ক্ষুধাকে সাধারণত ব্যক্তিগত কষ্ট হিসেবে দেখা হয়। যেমন পেটের খিদে বা খাবারের অভাবজনিত ভোগান্তি। কিন্তু বাস্তবে ক্ষুধা কেবল একটি জৈবিক অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি গভীরভাবে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। কোন সমাজে কে খাবে, কতটা খাবে এবং কে না খেয়ে থাকবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ধারিত হয় ক্ষমতার কাঠামো, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। ফলে ক্ষুধাকে বোঝার অর্থ শুধু খাদ্যের প্রাচুর্য বা ঘাটতি বিচার করা নয়, বরং দারিদ্র্য কীভাবে সৃষ্টি হয় এবং সেই দারিদ্র্যের ওপর কার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, তা অনুধাবন করা। আজ বিশে^ খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা মানবসভ্যতার ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবু কোটি কোটি মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। এই বৈপরীত্য স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ক্ষুধার মূল সমস্যা খাদ্যের অভাব নয়, বরং খাদ্যে প্রবেশাধিকারের অসমতা। যার শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে দারিদ্র্য ও ক্ষমতার পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে। দারিদ্র্য কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা, যা মানুষকে শুধু আয় ও সম্পদ থেকে নয়, ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থেকেও বঞ্চিত করে। ক্ষুধা সেই বঞ্চনার সবচেয়ে নীরব অথচ নির্মম প্রকাশ। ফলে ক্ষুধাকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এটি দারিদ্র্য ও ক্ষমতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কারণ হলো এটি কোনো বিচ্ছিন্ন শারীরিক অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি গভীর সামাজিক বাস্তবতা, একটি রাজনৈতিক নির্মাণ এবং একটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফল। ইতিহাস স্পষ্টভাবে সাক্ষ্য দেয় যে, মানবসভ্যতার কোনো পর্যায়েই খাদ্যের সামগ্রিক ঘাটতি প্রধান সংকটের উৎস ছিল না। বরং সংকটের জন্ম হয়েছে খাদ্যের বণ্টনব্যবস্থা, খাদ্যে প্রবেশাধিকারের শর্ত এবং সেই প্রবেশাধিকারের ওপর কার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, এই প্রশ্নগুলোর মধ্য দিয়ে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কেবল অর্থনৈতিক ব্যর্থতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এগুলো শাসনব্যবস্থার চরিত্র, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের সরাসরি প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বৈশি^ক খাদ্য উৎপাদন বর্তমানে বিশে^র মোট জনসংখ্যার প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ শতাংশ বেশি হলেও বাস্তবতা হলো, প্রায় তেহাত্তর থেকে ছিয়াত্তর কোটি মানুষ এখনো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধা ও অপুষ্টির মধ্যে বসবাস করছে। এই বৈপরীত্য আমাদের ক্ষুধাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে বাধ্য করে। কারণ খাদ্য যখন পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদিত হয়, তখন মানুষ কেন না খেয়ে থাকে, সেই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গেলে অবধারিতভাবে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হয় দারিদ্র্য ও ক্ষমতার অসম ও বৈষম্যপূর্ণ কাঠামোর দিকে। দারিদ্র্য ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং কাঠামোগত বঞ্চনার একটি প্রকাশ। যদিও একে প্রায়ই অলসতা, অদক্ষতা কিংবা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার ফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দারিদ্র্যের গভীরে প্রোথিত সামাজিক ও রাজনৈতিক শিকড়কে আড়াল করে। বাস্তবে দারিদ্র্য একটি গভীর কাঠামোগত অবস্থা যেখানে মানুষ উৎপাদন প্রক্রিয়া, বাজারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় সেবার ভেতর থেকে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগতভাবে বাদ পড়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈশি^ক অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা ও সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সম্পদের বৈষম্যও সমানতালে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিশে^র শীর্ষ দশ শতাংশ মানুষ মোট বৈশি^ক সম্পদের অর্ধেকেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। যা অসম বণ্টনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এই বৈষম্যের ফলে দারিদ্র্য একটি ক্ষণস্থায়ী অবস্থা নয়, বরং স্থায়ী সামাজিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। ভূমির মালিকানা, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার সুযোগ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব যখন সীমিত কিছু গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। তখন ক্ষুধা সেই প্রান্তিকতার সবচেয়ে দৃশ্যমান ও নির্মম রূপ হিসেবে সামনে আসে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, ক্ষুধা বিশ্লেষণে একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, দুর্ভিক্ষ বা দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য ঘাটতি খাদ্যের অভাবের কারণে নয়, বরং খাদ্যে প্রবেশাধিকারের অভাবের কারণে ঘটে। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানুষ তখনই অনাহারে পড়ে যখন তারা আয়, সম্পদ অথবা সামাজিক অধিকার হারিয়ে ফেলে।
