রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

বাংলাদেশের অর্থনীতি যেন পাহাড়ের কিনারায় থেমে যাওয়া গাড়ির ইঞ্জিন। শব্দ করছে, অতিরিক্ত গরম হচ্ছে, কিন্তু সামনে এগোনোর লক্ষণ ক্ষীণ। আরও উদ্বেগজনক হলো, চালকের আসনে বসে থাকা কেউ যেন বুঝতেই পারছে না, কোন লিভার টানতে হবে। এটি কোনো পক্ষপাতমূলক কটাক্ষ নয়, বরং একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। অর্থনীতিবিদ, থিঙ্কট্যাঙ্কের কথা শোনা বা চকচকে প্রতিবেদন পড়ার তেমন দরকার নেই। একটি রান্নাঘরে ঢুকলে, কোনো কারখানার গেটে দাঁড়ালে, কিংবা ভিড়ঠাসা বাসে উঠলে বাস্তবতা টের পাওয়া যায়। অন্তর্র্বর্তী সরকার এমন এক অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে, যা শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দীর্ঘ বছরগুলোতে লুণ্ঠন, পুঁজি পাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ফলে ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে গেছে। তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যে বিষয়টি সমানভাবে অস্বস্তিকর, তা হলো এই অর্থনীতি প্রায় সেখানেই পড়ে আছে, যেখানে ফেলে যাওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক পরিবর্তন দ্রুত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় রূপ নেবে বলে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ পায়নি। এমনকি তার ধারে কাছেও হয়নি।

১৯৮৯-এর পর পূর্ব ইউরোপ, সুহার্তোর পতনের পর ইন্দোনেশিয়া, বেন আলির পর তিউনিসিয়া সবক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ভাঙন এমন এক বিভ্রম তৈরি করেছিল যে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার যেন আপনাআপনিই চলে আসবে। বাংলাদেশের অন্তর্র্বর্তী শাসকরাও সম্ভবত তাই ভেবেছিলেন। তারা ধরে নিয়েছিলেন, সদিচ্ছাই নীতির বিকল্প হতে পারে। আর নৈতিক বৈধতাই পুঁজি টানার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তবতা তা প্রমাণ করছে না। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ এবং ধনী দাতা রাষ্ট্রগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আশ্বাস দিয়েছিল। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বিপুল ব্যয় করে ২০২৫ সালের বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করে, ৫০টি দেশের বিনিয়োগকারী উড়িয়ে এনে ঘোষণা দেয় ৩২০ মিলিয়ন ডলারের তাৎক্ষণিক অঙ্গীকার এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা বড় হতাশাজনক, সেই অর্থ আর আসেনি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সম্প্রতি বলেছে, অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বিনিয়োগ ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। দেশটি মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে পড়ার বাস্তব ঝুঁকিতে। নিম্ন মজুরির অর্থনীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য খুব ব্যয়বহুল, আবার উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ টানার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব দুর্বল। এটি কোনো মতাদর্শিক বক্তব্য নয়; এটি নিখাদ অংক। তবে পরিসংখ্যান শুধু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকেই নিশ্চিত করে। পণ্যের দাম বাড়ছে, আয় কমছে, আর চাকরি উধাও হচ্ছে। শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চালু আছে, সেগুলো উৎপাদন কমাচ্ছে।

আওয়ামী লীগ আমলের কুখ্যাত সুবিধাভোগীরা হয়তো নেই, কিন্তু বাজার এখনো মৃতপ্রায়। পুঁজি উৎপাদনমুখী খাতে ঘুরে যায়নি। তাহলে টাকা যাচ্ছে কোথায়? কেউই যেন বলতে পারছে না। যে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা কি এসেছে? যদি এসে থাকে তবে তা দৃশ্যমান নয়। যদিও প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু তা সরকারের দক্ষতায় নয়। বেড়েছে কারণ লাখো প্রবাসী প্রমিক বাধ্যবাধকতা থেকে টাকা পাঠাচ্ছেন। সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আঠারো মাস কোনো ছোট সময় নয়, বিশেষ করে একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য, যেখানে বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য দরকার দৃঢ় পরিকল্পনা, বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার এবং দ্রুত বাস্তবায়ন। এর বদলে আমরা দেখেছি দোদুল্যমানতা। অন্তর্র্বর্তী সরকার মৌলিক সূচকগুলোও স্থিতিশীল করতে প্রায় ব্যর্থ হয়েছে, ভবিষ্যতের পথনকশা আঁকতে পারছেন না।  অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনো কারিগরি বিলাসিতা নয়। এটি সামাজিক শৃঙ্খলার ভিত্তি।

জীবিকা ভেঙে পড়লে ক্ষোভ জমে, অপরাধ বাড়ে, চরমপন্থা অক্সিজেন পায়। এই দৃশ্যপট আমরা আগেও দেখেছি। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পতনের আগে ছিল অর্থনৈতিক ধস। ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার শিকড়ও অর্থনৈতিক শ্বাসরোধে, শুধু রাজনৈতিক দমন-পীড়নে নয়। দুই ক্ষেত্রেই সার্বভৌমত্ব শেষ পর্যন্ত নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশ এ থেকে মুক্ত নয়। বাস্তবিক অর্থে, তারা ইতোমধ্যে এই কাহিনীর একটি সংস্করণকে প্রত্যক্ষ করেছে। শেখ হাসিনার পতন শুধু গণতন্ত্রের দাবিতে হয়নি। এটি ঘটেছিল দুর্নীতিতে জর্জরিত এক অর্থনীতির কারণে, যেখানে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও  বৈষম্য জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছিল। অর্থনীতি ব্যর্থ হলে রাজনীতিও ভেঙে পড়ে এবং তা ঘটে সহিংসভাবে। অন্তর্র্বতী সরকারের হাতে এখন খুবই অল্প সময় আছে। এ সময়ে কি অর্থনীতি উদ্ধার করা সম্ভব? কিন্তু একটি অর্থবহ কাজ এখনো করা যায় পুনরুদ্ধারের জন্য রেখে যাওয়া যায় একটি সুসংহত ও দিকনির্দেশনামূলক কাঠামো, স্পষ্ট অগ্রাধিকার তালিকা এবং বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ। বিনিয়োগকারী, নাগরিক এবং পরবর্তী সরকারের প্রতি একটি আগাম সংকেত যাতে বাংলাদেশ তার সংকটের গভীরতা বোঝে এবং সৎভাবে তা মোকাবিলা করতে পারে। এর চেয়ে ভিন্ন কিছু হলে তা শুধু অদক্ষতা নয়, তা হবে অবহেলা। আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার জনগণের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অগ্রসর হবেন। সামনেই নির্বাচন। যা করার এর আগেই করতে হবে। সমস্যা হচ্ছে, একদিকে নির্বাচনী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে অর্থনীতির লাগাম টেনে, বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা। এই মুহূর্তে বিষয়টি কতটুকু সম্ভব, তা অবশ্যই গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।  আমাদের যেন আশাহত না হতে হয়, সেভাবে বাকি দিনগুলো অগ্রসর হোক।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

ৎিরঃবসধয৭১@মসধরষ.পড়স