তাড়াশে ৩শ’ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দই মেলা অনুষ্ঠিত

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার পৌর সদরের মডেল মসজিদ ও জমিদারবাড়ির রসিক রায় মন্দির সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকাল থেকে দিনব্যাপী শুরু হয়েছে তিনশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী দইমেলা। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলার পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দই প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও ঘোষ মশায়রা শত শত ঠুটি দইয়ের পসরা সাজিয়ে সকাল থেকেই বেচাবিক্র শুরু করেছেন।

সূর্য ওঠার সাথে সাথে দই কিনতে হুমরি খেয়ে পড়েন স্থানীয় ও দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসা ক্রেতারা। ফলে এদিন ভোর থেকেই জমে উঠেছে এ দইমেলা। স্থানীয়দের দাবি দইমেলা বাংলাদেশের একমাত্র তাড়াশ উপজেলার এই স্থানটিতেই অনুষ্ঠিত হয়। এটি প্রায় ৩‘শ বছরের ঐতিহ্য। তাড়াশের তৎকালীন জমিদার বনোয়ারী লাল রায় বাহাদুর প্রায় ৩‘শ বছর আগে বিদ্যাদেবী সরস্বতী পূঁজা উপলক্ষে এ মেলার গোড়াপত্তন করেন।

শুক্রবার কুয়াশা ভেদ করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শত শত নারী-পুরুষ দই কিনতে এ মেলায় এসে ভীড় জমান। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ক্রেতার আগমন বাড়তে থাকে। ফলে মূহুতে মেলা জমে ওঠে। এ মেলায় শুধু সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা সদরের মানুষই আসেনি আশপাশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকেও ক্রেতা-বিত্রেতারা এসেছেন। দইমেলায় দইয়ের পাশাপাশি বাহারি রংংের ঝুড়ি-সাজ, চিরা-মুড়ি, জিলাপি, বড়ই, পেয়ারাসহ নানা সামগ্রীর পসরা জাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। ফলে মেলা অঙ্গণে উৎসব আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। বেচাবিক্রি ভালো হওয়ায় মেলাটিও বেশ জমে উঠেছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সরস্বতী পূজা উপলক্ষে এ বছরেও ঐতিহ্যবাহী এই দইমেলার আয়োজন করা হয়েছে।

স্থানীয় দই প্রস্তুতকারী অধির চন্দ্র ঘোষ, উজ্জল কুমার ঘোষ ও গোপাল চন্দ্র ঘোষ জানিয়েছেন, এই মেলার জন্য আমরা সারা বছরই উদগ্রীব হয়ে বসে থাকি। কারণ এই মেলায় প্রচুর ক্রেতার আগমন ঘটে। ফলে সারা বছরের তুলনায় এ মেলায় বেচা-বিক্রিয় অনেক ভালো হয়। যা আমাদের সারা বছরের তুলনায় অনেক বেশি। এ মেলায় আমরা বেচাকেনা করে আর্থিক ভাবে লাভবান হই। ফলে এ মেলাকে কেন্দ্র করে আমারা এক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করি। যেমন দুই তিন গুণ বেশি দুধ, চিনি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে থাকি।

তারা আরও বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে দই প্রস্তুত শুরু করি। শুক্রবার ভোরে প্রস্তুতকৃত দই মেলা প্রাঙ্গণে দোকান সাজিয়ে বসেছি। সারাদিন এক ভাবে বেচা-বিক্রি হবে। ক্রেতার ভিড় থাকলে রাত ৮-৯টা পর্যন্ত বেচাকেনা চলবে। এ মেলায় বিভিন্ন জেলা উপজেলার নামীদামি ব্রান্ডের দই প্রস্তুতকারীরা তাদের নিজ হাতে তৈরী দই নিয়ে এসেছেন। যার দই সবচেয়ে ভালো মানের তার দোকানে ক্রেতার ভিড়ও বেশি।

