বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক ক্রীড়াব্যক্তিত্বকেই দেখা গেছে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে। যাদের অন্যতম মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, সাকিব আল হাসান, নাঈমুর রহমান দুর্জয়, আরিফ খান জয়, সালাম মুর্শেদী। মাঠের তারকাখ্যাতি রাজনৈতিক অঙ্গনে কাজে লাগিয়ে তারা পেরিয়ে গেছেন নির্বাচনী বৈতরণীও। কেবল সংসদ সদস্য নন, অনেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর ফের দেশে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। অতীতের মতো এবারও মাঠ ছেড়ে নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় হয়েছেন অনেকে। বিভিন্ন দলের হয়ে তারা চাচ্ছেন নিজেদের নতুন পরিচয়ে চেনাতে। আবার অনেকে আগেই পেয়েছেন রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিই মনোনয়ন দিয়েছে প্রায় ২৮ ক্রীড়া ব্যক্তিত্বকে।
রাজনীতির মাঠে অতি পরিচরিত মুখ মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। ভোলা-৩ আসন থেকে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া হাফিজ উদ্দিনকে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির শাসনামলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিনের অবশ্য প্রথম পরিচয় ফুটবলার। স্বাধীনতার আগে তিনি ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের সদস্য। ১৯৬৭ সালে প্রথম জাতীয় দলে ডাক পান। এর তিন বছর পর তিনি পাকিস্তান জাতীয় দলকে নেতৃত্বও দেন। তবে হাফিজ খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতি বেশি পান মোহামেডানে নাম লেখানোর পর। খেলা ছাড়ার পর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮০ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পাওয়া হাফিজ উদ্দিন। অশীতিপর হাফিজ উদ্দিনকে এবারও সক্রিয় দেখা যাচ্ছে নির্বাচনের মাঠে। ভোলা-৩ আসনে ধানের শীষ নিয়ে লড়বেন তিনি।
বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টেনে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও গোলকিপার আমিনুল হক। দেশের সর্বকালের সেরা গোলকিপারের আলোচনায় শুরুর দিকেই থাকবে আমিনুলের নাম। সেই আমিনুল বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে আছেন রাজনীতির মাঠে। কেবল নামকাওয়াস্তে থাকা নয়, ভিন্ন আদর্শের রাজনীতি করায় জেল-জুলুম খাটতে হয়েছে তাকে বিগত সরকারের আমলে। এবারই প্রথম তিনি নির্বাচনমুখী হয়েছেন। ঢাকা মহানগর বিএনপি উত্তরের আহ্বায়কের দায়িত্বে আছেন তিনি। তারও আগে থেকে দলটির ক্রীড়া সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিএনপি রাজপথে প্রায় সব কর্মসূচির সামনের সারিতে দেখা গেছে তাকে। সদ্যপ্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও দলটির অন্যতম কান্ডারি তারেক রহমানের বিশ্বস্ততা অর্জন করে আমিনুল এবার লড়বেন ঢাকা-১৬ আসনে। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি ইতিমধ্যে শুরু করেছেন গণসংযোগ। পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনেও আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় হয়েছেন নানাভাবে।
সরাসরি মাঠের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও সংগঠক হিসেবে ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক থাকা অনেকেই এবার নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরেই জড়িত ঐতিহ্যবাহী মোহামেডানের সঙ্গে। কিছুদিন ক্লাবটির গভর্নিং বডির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। দেশের রাজনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ মির্জা ফখরুল এবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়বেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনে।
ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস। বেগম খালেদা জিয়া যে দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, মির্জা আব্বাসকে দেখা গেছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। একটা সময় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। মোহামেডান গভর্নিং বডির সাবেক সদস্য সচিব মনিরুল হক চৌধুরী এবার কুমিল্লা-৬ আসন থেকে বিএনপির হয়ে লড়বেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সভাপতি ও ঢাকা আবাহনীর সাবেক পরিচালক আলী আসগর লবি লড়ছেন ধানের শীষ প্রতীকে খুলনা-৫ আসনে।
মোহামেডানের দুঃসময়ের সঙ্গী, ক্লাবটির পরিচালক বিশিষ্ট শিল্পপতি শরীফুল আলম, সাবেক চিফ হুইপ জয়নাল আবদিন ফারুক নোয়াখালী-২, ভিক্টোরিয়া ক্লাবের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক জিএস খায়রুল কবির খোকন নরসিংদী-১, আবাহনীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সিরাজগঞ্জ-২, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের সভাপতি ইশরাক হোসেন ঢাকা-৬ আসনে লড়বেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে।
সাবেক ভলিবল খেলোয়াড় ও বেগম জিয়ার আমলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা এহসানুল হক মিলন চাঁদপুর-১ আসন থেকে হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী। সদ্য সমাপ্ত বিপিএল-এর দল ঢাকা ক্যাপিটালসের অন্যতম মালিক নজরুল ইসলাম আজাদ নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন। এছাড়া আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের সাবেক সভাপতি শেখ ফরিদউদ্দিন আহমদ মানিক চাঁদপুর-৩, বাফুফের কাউন্সিলর ফরহাদ হোসেন আজাদ পঞ্চগড়-২, বাফুফের কাউন্সিলর শাহ ওয়ারেস আলী মামুন জামালপুর-৫, যাত্রাবাড়ী ক্রীড়া চক্রের সভাপতি নবী উল্লাহ নবী ঢাকা-৫, দিলকুশা ক্লাবের সভাপতি হাবিবুর রশিদ হাবিব ঢাকা-৯, বিসিবির কাউন্সিলর চেয়ারম্যান মীর হেলাল চট্টগ্রাম-৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়াই করবেন।
আমিনুল হক নিজ আসনে পাড়া-মহল্লায় এর মধ্যেই ব্যাপক জনসংযোগ শুরু করেছেন। এমনিতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারির নেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া আমিনুল অবশ্য প্রচার-প্রচারণায় অন্য ক্রীড়াবিদদের ইমেজকে কাজে লাগানোর পক্ষে নন, ‘অতীতে আমরা দেখেছি ক্রীড়াঙ্গন থেকে এসে অনেক প্রার্থী নিজের নির্বাচনী গণসংযোগে বিভিন্ন ক্রীড়া তারকাদের সামনে এনে তাদের ইমেজ ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন। আমি এই সংস্কৃতির ঘোর বিরোধী। বিশেষ করে আমার দল জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এমন কিছু করতে চায় না যার ফলে সেই ক্রীড়াবিদের দুর্নাম হয়। আমি একজন প্রার্থী হিসেবে আমার নির্বাচনী আসনের সব মানুষের কাছে যাচ্ছি এবং যাব। তারা আমার ওপর আস্থা রাখলে চেষ্টা করব, তাদের জন্য ভালো কিছু দিতে। এছাড়া একজন খেলার মানুষ হিসেবে, আমার অন্যতম অগ্রাধিকারে থাকবে দেশের খেলাধুলা। কারণ খেলাধুলার মধ্য দিয়ে একটি সুস্থ জাতি গড়ে তোলা সম্ভব।’
বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) সিনিয়র সহসভাপতি ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সভাপতি আবদুস সালাম মনে করেন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব নির্বাচনমুখী হওয়ার ফলে দেশের রাজনীতিতে একটা শুদ্ধতার রীতির প্রচলন ঘটবে, ‘ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরা যদি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী ফোরাম ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেয় তবে এ দেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে ভাবতে হবে না। আমরা আশা করব, যারা আগামীতে নির্বাচিত হবেন, তারা ক্রীড়ার উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালন করবেন।’