এর মানে, খাদ্য বাজারে উপস্থিত থাকলেও, মানুষ তা কিনতে বা অর্জন করতে সক্ষম হয় না। এই অক্ষমতার মূল জন্ম দারিদ্র্য থেকে এবং দারিদ্র্য টিকে থাকে ক্ষমতার অসম কাঠামোর ভেতরে। ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ, যেখানে খাদ্য মজুদ থাকা সত্ত্বেও লাখ লাখ মানুষ খাদ্যে প্রবেশাধিকারের অভাবের কারণে অনাহারে থাকতে বাধ্য হয়েছিল। এই বাস্তবতা রূপ বদলালেও আজও ভিন্ন চেহারায় বিদ্যমান এবং ক্ষুধার রাজনৈতিক ও সামাজিক আকারকে প্রভাবিত করছে। ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত কোনো একক শক্তি নয়। বরং এটি বাজারের ক্ষমতা, সামাজিক ক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সম্মিলিত রূপ হিসেবে বিদ্যমান। বাজারে কে দাম নির্ধারণ করবে, কারা মজুরি নির্ধারণ করবে, কারা জমির মালিক হবে এবং নীতিনির্ধারণে কারা অংশ নেবে এসব প্রশ্নের উত্তরই ক্ষুধা এবং দারিদ্র্যের ভৌগোলিক ও সামাজিক মানচিত্র নির্ধারণ করে। দরিদ্র মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে ক্রমাগত বাদ পড়ে যায়। ফলে তাদের চাহিদা, ব্যক্তিগত সংকট এবং তাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রতিফলিত হয় না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে এই বর্জনই ক্ষুধাকে দীর্ঘস্থায়ী করে এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক বৈষম্যকে শক্তিশালী করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেখা যায় যে, ক্ষমতার অসম বণ্টন শুধু আয় ও সম্পদে নয়, খাদ্য এবং পুষ্টির প্রাপ্যতাতেও গভীর প্রভাব ফেলে যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষুধা ও অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও ক্ষমতার সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। স্বাধীনতার পর দেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় চার কোটি টন চাল উৎপাদন করে, যা রাজনৈতিকভাবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবুও জাতীয় পুষ্টি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির শিকার এবং বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। বিশেষ করে কৃষিশ্রমিক, নগর বস্তিবাসী এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের মধ্যে খাদ্য অনিশ্চয়তা সবচেয়ে প্রকট। এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে, খাদ্য উৎপাদনের সাফল্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষুধা দূর করতে সক্ষম নয়। খাদ্য প্রাপ্যতা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অসমতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণই মূল কারণ, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার মানকে সীমিত করে রাখে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষমতার সম্পর্ক সবচেয়ে নগ্নভাবে প্রকাশ পায়, ভূমি ও শ্রমের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে এখনো উল্লেখযোগ্য অংশের কৃষিজমি, সীমিত কিছু পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত। যার ফলে ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষিশ্রমিকরা তাদের জীবনধারণের জন্য দৈনিক মজুরির ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই মজুরি মৌসুমভেদে পরিবর্তিত হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট নয়। ন্যূননতম মজুরি কাঠামোর দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে কৃষিশ্রমিকদের খাদ্য নিরাপত্তা স্থায়ী হয় না। ফলে ক্ষুধা এখানে সরাসরি শ্রমবাজারের ক্ষমতাহীনতার ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, যা বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য অনিশ্চয়তা এবং অসুবিধার সৃষ্টি করে। শহরাঞ্চলে দারিদ্র্য ও ক্ষুধার সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক। গ্রাম থেকে শহরে আগত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিযুক্ত থাকে, যেখানে নিয়মিত কর্মসংস্থান নেই, মজুরি স্থায়ী নয় এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রায়ই কার্যকর নয়। এই খাতে কর্মরতরা বেতনবৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তার অভাবে