প্রতিবন্ধীর কান্না ভাসে রাষ্ট্রসমুদ্রে

একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তার প্রকৃত মাপকাঠি নির্ধারিত হয় সে রাষ্ট্র সবচেয়ে দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কীভাবে আচরণ করে, তাদের কতটুকু অধিকার দেয় এবং সেই অধিকারের কতটা বাস্তবায়ন করে এসব প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তরের মধ্যে। যে রাষ্ট্র-সমাজ বিশেষ সক্ষমতার অধিকারী মানুষদের অবহেলা করে, বৈষম্যের মধ্যে ঠেলে দেয় কিংবা করুণার পাত্র হিসেবে দেখে, সে রাষ্ট্র-সমাজ কখনোই প্রকৃত অর্থে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষরা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্র ও সমাজের জীবনচক্রের প্রতিটি স্তরে তাদের ভূমিকা ও গুরুত্ব সমান। অথচ, বাস্তবতা ভিন্ন এবং নির্মম। তাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ সীমিত, কর্মসংস্থানের দরজা প্রায় বন্ধ, সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার উপেক্ষিত। প্রতিদিন তারা লড়াই করে এই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের সক্রিয় সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। সংবিধান স্পষ্টভাবে, প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমান অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগের নিশ্চয়তা দিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রেই তারা অন্য নাগরিকদের মতোই সমান অধিকারভোগী। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আইন ও সংবিধান থাকলেও তাদের জীবনে তার প্রতিফলন নেই। অধিকার আছে, কিন্তু অধিকারের প্রয়োগ নেই। এখানেই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, রাজনীতিকদের ব্যর্থতা এবং নীতিনির্ধারকদের দায় স্পষ্ট। প্রয়োজন প্রবেশগম্য অবকাঠামো, বিশেষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা, কার্যকর পুনর্বাসন কেন্দ্র, কর্মসংস্থানের জন্য সম্মানজনক চাকরির সুযোগ এবং সর্বোপরি সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি নির্মাণ।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের হালনাগাদকৃত প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ ২০২৪ (ডিআইএস) তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা ৩৫ লাখ ৪১ হাজার ২২১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২১ লাখ ৪৩ হাজার ২৫৪ জন এবং নারী ১৩ লাখ ৯৫ হাজার ৫৮ জন। এছাড়াও হিজড়া জনগোষ্ঠী আছেন ২ হাজার ৯০৯ জন। প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ ২০২৫ (ডিআইএস) এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ৩৬৫১৬৭৬ জন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫, ১৭, ২০ এবং ২৯-এ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্য নাগরিকদের সমান সুযোগ ও অধিকার দেওয়া হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিবন্ধী সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৩২.৩৪ লাখ থেকে ৩৪.৫০ লাখে উন্নীত হয়েছে। মাসিক ভাতার হার ৯০০ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিবন্ধীভাতা কর্মসূচির জন্য মোট বরাদ্দের পরিমাণ ৩৭৫২.০৮ কোটি টাকা। সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর বলছে, প্রতিবন্ধী ভাতা বিতরণ কার্যক্রম প্রায় ১০০ শতাংশ অর্জন করেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, প্রতিবন্ধিতার ধরন বিবেচনায় অটিজম ৯০ হাজার ৮১৮ জন, শারীরিক প্রতিবন্ধী ১৮ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৮ জন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধী ১ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭৫ জন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৫৬৫ জন, বাক প্রতিবন্ধী ২ লাখ ১ হাজার ৩৬৯ জন, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ জন, শ্রবণ প্রতিবন্ধী ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৫ জন, শ্রবণ-দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ১৫ হাজার ১৪৪ জন, সেরিব্রাল পালসি ১ লাখ ৩১ হাজার ৭৩৪ জন, বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী ২ লাখ ৪৬ হাজার ২৯০ জন, ডাউন সিনড্রোম ৭ হাজার ১৪৪ জন ও অন্যান্য প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২০ হাজার ২৪৫ জন। বিভিন্ন গবেষণা ও অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে ৯৮ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে বৈষম্যমূলক আচরণ ও নিগ্রহের শিকার হন।

