ভোটের বাকি আর মাত্র দুই সপ্তাহ। দেশ জুড়ে এখন নির্বাচনী আমেজ। জোরেশোরে চলছে গণসংযোগ। প্রার্থীরা যাচ্ছেন ভোটারদের দুয়ারে-দুয়ারে। নানা আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন তারা। মাইক নিয়েও ঘুরে ঘুরে চলছে প্রার্থীর গুণকীর্তন। তবে এর মধ্যেই নিষিদ্ধ পিভিসিতে সয়লাব রাজধানীর অলিগলি। নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রচারের জন্য প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু‘ নিয়মের তোয়াক্কা না করে শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীরা দেদার ব্যবহার করছেন এসব ব্যানার। এতে একদিকে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিতে পড়ছে দেশ, অন্যদিকে নির্বাচনী বিধিমালার লঙ্ঘন ঘটছে।
পরিবেশবাদী ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অপচনশীল প্লাস্টিকের জন্য পরিবেশ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। যারা উন্নত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তারাই এ কাজ করছেন, যা হতাশাজনক। তবে এ বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকলেও নিশ্চুপ নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণায় কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না প্রার্থীরা। লিফলেট ও ব্যানার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এবার কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসি। প্রচারণায় কোনো ধরনের পোস্টার বা অপচনশীল দ্রব্য, যেমন পলিথিন, প্লাস্টিক বা রেকসিন ব্যবহার করা যাবে না। দেয়াল, গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা সরকারি-বেসরকারি যানবাহনে লিফলেট বা ফেস্টুন সাঁটানো যাবে না।
ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার করা ব্যানার ও ফেস্টুনকে হতে হবে সাদা-কালো রঙের। ব্যানার সর্বোচ্চ ১০ ফুট বাই ৪ ফুট এবং ফেস্টুন ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি হতে হবে। এগুলোতে প্রার্থী নিজের ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করতে পারবেন না। এ ছাড়া, কোনো দেয়ালে লিখে বা অঙ্কন করে প্রচারণা চালানো যাবে না এবং কোনো প্রকার গেট বা তোরণ নির্মাণ করা যাবে না।
ঢাকার বেশ কয়েকটি আসনের অলিগলি ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা পিভিসি দিয়ে তৈরি ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যাপক হারে টানিয়েছেন। কোথাও বিদ্যুতের খুঁটিতে, কোথাও সরকারি প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে ও গেটে ঝুলছে এসব নিষিদ্ধ প্রচারসামগ্রী। নির্বাচনী বিধিমালা উপেক্ষা করে প্রকাশ্যেই চলছে এমন প্রচারণা। মনে হয় যেন নিষিদ্ধ পলিথিন ও পিভিসি আবার বৈধতা পেয়েছে।
মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর থানাধীন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮ থেকে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকান্ড১৩ আসন। সরেজমিনে আসনটিতে ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের মোড়, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ফুটপাত জুড়ে ঝুলছে বড় আকারের ব্যানার ও ফেস্টুন। রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় বেশ কয়েকটি স্থানে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ববি হাজ্জাজের পিভিসি ফেস্টুন চোখে পড়েছে। এ আসনে আরেক আলোচিত প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ১১-দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী মামুনুল হকের পোস্টার দেখা গেছে মোহাম্মদপুরে।
একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে ঢাকান্ড১২ আসনেও। আগারগাঁওয়ের পরিকল্পনা কমিশনের পাশ ঘেঁষে থাকা বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলতে দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলনের পিভিসির তৈরি ফেস্টুন। এ ছাড়া এই আসনের আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরবকেও নিষিদ্ধ পিভিসি ব্যানার ব্যবহার করে প্রচার চালাতে দেখা গেছে। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হকও কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় পিভিসি ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহার করে প্রচার চালাচ্ছেন।
ঢাকান্ড১০ আসনেও বিধিমালার তোয়াক্কা না করে নিষিদ্ধ পিভিসি ব্যানারে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেখ রবিউল আলমকে। ধানম-ি, নিউ মার্কেট ও পলাশী এলাকায় নিষিদ্ধ ব্যানার ঝুলতে দেখা গেছে। জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী জসীম উদ্দিন সরকারও পিভিসির তৈরি ব্যানার ব্যবহার করে প্রচার চালাচ্ছেন। পাশাপাশি জনতার দলের প্রার্থী মেজর (অব.) জাকির হোসেনের প্রচারণায় ধানম-ির বিভিন্ন সড়কে ঝুলছে নিষিদ্ধ পিভিসি ব্যানার।
কী বলছে নির্বাচন কমিশন : নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফেস্টুন-ব্যানার সাদা হওয়ার কথা। কেউ যদি পিভিসি করে থাকে, তাহলে সেটা সঠিক হয়নি। সেটা ভায়োলেশন। কারও চোখে পড়ে থাকলে সে আমাদের যে নির্বাচন ট্রায়াল ইনকোয়ারি কমিটি এবং অ্যাডজুডিকেশন কমিটি আছে, জজ সাহেবদের, তাদের নজরে আনতে পারে, অথবা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের নজরে আনতে পারে বিষয়টা।’
পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক ভালো ভালো আইন আছে, কিন্তু সেগুলোর কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই। যারা আইন করেন, তারা আইন করেই যেন দায়িত্ব শেষ মনে করেন। কিন্তু আইন করার পর সেটি কার্যকর করার দিকে তাদের নজর থাকে না। আমাদের দেশে এটা চিরাচরিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন দেখছি নিষিদ্ধ পিভিসি ব্যবহার করা হচ্ছে। পরে যখন এগুলো বর্জ্যে পরিণত হবে, তখন বুঝতে পারব পরিবেশের ওপর এর কত ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। কিন্তু যারা নির্বাচন করছেন বা যারা পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তারা ভবিষ্যতের বিষয়টি বিবেচনায় নেন না। তাদের কাছে পরে কী হলো, সেটা দেখার বিষয় নয়। অথচ নির্বাচন কমিশন একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তারা চাইলে এ আইনগুলো কঠোরভাবে কার্যকর করতে পারে। সুযোগও আছে। কিন্তু বাস্তবে মাঠপর্যায়ে কেউই নেই না মন্ত্রণালয়, না অধিদপ্তর, না নির্বাচন কমিশন।’
ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন বারবার বিধিমালার কথা বলছে, প্রচারণায় কী করা যাবে আর কী করা যাবে না। এসব নিয়ম তো স্বচ্ছভাবে সবার জানা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা নিজেরাই বুঝতে পারছি না। যেসব বড় বড় ব্যানার চোখে পড়ছে, সেগুলো আইনসম্মত নাকি বিধিমালা লঙ্ঘন করে লাগানো হচ্ছে?’
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি কোনো একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমার এলাকায় জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি সব দলই বড় আকারের ব্যানার ও পোস্টার টানিয়েছে। কোথাও সাদা-কালো, কোথাও রঙিন। অথচ বিধিমালায় স্পষ্টভাবে প্রতিটি ব্যানার ও পোস্টারের নির্দিষ্ট মাপ নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। সেই মাপের বেশি ব্যবহার করা যাবে না, যেখানে-সেখানে লাগানোও নিষিদ্ধ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব রাজনৈতিক দল নিয়ম ভেঙে প্রচারণা চালাচ্ছে।’
মুনিরা খান বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল এসব অবৈধ ব্যানার-পোস্টার দ্রুত অপসারণ করা কিংবা অন্তত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। সময়ও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।’