ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েক দিন। এবারের নির্বাচন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। রাস্তাঘাট, দেয়াল কিংবা খুঁটিতে পোস্টার বা ব্যানার তেমন একটা দেখা যায় না; রয়েছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিধিনিষেধও। তাই এখন প্রার্থীদের নির্বাচনের প্রধান প্রচারণার মঞ্চ হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। নির্বাচনকেন্দ্রিক নতুন নতুন কনটেন্ট তৈরি করছেন প্রার্থীরা। ফেসবুকে সয়লাব হয়ে গেছে প্রার্থী বা দলের নির্বাচনী গান, ছোট ভিডিও, ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট এবং সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটের প্রচার-প্রচারণা। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সচেতনতামূলক ভিডিও তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ করেই এই ডিজিটাল কৌশল সাজানো হয়েছে। এই জেন-জি ভোটাররাই এবার নির্বাচনের ফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া এবারের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারণা শুধু একটি সহায়ক মাধ্যম নয়; বরং এটি নিজেই একটি আলাদা যুদ্ধক্ষেত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে দল আলোচনার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে, তার মাঠের প্রচারণাও সুবিধা পাবে।
তরুণ ভোটাররাও অনলাইন প্রচারণাকে সময়োপযোগী মনে করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসনের শিক্ষার্থী এইচ এম খালিদ হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন তরুণ প্রজন্মের শতভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অন্তর্ভুক্ত। তাই এ যুগে এসে পোস্টারের প্রয়োজন কী? পোস্টার না থাকাই পরিবেশের জন্য ভালো। ফেসবুক-টিকটকেই সব পাওয়া যায়। কে কী বলছে, কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে সব যাচাই করা যায়। একই কথা বলছেন ঢাকায় বসবাসকারী একাধিক শিক্ষার্থী।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন কমিশন সংস্কার প্রস্তাবের অনেক সুপারিশের মধ্যে পোস্টার না ছাপানোর পরামর্শটি মানা হয়েছে। এটা ভালো হয়েছে। এতে প্রার্থীর খরচ কমেছে। কাগজের অপচয় কমায় এই সিদ্ধান্ত পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।
এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ‘ডিজিটাল নির্বাচন’ উল্লেখ করেন ফ্যাক্ট ওয়াচের গবেষণা সমন্বয়কারী জুলকার নাঈন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে ১০ জন ভোটারের ৪ জন তরুণ, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর বেশি নির্ভরশীল। তাই প্রার্থীরা নতুনদের আকৃষ্ট করতে এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে বেছে নিয়েছেন। তবে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার নানা সুবিধার পাশাপাশি অনেকগুলো অসুবিধাও রয়েছে। বড় চ্যালেঞ্জ হলো এআই দিয়ে মিথ্যা কনটেন্ট তৈরি করা, গুজব সৃষ্টি করা, পুরাতন ভিডিও নতুন করে উপস্থাপন করা। অনেকে এগুলো না বুঝেই শেয়ার করে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে বলেও শঙ্কা করছেন ফ্যাক্ট ওয়াচের এই কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যে দেখা যায়, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৩ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ শতাংশ। ফেসবুক ব্যবহারকারী ছয় কোটির বেশি, টিকটক ব্যবহারকারী পাঁচ কোটিরও বেশি। এই বিপুল ডিজিটাল উপস্থিতিই রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী কৌশল বদলে দিয়েছে।
ফেসবুকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেটার তথ্যে উঠে এসেছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩০ দিনে নির্বাচনের প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ১ মাসে ৫২ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও সমর্থকরা। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। গত এক মাসের পরিসংখ্যানে বিজ্ঞাপনের প্রচারে দল হিসেবে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
তবে নির্বাচন কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা সুবিধার পাশাপাশি গুজব ও আতঙ্কও বাড়ছে। একটি পক্ষ নির্বাচন বানচাল বা অপপ্রচার করতে প্রতিদিনই ছড়িয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন অপতথ্য, গুজব ও ডিপফেক স্ক্যান্ডাল ভিডিও, যা অনেকে বিশ্বাস করছেন, আবার গুজবের ভিড়ে অনেকে সত্য ভিডিওকেও অবিশ্বাস করছেন। ফলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে অপতথ্য ও সাইবার মাধ্যমে ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এআইয়ের (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) মাধ্যমে তৈরি ডিপফেক স্ক্যান্ডাল ভিডিও বা যেকোনো গুজব ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে। কারণ এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও কোনোভাবে শনাক্ত হলেও ব্যবস্থা নেওয়াটা সময়সাপেক্ষ বিষয়। যতক্ষণে যদি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, ততক্ষণে যে উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সেই উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলছেন, নির্বাচনের বাইরে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন গুজব ছড়াতে মরিয়া। এ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের সাইবার বুলিং, এআই দিয়ে বানানো ডিপফেক ও চিপফেক ভিডিও, ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর অপপ্রচারের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, গুজবকারীদের টার্গেটে পরিণত হতে পারেন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী রিটার্নিং অফিসার ও প্রিসাইডিং অফিসাররাও।
ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান বলছে, সংসদ নির্বাচন ঘিরে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৯টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভুয়া ফটোকার্ড, এআই দিয়ে বানানো ভিডিও প্রচারণায় নজরদারি রাখছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সাইবার মাধ্যমে যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিরোধে আমরা তৎপর রয়েছি। ২৪ ঘণ্টাই সাইবার প্যাট্রলিং অব্যাহত রয়েছে। এখনো আমরা নির্বাচনকেন্দ্রিক অপতৎপরতার কোনো অভিযোগ পাইনি। কেউ সাইবার মাধ্যমে হয়রানির শিকার হলে সাইবার পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানান।’
ফেসবুকে বিএনপির প্রচার-প্রচারণা : অনলাইন প্রচারণায় বিএনপি বেশ সক্রিয় রয়েছে। দলটি গান, সংক্ষিপ্ত ভিডিও ও গ্রাফিকসের মাধ্যমে নীতিনির্ভর বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ‘আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ; ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই সেøাগান ঘিরে তৈরি কনটেন্টগুলো বেশ শেয়ার হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোটারের মতামত জানার জন্য ‘ম্যাচ মাই পলিসি’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে।
বিএনপি তাদের ডিজিটাল কনটেন্টে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো পরিকল্পনা তুলে ধরছে। সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে নারী, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রস্তাবিত সহায়তা কর্মসূচি ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। দেখা গেছে, বিএনপি ডিজিটাল প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছে। দলটির পক্ষে প্রচার চালানো ৫০টি ফেসবুক পেজে ৩০ হাজার ৯১৬ ডলার ব্যয় করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা।
ডিজিটাল প্রচারণায় দ্বিতীয় অবস্থানে জামায়াত : জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটও অনলাইনে সক্রিয়। গত নভেম্বরের শুরুতে জামায়াত সমর্থিত একটি প্রচারণামূলক গান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। নৌকা, ধানের শীষ ও লাঙ্গলের সময় শেষ এই প্রতীকী বার্তা ঘিরে গানটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর অন্যান্য দলও প্রচারণামূলক গান প্রকাশে নেমেছে। এ ছাড়া ফেসবুকের ৩৩টি পেজ থেকে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জামায়াত ব্যয় করেছে ১১ হাজার ২২২ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।
এনসিপিসহ অন্যান্য দলের প্রচার : নতুন রাজনৈতিক দলগুলোও অনলাইনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) অনলাইন প্রচারণায় নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে ভিন্ন কৌশলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটি নিজেদের ‘নতুন রাজনীতি’ ও নাগরিককেন্দ্রিক ভাবনার ওপর জোর দিচ্ছে। তাদের কনটেন্টে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার ছবি, ভিডিও ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর বক্তব্য ব্যবহার করে তরুণ ভোটারের সঙ্গে আবেগী সংযোগ তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এবং প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থক গোষ্ঠীরা আলাদা ওয়েবসাইটও বানিয়েছে। নানা রকম মিম ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
ফেসবুকে প্রার্থীদের কার কত অনুসারী : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফেসবুক। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিজস্ব পেজ এবং অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যাপক ব্যবহৃত হচ্ছে। ফেসবুকে বিএনপির তারেক রহমানের ৫৬ লাখ, জামায়াতের শফিকুর রহমানের ২৩ লাখ, এনসিপির নাহিদ ইসলামের ১২ লাখ অনুসারী। স্বতন্ত্র তাসনিম জারার ৭১ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে।
অনেকে মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারী বেশি থাকলে প্রচারে সুবিধা হয়। তবে তা ভোটের ফলের চূড়ান্ত নির্ণায়ক নয়। তবে এই ভার্চুয়াল প্রচারণার বাইরেও ভোটার রয়েছে, যাদের হাতে নেই স্মার্টফোন। তাদের জন্য পোস্টার না থাকা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রাজধানীর মতিঝিলের বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী মানিক মিয়া ব্যবহার করেন সাধারণ ফোন। অনলাইন প্রচার সম্পর্কে তার ধারণা নেই। তিনি বলেন, পোস্টার না থাকায় এলাকায় কে প্রার্থী বুঝতে কষ্ট হচ্ছে।