জাতিসংঘের মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পৃথিবীর বৃহত্তম বিভক্ত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। বিশ্বব্যাপী এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন (১৩০ কোটি)। এটি মানবসভ্যতার একটি গভীর বৈষম্যের চিত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্পষ্টভাবে বলছে, ‘প্রতিবন্ধিতার কারণ হলো সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম এবং বিষণœতার মতো স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং নেতিবাচক মনোভাব, অপ্রবেশযোগ্য পরিবহন ও ভবন এবং সীমিত সামাজিক সমর্থনের মতো ব্যক্তিগত ও পরিবেশগত পরিস্থিতিতে ব্যক্তিদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া।’ অর্থাৎ প্রতিবন্ধিতা শুধু শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতা নয়, সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবেশ যখন অপ্রবেশযোগ্য ও বৈষম্যমূলক হয়, তখনই প্রতিবন্ধিতা আরও গভীর ও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের বাস্তবতাও এই বৈশি^ক চিত্র থেকে আরও জটিল, কারণ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ ২০২১’ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রতিবন্ধী। আবার ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে এই হার দেখানো হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এই দুই জরিপ অনুযায়ী সংখ্যাগত চিত্রও বিস্ময়করভাবে ভিন্ন। ২০২১ সালের তথ্যমতে মোট প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ৪৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৪১ জন। অন্যদিকে ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৬০৪ জন। আবার সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে মোট প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ৩৩ লাখ ১৯ হাজার ৭২৭ জন। এই তিনটি সরকারি উৎসের তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মেলে না। ফলে সহজেই ধারণা করা যায়, বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্তকরণ ও তাদের পরিসংখ্যান সঠিকভাবে হয়নি। রাষ্ট্র যখন নিজেই জানে না, তার কতজন নাগরিক বিশেষ সক্ষমতার অধিকারী, তখন সেই জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর নীতি, বাজেট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কীভাবে তৈরি হবে?

প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা ৩৬ লাখ, ৪০ লাখ বা ৫০ লাখ বা তারও বেশি হোক এর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান জরুরি। নির্মম বাস্তবতা হলো, প্রতিবন্ধীদের প্রায় ৯৮ শতাংশ বৈষম্যের শিকার হন। প্রায় ৭০ শতাংশ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাচল, চিকিৎসা প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীরা মূল স্রোতের বাইরে অবস্থান করছেন। যার মূল কারণ, রাষ্ট্রীয় নীতির সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ঘাটতি। প্রতিবন্ধীদের সব বঞ্চনা দূর করতে হলে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও গুরুতর প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য প্রশিক্ষিত সহকারী বা সঙ্গীর মাধ্যমে ভোট প্রদানে সহায়তা করার উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। ব্রেইল ও টেক্সটাইল ব্যালট, অডিও নির্দেশনা ও ইশারা ভাষার প্রয়োগ নিশ্চিত করা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী নারী, অন্তঃসত্ত্বা ও বয়স্ক ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে রিকশা, সিএনজি অথবা প্রাইভেটকার ব্যবহারে বিশেষ অনুমতি প্রদান। গুরুতর প্রতিবন্ধী ভোটারদের ক্ষেত্রে যাদের চলাচলে অসুবিধা রয়েছে, তাদের বাড়িতে গিয়ে ভোটার নিবন্ধন ও তথ্য সহায়তা নিশ্চিত করা। আগামী সংসদে কয়েকজন সংসদ সদস্য নিয়ে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি সর্বদলীয় পার্লামেন্টারি ককাস’ গঠন করা দরকার। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অংশীদার করা জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতিবন্ধীদের প্রায় ৭০ শতাংশ যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পান না। স্কুলে প্রতিবন্ধীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম এবং বিশেষ শিক্ষার সুযোগ সীমিত। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

প্রতিবন্ধীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। দেশের মোট প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মাত্র ২০ শতাংশ কোনো ধরনের কর্মসংস্থানে যুক্ত রয়েছেন। বাকিদের সরকারিভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন এবং আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের জীবনসংগ্রামকে সম্মান জানিয়ে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে, যাতে তাদের জীবনযুদ্ধে বিজয়ের অসংখ্য গল্প তৈরি হয়। প্রতিবন্ধীরা একা নন। আমরা একসঙ্গে কাজ করে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে প্রত্যেক মানুষ তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবেন। বিএনপি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের বাস্তব সমস্যা ও কষ্টকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, আপনাদের পেছনে রেখে আমরা কখনো এগিয়ে যেতে পারব না, এগোতেও আমরা চাই না। আমরা সবাই মিলে যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলব, সেটি হবে সবার জন্য বসবাসযোগ্য এবং সবার জন্য উপভোগ্য।' ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটি অনেক সময় অক্ষমতা ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। এই শব্দের পরিবর্তে সবসময় ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ’ বা ‘বিশেষ সক্ষমতার অধিকারী মানুষ’ বলা। শুধু শব্দের পরিবর্তন নয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। ভাষা যেমন চিন্তার প্রতিফলন। তাই সম্মানজনক ভাষা ব্যবহার মানেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

লেখক: গবেষক ও  কলাম লেখক

sk.rafiq1982@gmail.com