সকাল ১০টার দিকে মেলায় গিয়ে দেখা যায়, মেলায় বিভিন্ন জেলা থেকে দই বিক্রেতারা এসেছে। সেই সাথে বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন পেশার মানুষ দই কিনতে ভিড় জমিছেন। দইয়ের পাশাপাশি তারা ঝুড়ি, মুড়ি-মুড়কি, চিড়া, বাতাসা, জিলাপি, কদমাসহ নানা ধরনের মিষ্টান্ন কিনে বাড়ি ফিরছেন। সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে এই মেলা জমে উঠেছে। অপরদিকে এ মেলাটিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ধর্মের মানুষের উপস্থিতিতে মেলাটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

প্রতি বছর মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমী তিথিতে তাড়াশ উপজেলা সদরের এই মাঠে এই দইমেলার আয়োজন করা হয়। দিনব্যাপী দইয়ের এই মেলা ঘিরে তাড়াশ উপজেলাসহ পাশের পাবনা, নাটোর ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়া উপজেলার দই প্রস্তুতকারীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা দেয়।

মেলায় দই কিনতে আসা তাড়াশের গোপাল চন্দ্র সাহা বলেন, তার বাপ-দাদার আমল থেকে পরিবারের লোকজন এই মেলায় আসেন। তারা মেলা থেকে দই সহ বিভিন্ন খাবার কেনেন। তাই প্রতিবছরের ন্যায় এবারও মেলায় এসেছেন দই কিনতে।

তিনি বলেন, এই মেলা উপরক্ষে অধিকাংশ বাড়িতে মেয়েরা স্বামী সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে নাওরে এসেছে। আবার বউ-ঝিরাও এসেছে। এ মেলায় বয়বৃদ্ধা কাকনবালা এসেছেন তার দুই মেয়ে মেয়ের জামাই, দুই ছেলের বউ ও নাতি পুতি নিয়ে। মেলা ঘুড়ে ঘুড়ে দাম দর করে দই ও অন্যান্য সামগ্রী কিনছেন। তিনি জানান, সবাইকে নিয়ে মেলার অনন্দ উপভোগের জন্য সবাইকে সাথে নিয়ে এসেছে। সবাই মিলে আনন্দ করছি। পছন্দের সদাই কিনছি। বাড়ি গিয়ে সবাই এক সাথে খাব।

সরস্বতী পূজা উপলক্ষে আয়োজিত এ মেলায় দই কিনতে ও মেলায় ঘুরতে এসেছেন শিশু শিক্ষার্থী কাকন ঘোষ ও কান্তা ঘোষ। তারা মেলায় আসতে পেওে অনেক খুশি। মেলা ঘুওে ঘুওে তারা নিজেদের পছন্দ মত দই ও চিরা মুড়ি কিনছেন।

রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া থেকে এসেছেন আলী হাসান। তিনি বলেন, ‘শত বছরের পুরোনো ঐত্যিহ্যবাহী এই মেলায় এসে খুব ভালো লাগছে।

এ মেলায় এসেছেন নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার শ্রীপুর এলাকার প্রবীণ দই প্রস্তুতকারী তানু কাজি। তিনি বলেন, ‘বয়স বেড়ে গেছে। এত দূর আসতে কষ্ট হয়। কিন্তু এই মেলার সময় এলে আর ভালো লাগে না। ফলে চলে আসতে বাধ্য হই। সবকিছুর দাম বাড়তি, তাই এবার দইয়ের দামও কিছুটা বেড়েছে।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার উষা দই এর মালিক সন্তোষ কুমার ঘোষ বলেন, ঐত্যিবাহী এ মেলায় প্রতি বছরই আসা হয়। বেচাকেনাও ভালো হয়। এবছরও ভালো বেচাকেনা হয়েছে।