ক্রমাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে। খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেই এই জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন খাদ্যগ্রহণে তাৎক্ষণিক এবং মারাত্মক প্রভাব পড়ে। অথচ খাদ্য মূল্যের নিয়ন্ত্রণ বা বাজার নীতির প্রণয়নে তাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। শহরের বাজারে ক্ষমতা বড় ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকায় তারা সহজেই চাহিদা, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণ করতে পারে যা দরিদ্রদের খাদ্য প্রাপ্যতা সীমিত করে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ প্রায়ই দুর্বল হওয়ায় খাদ্যের ন্যায্য বিতরণ ব্যাহত হয়। এসব কাঠামোগত ও সামাজিক বৈষম্যের ফলেই শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী শুধু আয় ও সম্পদের অভাবে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তাদের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টির অভিগম্যতা, জীবনমান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও দীর্ঘমেয়াদি হুমকির মুখে পড়ে।
রাষ্ট্রের মূল তাত্ত্বিক দায়িত্ব হলো, পুনর্বণ্টনমূলক নীতির মাধ্যমে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা হ্রাস করা। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, রাষ্ট্র নিজেই ক্ষমতার রাজনীতির একটি অংশ হয়ে ওঠে। খাদ্য সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং ভর্তুকি প্রায়ই রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বণ্টিত হয়। দুর্নীতি এবং রেন্ট সিকিং এই প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করে তোলে। খাদ্য সংগ্রহ, মজুদ এবং বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম থাকলে, প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষুধা কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে থাকে না বরং এটি রাজনৈতিক বঞ্চনার প্রতীক হিসেবেও আবির্ভূত হয় এবং সমাজে ক্ষমতার অসম বণ্টনের প্রকট চিত্র তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ক্ষুধা এবং ক্ষমতার সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। বৈশি^ক খাদ্যবাজারে ধনী দেশগুলোর কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র দেশের কৃষকদের প্রতিযোগিতার বাইরে ঠেলে দেয়। একই সঙ্গে বহুজাতিক করপোরেশনগুলো বীজ, সার এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ফলে স্থানীয় কৃষক উৎপাদন করলেও তার লাভের বড় অংশ করপোরেট কাঠামোর ভেতরে চলে যায়। এই ধরনের বৈশি^ক ক্ষমতার অসম ভারসাম্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র্য এবং খাদ্য অনিশ্চয়তাকে দীর্ঘস্থায়ী করে রাখে, যা স্থানীয় কৃষক এবং ক্ষুদ্র কৃষিজমির মালিকদের জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং খাদ্য নিরাপত্তার জটিলতা বাড়ায়। নারী এবং শিশুর ক্ষেত্রে ক্ষুধা এবং ক্ষমতার সম্পর্ক আরও সূক্ষ্ম এবং গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। পরিবারের ভেতরে খাদ্য বণ্টনের ক্ষেত্রে নারীরা প্রায়ই সর্বশেষ প্রাধান্য পান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ক্ষমতা সীমিত থাকার কারণে খাদ্য ও পুষ্টির প্রশ্নেও তারা বঞ্চিত হন। শিশুদের পুষ্টি নির্ভর করে পরিবারের আয়, মায়ের শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতার ওপর, যা বৃহত্তর সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেখা যায় যে, পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সরাসরি খাদ্য এবং পুষ্টির নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে এবং নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য ও জীবনমানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। ক্ষুধা দূর করার অর্থ কেবল খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো নয়, এটি বোঝায় ক্ষমতার কাঠামোতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা। ভূমি সংস্কার, ন্যায্য মজুরি, শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা, কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা ছাড়া ক্ষুধা দূর করা সম্ভব নয়। ক্ষুধা মূলত এক ধরনের নীরব সহিংসতা যা কোনো ব্যক্তি চালায় না, বরং এটি একটি কাঠামোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। যতদিন অসম বণ্টন অটুট থাকবে, ততদিন ক্ষুধা দারিদ্র্যের ছায়া হয়ে সমাজে ঘুরে বেড়াবে। ক্ষুধা দূর করার লড়াই শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম, যেখানে একটাই প্রশ্ন থাকে কে খাবে এবং কে না খেয়ে থাকবে। পাশাপাশি প্রশ্ন আসবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার হাতে থাকবে শেষ পর্যন্ত?
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, চেয়ারম্যান ডিআরপি ফাউন্ডেশন
rssarker69@gmail.com