প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে পরকালে মুক্তি নেই

সামনে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের কাছে নানা কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন, ওয়াদা করেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর, অনেক সময় তাদের তা বাস্তবায়ন করতে দেখা যায় না। প্রত্যেক মানুষ তার ওয়াদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ওয়াদার সঠিক জবাব না দিয়ে, পরকালে কেউ মুক্তি পাবে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদাররা, তোমরা কেন এমন কথা বলো, যা কাজে পরিণত করো না? এটা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত জঘন্য ও ঘৃণিত কাজ যে তোমরা বলবে এমন কথা, যা করবে না।’ (সুরা সফ ২-৩) প্রার্থীদের কেউ বলেন, এলাকার রাস্তাঘাট পাল্টে দেবেন। কেউ বলেন, বেকারদের চাকরি দেবেন। আবার কেউ বলেন, দুর্নীতি বন্ধ করবেন, ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন, দ্রব্যমূল্য কমাবেন, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন করবেন। এ ছাড়া প্রার্থীরা আরও যে ওয়াদাগুলো করেন, তার বড় অংশই থাকে উন্নয়নকেন্দ্রিক। যেমন ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক করা, পানির সংকট দূর করা, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, স্কুল-কলেজে অবকাঠামো উন্নয়ন, হাসপাতালের সেবা বাড়ানো, কৃষকদের জন্য সহায়তা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাস দমন ইত্যাদি। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবেও আশ্বাস দেন, নির্দিষ্ট পরিবারকে সহযোগিতা করবেন, চাকরি দেবেন, মামলা থেকে রক্ষা করবেন ও বিশেষ সুবিধা করে দেবেন। নির্বাচনের মাঠে এসব ওয়াদা মানুষকে আশ্বস্ত করে, স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির অনেকগুলো বাস্তবায়িত হয় না। কারণ কখনো অদক্ষতা, কখনো দুর্নীতি, কখনো ক্ষমতার অপব্যবহার, আবার কখনো প্রতিশ্রুতি আদৌ আন্তরিক না হয়ে, শুধু ভোট পাওয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ওয়াদা পূরণ না করার সামাজিক পরিণতি ভয়াবহ। মানুষের বিশ্বাস ভেঙে গেলে সমাজে নৈতিক শক্তি দুর্বল হয়। জনগণ রাজনীতিকে আর কল্যাণের মাধ্যম মনে করে না, বরং ধোঁকাবাজির ক্ষেত্র মনে করে। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে অসৎ প্রতিযোগিতা বাড়ে, মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়। সাধারণ মানুষ মনে করে, সত্য বললে কাজ হয় না, মিথ্যা বললেই সফল হওয়া যায়। ফলে পুরো সমাজে সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও জবাবদিহির মতো মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে ওয়াদা রক্ষা করা ইমানের অংশ। ওয়াদা ভঙ্গ করা শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি নৈতিক অপরাধ এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়। মুখে বলা আর কাজে বাস্তবায়নের মধ্যে যদি দূরত্ব থাকে, তবে তা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়। একজন প্রার্থী যখন জনগণের সামনে প্রতিশ্রুতি দেন, তখন তিনি এক ধরনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই দায়িত্ব ভঙ্গ করলে দুনিয়ায় যেমন মানুষের কাছে মর্যাদা কমে, তেমনি আখেরাতেও জবাবদিহি থেকে রেহাই নেই। তাই নির্বাচনের মৌসুমে শুধু বড় বড় কথা নয়, বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দেওয়া জরুরি। প্রার্থীদের উচিত হবে কম ওয়াদা করা, কিন্তু যা করবেন তা দৃঢ়ভাবে করা। আর জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে প্রশ্ন করা, হিসাব চাওয়া এবং দায়িত্বশীল মানুষকে নির্বাচিত করা।

এ ছাড়া আমাদের সমাজে কিংবা আশপাশে এমন ব্যক্তি রয়েছেন, যারা প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দেন না, নানা কারণে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। এতে সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায় এবং অবিশ্বাসযোগ্য মানুষ হিসেবে বিবেচিত হন। সমাজে সে যত সম্মানী ব্যক্তি হোক না কেন, সবাই তাকে ঘৃণার চোখে দেখে। প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা প্রতিশ্রুতি পূরণ করো।’ (সুরা মায়েদা ১. অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার পর, সেই অঙ্গীকার পূর্ণ করো এবং পাকাপাকি কসম করার পরে তা ভঙ্গ করো না। আর এই ব্যাপারে তো তোমরা আল্লাহকে জিম্মাদার বানিয়েছ। তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা নাহল ৯১)  কোরআনে যেমন ওয়াদা পালনের গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ঠিক তেমনি হাদিসেও ওয়াদা পালনের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ওয়াদা পালনের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে নবীজি (সা.)-এর আচরণ। তিনি ওয়াদা রক্ষায় তিন দিন একই স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু হাসমা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়ত লাভের আগে একদা আমি তার কাছ থেকে কেনাকাটা করি। যার কিছু মূল্য পরিশোধ করতে বাকি রয়ে গিয়েছিল। আমি তার সঙ্গে ওয়াদা করেছিলাম যে, আমি অবশিষ্ট দাম নিয়ে তার নির্ধারিত স্থানে এসে হাজির হবো। আমি এই প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গেলাম। তিন দিন পরে আমার স্মরণ হলো। এসে দেখলাম তিনি সেই নির্দিষ্ট স্থানে আছেন। আমাকে দেখে তিনি বললেন, তুমি আমাকে খুব বিপদে ফেলেছিলে। আমি তিন দিন ধরে তোমার অপেক্ষা করছি। (সুনানে আবু দাউদ)

এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। বলতে দ্বিধা নেই, আমরা হাসি-তামাশার ছলে অনেক ওয়াদা ভঙ্গ করে ফেলি। আমরা ছোট কিংবা বড়দের দুষ্টামির ছলে বলি, তোমাকে আমি এটা দেব, ওটা দেব। কিন্তু পরে আর তা দেই না। এটা যে ওয়াদা ভঙ্গ করার মতো কাজ, তাও মানি না। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমার মা আমাকে ডাকলেন। তখন রাসুল (সা.) আমাদের ঘরে বসেছিলেন। মা বললেন, এদিকে এসো। তোমাকে আমি কিছু দেব। তখন রাসুল (সা.) আমার মাকে বললেন, তুমি তাকে কী দিতে ইচ্ছা পোষণ করেছ? তিনি বললেন, আমি তাকে একটি খেজুর দিতে ইচ্ছা করেছি। তখন রাসুল (সা.) তাকে বললেন, সাবধান! যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে, তবে তোমার আমলনামায় একটি মিথ্যা কথা বলা লেখা হতো। (সুনানে আবু দাউদ) সুতরাং আমাদের ব্যক্তি জীবনে হাসি-তামাশা কিংবা দুষ্টামির ছলে এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা এর ভয়াবহতা কঠোর। কোনো বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর মহান আল্লাহ আমাদের তা বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

muftimahbub503@gmail.com