চলনবিল অধ্যুষীত তাড়াশ উপজেলার এই দইমেলার প্রথম সূচনা করেন, তাড়াশের তৎকালীন জমিদার বনোয়ারী লাল রায় বাহাদুর। জনশ্রুতি রয়েছে, জমিদার বনোয়ারী লাল রায় বাহাদুর দই ও মিষ্টান্ন খেতে খুব পছন্দ করতেন। তাই জমিদার বাড়িতে আসা অতিথিদের আপ্যায়নে এ অঞ্চলে ঘোষদের তৈরি দই পরিবেশন করতেন। আর সে থেকেই জমিদারবাড়ির সামনে রশিক রায় মন্দিরের মাঠে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী দইমেলার প্রচলন শুরু হয়।

সেই থেকে প্রতিবছর শীত মৌসুমের মাঘ মাসে শ্রীপঞ্চমী তিথিতে এ দইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। কথিত আছে, প্রতিবছর মেলায় আগত সবচেয়ে ভালো সুস্বাদু দই তৈরিকারক ঘোষকে জমিদারের পক্ষ থেকে উপঢৌকন দেওয়ার রেওয়াজও ছিল। জমিদার আমল থেকে শুরু হওয়া ঐতিহ্যবাহী তাড়াশের দইমেলা এখনো মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথিতেই উৎসব-আমেজে বার্ষিক রেওয়াজ মেনে চলে আসছে। সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে এই মেলার আয়োজন করা হলেও মেলাটি এখন সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা, সিরাজগঞ্জ’ শীর্ষক বইয়ে তাড়াশের এ দইমেলার বর্ণনা রয়েছে। বইটির প্রধান সম্পাদক শামসুজ্জামান খান বিস্তারিতভাবে এ মেলার বিবরণ দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, এক সময় এ মেলায় ৭০০-৮০০ জন ঘোষ প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার মণ দই নিয়ে এসে বিক্রি করতেন। তখন অবশ্য মেলা হতো তিন দিনের। বর্তমানে দিনব্যাপী মেলায় কয়েক‘শ মণ দই বিক্রি হয়।

দইমেলায় আসা এ অঞ্চলের দইয়ের স্বাদের কারণে নামেরও ভিন্নতা আছে। যেমন ক্ষীরসা দই, শাহী দই, শেরপুরর দই, বগুড়ার দই, টক দই, শ্রীপুরী দই সহ কত বাহারি নাম। নাম ও দামেও রয়েছে হেরফের। বিশেষ করে বগুড়ার শেরপুর, রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা, গুরুদাসপুরের শ্রীপুর, উল্লাপাড়ার ধরইল, চাটমোহরের হান্ডিয়াল ও তাড়াশের দই প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয়। মেলায় আসা বিভিন্ন এলাকার একাধীক ঘোষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুধের দাম, জ্বালানি ও শ্রমিকের খরচ, দইয়ের পাত্রের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ বছর দইয়ের দামও বেড়েছে। তবে বার্ষিক এ মেলায় আসতে পেরে তারা খুশি।

তাড়াশ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গোপাল চন্দ্র ঘোষ বলেন, ঐতিহ্য মেনে সরস্বতী পূজার দিনে তাড়াশে দইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। সুষ্ঠু পরিবেশে এ মেলা সম্পন্ন করতে দলমত-নির্বিশেষে সবাই কাজ করেন। দইয়ের পাশাপাশি এ মেলায় নানা পদের মিষ্টান্নও পাওয়া যায়। প্রতি বছরের ন্যায় তাড়াশের পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ শহরেও সরস্বতী পূজা উপলক্ষে দই মেলার আয়োজন করা হয়। প্রায় ৩০০ বছর ধরে স্থানীয়রা এই দই মেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

তাড়াশ উপজেলার মডেল মসজিদ ও জমিদার বাড়ির রসিক রায় মন্দিরসংলগ্ন পৌর ঈদগাহ মাঠে ও সিরাজগঞ্জ শহরের মুজিব সড়কে দিনব্যাপী এই দই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দইয়ের স্বাদ নিতে মেলায় ভিড় করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।