প্রথমবার ভোট দেওয়ার আনন্দে উচ্ছ্বসিত তরুণরা

বলা হয়ে থাকে, জাতীয় নির্বাচন হলো সবচেয়ে বড় সর্বজনীন উৎসব। নির্বাচনে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার মাধ্যমে নাগরিক তার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটান। নির্বাচিত করেন নিজের প্রতিনিধি, যিনি জাতীয় সংসদে তার হয়ে, তারটি কথাটি উপস্থাপন করবেন। দ্বাদশ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৮৯ হাজার ২৮৯ জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জনে। অর্থাৎ তালিকায় নতুন ভোটার হিসেবে যুক্ত হয়েছেন ৮০ লাখ ২২ হাজার ৬০৬ জন। অর্থাৎ প্রতি প্রায় ১৬ জনের মধ্যে ১ জন নতুন ভোটার। এই নতুন ভোটাররা অধিকাংশই বয়সে তরুণ এবং ভোটদানের অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন প্রথমবারের মতো। এবারের নির্বাচনে তাদের সমর্থন যেমন ফলাফল নির্ধারণকারী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে তেমনি তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াও সম্ভব নয়।

আমরা জানতে চেয়েছিলাম, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছেন এই নতুন ভোটাররা। এই নতুন ভোটাররা শুধু শিক্ষার্থীই নয়, চাকরিজীবী, উদ্যোক্তা ও সংগঠক  বিভিন্ন পেশার মানুষ আছেন। কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন বটে, তবে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন এবারই প্রথম। তারা তুলে ধরেছেন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রত্যাশা এবং প্রথম ভোটার হওয়ার অনুভূতি।

তুর্জয় দাশ ও হুমায়ূন আহমেদ নাইম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তারা এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন। তবে ‘জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুভূতির সঙ্গে তার তুলনা চলে না’ বললেন তিনি। ‘প্রথম ভোটদানের অনুভূতি আসলে অবর্ণনীয়’ জানিয়ে নাইম বলেন ‘এবারই প্রথম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালকদের নির্বাচনে সরাসরি ভূমিকা রাখব। এ জন্য নির্বাচনসহ সার্বিকভাবে রাষ্ট্রের রাজনীতি, দলগুলোর আদর্শসহ কর্মসূচিগুলো প্রতি ভালোভাবে জানার চেষ্টা করছি। যেন যোগ্য প্রার্থীকেই ভোটটি দিতে পারি।

জান্নাত আক্তার নিপুও শিক্ষার্থী, তিনি পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ডাকসু নির্বাচনে ভোটদানের অভিজ্ঞতা রয়েছে নিপুর। নির্বাচনের সেই সাজসাজ পরিবেশ এখন স্মরণ রয়েছে তার। তার এলাকায় নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে জোরেশোরে, কিন্তু প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাননি ক্যাম্পাস থাকার কারণে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ও পরিচিতদের সঙ্গে আলাপ করে খোঁজখবর রাখছেন। নিজের প্রথম ভোটটি যোগ্য প্রার্থীকেই দিতে চান তিনি। দলীয় মার্কা দেখে নয়, বরং প্রার্থীর নিজস্ব যোগ্যতা যাচাই বাছাই করেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান নিপু। এবারে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, গণভোটও। সে বিষয়েও নিচ্ছেন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী এই গণভোটে একজন ভোটার হিসেবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট আছে নিপুর। তাই শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়, সময় নিয়ে গণভোটেও অংশ নেবেন তিনি। ভোট নিয়ে উৎসাহ ও উদ্দীপনায় অপেক্ষা করছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী শান্ত। শিক্ষাজীবন শেষ করে ফেললেও এখন ভোট দিতে পারেননি। শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ায় ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও ভোট দিতে পারেননি। কিন্তু অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে জাতীয় নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলেও ভোট দিতে পারবেন না তিনি। কারণ জাতীয় স্বার্থে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন ভোটের মাঠেই। পোস্টাল ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও ভাবতেও পারেননি যে, এই অল্পবয়সেই, চাকরির প্রথম বছরেই সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাবেন। সেজন্য পোস্টাল ভোটের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেননি। ফলে ভোট দেওয়া হচ্ছে না তার। তবে ভোট দিতে না পারলেও ভোটাররা যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন তার জন্য নিজের সাধ্যের মধ্যে সবটুকু উজাড় করে দেবেন জানালেন। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের এই আয়োজনে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন তিনি। ইয়াছমিন লিসা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বয়স ত্রিশ পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেননি। তবে এবার দেবেন। গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে উপেক্ষার সুযোগ নেই জানিয়ে বললেন, নির্বাচন নিয়ে আমার প্রত্যাশা নির্বাচনের আগে প্রচারণার সময় আর নির্বাচনের পরে যেন দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় থাকে। যারা ঘরেবাইরে নারীসহ প্রতিটি নাগরিকের স্বাভাবিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেবে আমার সমর্থন তাদের প্রতিই।

প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়া গভীর আবেগ ও দায়িত্ববোধের বিষয় ইসতাক আহমেদ তারেকের কাছে। তিনি একজন তরুণ উদ্যোক্তা। এই ভোটদানের মাধ্যমে তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিতে চান, যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে। এর আগে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত থাকার পরও পড়াশোনার কারণে দেশের বাইরে অবস্থান করায় বিগত জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ভোট দেওয়ার সুযোগ গ্রহণ করতে পারেননি। কিন্তু এবার সুযোগটি হারাতে চান না।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে তরুণরা উচ্ছ্বাস নিয়ে অপেক্ষায় প্রথমবারের মতো ভোটদানের জন্য। কিন্তু তারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান ভোটের আগে প্রচারণার সময় এবং ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে। ভোটের ফলাফল যা-ই হোক, প্রার্থীরা তা মেনে নেবেন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন এমনটাই প্রত্যাশা তাদের। তারা নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের দায়িত্ব পালনে আগ্রহী, কিন্তু জোর দিচ্ছেন সার্বিক নিরাপত্তার, যা নিশ্চিত করতে হবে সরকার ও প্রশাসনকেই।