোস্তাফিজুর রহমানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বৈঠকে বিজেপি ও শিবসেনার কয়েকজন নেতার মন্তব্যের প্রসঙ্গও তোলা হয়। তবে আইসিসি ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) স্পষ্ট করেছে—হুমকির মাত্রা বাড়লে নিরাপত্তাও ততটাই জোরদার করা হবে।
বিসিবির এক পরিচালক বারবার আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানের নিরাপত্তাজনিত ইস্যু এবং আইসিসির নিরাপত্তা প্রতিবেদনের কথা তুলে ধরেছেন। বিসিবির দাবি, তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা মূল্যায়নেও খেলোয়াড়দের জন্য ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। তবে বিসিবি এখনো সেই প্রতিবেদন আইসিসি বা বিসিসিআইয়ের সঙ্গে শেয়ার করেনি।
অন্যদিকে আইসিসি পক্ষের যুক্তি, অনুমানভিত্তিক আশঙ্কা কোনো টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ হতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেছে, প্যারিসে ফিলিস্তিনপন্থী সমাবেশ হলেই ফ্রান্সে ক্রীড়া আয়োজন অনিরাপদ হয়ে যায় না।
ভিডিও কলে আইসিসির পক্ষে ছিলেন সংস্থাটির লিগ্যাল প্রধান, নিরাপত্তা প্রধান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। বিসিবির পক্ষে অংশ নেন সভাপতি আমিনুল ইসলাম, সহসভাপতি এমডি শাকাওয়াত হোসেন ও ফারুক আহমেদ, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন এবং সিইও নিজাম উদ্দিন চৌধুরী।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশ গ্রুপ পর্বে নিজেদের চার ম্যাচের তিনটি খেলবে কলকাতায়—৭, ৯ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইতালি ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। শেষ ম্যাচটি খেলতে দল যাবে মুম্বাইয়ে, যেখানে প্রতিপক্ষ নেপাল।