ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল হুমাইরা আক্তার মিম (১৫) । স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে বড় কিছু হওয়ার । কিন্তু গত শুক্রবার রাতে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ও পরিবারের সূত্রে জানা যায়, মিমের মা-বাবা ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত। বড় চাচা হারুন অর রশিদের বাসায় থেকে পড়াশোনা করত সে। গত শুক্রবার রাতে বড় ভাই ফেরদৌস হাসান অন্তর তাকে খেতে ডাকতে গেলে ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পান। অনেক ডাকাডাকির পর সাড়া না পেয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় দরজা ভেঙে দেখা যায়, সিলিং ফ্যানের সঙ্গে চাদর পেঁচিয়ে হুমাইরা আত্মহত্যা করেছে। গত শনিবার সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের পশ্চিম বাঁশগড়া গ্রামে তানিয়া সুলতানা নামের আরেক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের দাবি , বাবার কাছে মোবাইল ফোন চেয়ে না পাওয়ার অভিমানে আত্মহত্যা করে সে। ঠাকুরগাঁওয়ে এই দুই আত্মহত্যা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় ।
ঠাকুরগাঁও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের জিআরও শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ উপজেলায় ৩৪৮ জন আত্মহত্যা করেছে।
থানাভিত্তিক সংখ্যা আরও উদ্বেগজনক। সদর থানায় সর্বোচ্চ ৯৩ জন, পীরগঞ্জে ৮৬ জনের আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।
ঠাকুরগাঁও সৃজনের সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মফস্বল শহরগুলোয় বিনোদনের অভাব এবং ডিজিটাল আসক্তি কিশোরদের একাকী করে তুলছে। মিমের আত্মহত্যা কেবল একটি মৃত্যু নয়, এটি আমাদের পারিবারিক কাঠামোর দুর্বলতার প্রতিফলন। ছোটবেলা থেকে ‘না’ শোনার মানসিক প্রস্তুতি আমরা শিশুদের দিচ্ছি না।’
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলামের ২৮ বছর বয়সী ছেলে আত্মহত্যা করেছেন গত বছর । তার সন্তান ঋণগ্রস্ত ছিলেন বলে জানা যায়। রফিকুল বলেন, ‘ছেলে বলত, বাবা আমি পারতেছি না। আমি ভেবেছিলাম কথার কথা। এখন বুঝি, সে সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছিল।’
একটি বেসরকারি কারখানার কর্মী রিনা আক্তার (৩২) বলেন, ‘আমাদের আশপাশেও অনেক নারী আত্মহত্যা করে। সংসারের চাপ, স্বামীর নির্যাতন, নিরাপত্তাহীনতা এসব মিলিয়ে বাঁচা কঠিন হয়ে যায়।’
সামাজিক সংগঠক ও উন্নয়নকর্মী রাবেয়া সুলতানা বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ে গত ১৩ মাসে ৩৪৬টি আত্মহত্যার ঘটনা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এর পেছনে দারিদ্র্য, বিষণœতা এবং প্রচারমাধ্যমের প্রভাব থাকতে পারে। মিমের ঘটনায় দেখা গেছে, সে চাচার বাসায় থেকে পড়াশোনা করত। অনেক সময় অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে সন্তানদের মনে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। আমাদের পাড়ায় পাড়ায় এখন মেন্টাল হেলথ সাপোর্ট গ্রুপ তৈরি করা জরুরি।’
ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘পুলিশের একার পক্ষে আত্মহত্যা প্রতিরোধ সম্ভব নয়। আমাদের অভিভাবক সমাজকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব ঘুচিয়ে তাদের মনের ভেতরকার নীরব অস্থিরতাটুকু বুঝতে হবে। আমরা জেলা জুড়ে বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে ‘আত্মহত্যাবিরোধী প্রচারণা’ শুরুর পরিকল্পনা করছি।